মোদি সরকার নমনীয়

বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোসহ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দেশটির অন্য অঞ্চলও। গতকাল রবিবার পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসসহ কিছু দল। আজ রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় অম্বেদকরের মূর্তির সামনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ডাকে বিশাল মিছিল ও সমাবেশ হবে।

পশ্চিমবঙ্গে গত শনিবার বিক্ষোভ-অগ্নিসংযোগের পর গতকালও বিভিন্ন এলাকায় উত্তাপ বিরাজ করেছে। কোথাও রেল অবরোধ, কোথাও রাস্তা আটকে আইনটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। রাজধানী নয়াদিল্লিতে গতকাল বিকেলে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীর মধ্যকার তুমুল সংঘর্ষ ঘটে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় একাধিক বাস। পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে রূপ নেয় নয়াদিল্লির নিউ ফ্রেন্ডস কলোনি। একের পর এক বাস ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা।

সহিংসতার জেরে দিল্লির পাঁচটি মেট্রো স্টেশনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার জন্য জামিয়া মিল্লিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে পুলিশ।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের তরফ থেকে সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, সহিংসতার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, স্থানীয় বহু মানুষ তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে যোগ দেন।

এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের বিক্ষোভকে শান্তিপূর্ণভাবে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার। পুলিশ এদিন নারীদের ওপর নির্মমভাবে লাঠিপেটা করে।’

এদিকে জামিয়া মিল্লিয়ায় বড় ধরনের অভিযানে নেমেছে পুলিশ। পুলিশি পাহারায় মাথার ওপর হাত তুলে হোস্টেল থেকে ছাত্রদের বের হতে দেখা গিয়েছে।

গতকাল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বারবার অনুরোধ ও নির্দেশনা (মমতা এর আগে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানান) সত্ত্বেও ‘কিছু বহিরাগত গোষ্ঠী বিক্ষোভে অনুপ্রবেশ করে সহিংসতার উসকানি দিয়ে বিক্ষোভকারীদের প্ররোচিত করার মাধ্যমে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে।’ বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া জেলা ও উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার বারাসাত ও বসিরহাট মহকুমা এবং দক্ষিণ চব্বিশপরগনার বারুইপুর ও ক্যানিং মহকুমায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কেরালা, পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ ও অন্ধ«প্রদেশও এ আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছে। এ রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীরা যার যার অবস্থান থেকে নাগরিকত্ব আইনবিরোধী বক্তব্যও দিয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজধানী নয়াদিল্লিতে পর্যন্ত বিক্ষোভ হচ্ছে। ক্রমেই আন্দোলনের মাত্রা যখন বড় হচ্ছে ঠিক তখনই ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নাগরিকত্ব আইনে প্রয়োজনে সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

গত শনিবার দেশটির গিরিধে এক র‌্যালিতে যোগ দেন অমিত শাহ। সেখানে তিনি জানান, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে আইনের ধারাগুলোতে ‘কিছু পরিবর্তন’ করা হতে পারে। বিজেপি সভাপতির এমন বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশেস্নষকরা। তাদের মতে, দেশে গণআন্দোলন ঠেকাতে পিছু হটতে পারে বিজেপি।

বক্তব্যে অমিত শাহ বলেন, ‘কনরাড সাঙমা (মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী) ও তার মন্ত্রীরা গত শুক্রবার আমার সঙ্গে দেখা করে তাদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। আইনে কিছু পরিবর্তন আনতে বলেছেন তারা। বড়দিনের পর এ নিয়ে তাদের সঙ্গে ফের কথা হবে। আমি তাদের নিশ্চিত করেছি যে, বিষয়টি নিয়ে আমরা গঠনমূলক আলোচনা করব এবং মেঘালয়ের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হবো।’

একই দিন ধানবাদে অন্য র‌্যালিতে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন সিএবি নিয়ে আসি তখন কংগ্রেসের পেটে ব্যথা শুরু হয়। বছরের পর বছর ধরে অন্য দেশে যারা ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে শরণার্থীর মতো জীবনযাপন করছে, তাদের কি নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত হবে না? কংগ্রেস বলছে, আমরা মুসলিমবিরোধী।’

গতকাল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সহিংসতা বন্ধ করার জন্য আসামের জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ঝাড়খণ্ডের দুমকায় নির্বাচনী র‌্যালিতে মোদি বলেন, ‘আসামের ভাই ও বোনদের আমি ধন্যবাদ জানাই যারা সহিংসতা ছড়াচ্ছে তাদের থেকে দূরে থাকার জন্য। কংগ্রেস ও তাদের সমর্থকরা আগুন ছড়াচ্ছে। তাদের কথা না শোনায় তারা আগুন লাগাচ্ছে।’

তবে গত শনিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে কংগ্রেসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধী জানান, নাগরিকত্ব আইন ভারতে খণ্ডিত করে দেবে। তিনি এ সময় বলেন, ‘নাগরিকত্ব আইন যে ভারতের আত্মাকে বিদীর্ণ করবে তা নিয়ে চিন্তিত নন মোদি ও অমিত শাহ।’

নাগরিকত্ব আইন নিয়ে জোটসঙ্গীদের মধ্যেও বেকায়দায় বিজেপি। আসামে বিজেপির মিত্র অসম গণপরিষদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে ইতিমধ্যেই দেখা করেছে। নাগরিকত্ব আইন সমর্থন দিয়ে তারা ভুল করেছে এমন বক্তব্য দলটির। দলের এমপি রামেন্দ্র নারায়ণ কালিতা নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আইনগত ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, দিল্লিতে বিজেপির মিত্র জনতা দল ইউনাইটেডের (জেডিইউ) সহসভাপতি প্রশান্ত কিশোর আম আদমি পার্টির (এএপি) সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন সিএএ’র বিরোধিতা করে। এ নিয়ে দলের নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধ চলছে কিশোরের। দলের প্রধান নীতিশ কুমারের কাছে পদত্যাগপত্রও জমা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তা গৃহীত হয়নি।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও নাগরিকত্ব আইন নিয়ে সংকটে বিজেপি। রাজ্যে দলটির এমপিদের একাংশ প্রকাশে আইনটির বিরোধিতা করে বক্তব্য দিতে পারছেন না দলের প্রতি আনুগত্যের কারণে। কিন্তু বাবুল সুপ্রিয়র মতো এমপিরা যে এ আইনের পক্ষে নয়, এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের নীরবতায়।