পূর্ব পাকিস্তান এখন স্বাধীন বাংলাদেশ

‘আমি বেশ বুঝতে পারছি, আমাদের বাহিনীর আত্মসমর্পণে ইসলামাবাদ ও পিন্ডিতে বসবাসরত বাঙালিরা আহ্লাদিত হয়ে মিষ্টি বিতরণ করছে। কিন্তু খুব শিগগির তারা মিষ্টির বিষাক্ত স্বাদটি টের পাবে। যুদ্ধবিরতির (আত্মসমর্পণ) বিরোধিতা করে করাচি, লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। দেশকে এই অচলাবস্থায় ঠেলে দেওয়ার জন্য জনগণ ইয়াহিয়াকে ও রাজনৈতিক নেতাদের দায়ী করে গালাগাল দিচ্ছে। এখন ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করায় তারা আমাকেও দোষ দিচ্ছে। আমি কী করতে পারতাম? ইয়াহিয়া ছিলেন সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ। আমি জানি, মাদকাসক্তি মানুষের ব্যক্তিত্ব বদলে দিতে পারে। গুজব শুনছি, ইয়াহিয়াকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং পেশোয়ারে তার বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ কথাগুলো পাকিস্তানের সাবেক পেªসিডেন্ট আইয়ুব খানের ডায়েরি থেকে তুলে আনা।

আইয়ুব খান হা-হুতাশ করে আরও লিখেছেন: এটি পাকিস্তানের জন্য একটি কালো দিন, কেবল যে সাড়ে ছয় কোটি মুসলমানের একটি প্রদেশ ভারতীয় প্রভাব-বলয়ে চলে গেল তা নয়, আমাদের অত্যন্ত চমৎকার সেনা ডিভিশন, কিছু বিমান ও নৌশক্তিও হাতছাড়া হয়ে গেল। তাদের কেমন করে ভারতের কাছ থেকে মুক্ত করা হবে, সেটাই বড় চিন্তা। এই জিম্মিদের ছাড়িয়ে আনতে গেলে ভারত বড় একটা বিনিময়মূল্য চেয়ে বসবে। ...এই বেদনা সইতে আমাদের অনেক সময় লেগে যাবে। কিন্তু ভারতীয় উল্লাসও শিগগিরই মিলিয়ে যাবে। বাঙালি শিগগিরই বুঝতে শুরু করবে, পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা কিনে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বড্ড বেশি দাম দিতে হয়েছে।

মেজর জেনারেল গান্ধর্ভ সিং নাগরার কমান্ডের অধীন ভারতীয় সৈন্য ও বাংলাদেশের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী যখন ১৬ ডিসেম্বর খুব ভোরে ঢাকার বাইরে একটি সেতু অকেজো করতে আক্রমণ চালাল, তখনই শুনতে পেল এখানকার পাকিস্তানি কমান্ড আত্মসমর্পণ করতে ভারতের দেওয়া শর্ত ও সময়সীমা মেনে নিয়েছে।

ভারতীয় সৈন্যবাহিনী ঢাকায় প্রবেশ করার পরপরই মেজর জেনারেল গান্ধর্ব সিং নাগরা নিয়াজিকে আশ্বাস দিয়ে চিরকুট পাঠিয়েছেন : ‘প্রিয় আবদুল্লাহ, আমি এখানে। খেলা শেষ হয়ে গেছে। আমার পরামর্শ, আপনি নিজেকে আমার কাছে ছেড়ে দিন। আমি আপনার দেখভাল করব।’

পাকিস্তান ওয়ার কমিশনের বক্তব্য যে লড়াই করে তার বীরের ম…ত্যুবরণ করা উচিত ছিল তিনি তা নাকচ করে দিয়ে আত্মসমর্পণের দায় নিতে অস্বীকার করেন। তিনি বরং আত্মসমর্পণের জন্য ইয়াহিয়াকে দায়ী করেন। তিনি দাবি করেন, সদর দপ্তরের নির্দেশেই তাকে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। ইয়াহিয়া এবং অন্যান্য জেনারেলরা তাকে আত্মসমর্পণ করতে বলেছেন, কারণ ইসলামাবাদ যদি যুদ্ধ চালিয়ে যায় সে ক্ষেত্রে তারা উি™^গ্ন– ভারত গোটা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে তছনছ করে ফেলবে এবং পশ্চিম পাকিস্তান টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।

ইস্টার্ন কমান্ড প্রধান মেষশাবকে পরিণত হওয়া টাইগার নিয়াজি ১৬ ডিসেম্বর তার ডায়েরিতে লিখেছেন: আমাদের ট্রুপস আত্মসমর্পণ করবে এ শর্তে ভারতের কমান্ডার ইন চিফ (জেনারেল মানেক শ’) যুদ্ধ বন্ধ করতে সম্মত হন এবং আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেওয়ার জন্য এবং সেনাবাহিনীর সম্মান রক্ষা করার জন্য আমি প্রেসিডেন্টকে একটি সিগন্যাল পাঠাই। তিনি আমার সিগন্যালের ওপর  লিখেন: এনএফএ (নো ফারদার অ্যাকশন), আর কিছু করার নেই। আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে চাই, কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। সেনাপ্রধান কোথায় আছেন, তাও বের করা যাচ্ছে না। জেনারেল পীরজাদা বেলা আড়াইটাই স্কোয়াশ খেলতে গেছেন এবং আমার সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। পোলিশ প্রস্তাব গ্রহণ করার বদলে ইস্টার্ন কমান্ডের ওপর  চাপিয়ে দেওয়া হলো অসম্মানজনক আত্মসমর্পণ।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিবিসির সংবাদ:  পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শেষ হয়ে আসছে। রেডিও পাকিস্তান জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি হয়েছে এবং ভারতীয় বাহিনী রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করেছে। পাকিস্তান বলেছে, স্থানীয় ভারতীয় ও পাকিস্তানি কমান্ডারদের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি করা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী সংসদে বলেছেন, দু পক্ষের প্রতিনিধি ঢাকায় আত্মসমর্পণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। পাকিস্তানের পক্ষে এই চুক্তি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। তিনি বলেন, ভারত আশা করে, পূর্ব পাকিস্তানিদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি পাকিস্তানে আটক রয়েছেন, নিজ দেশের মানুষের মধ্যে তার আসন গ্রহণ করবেন এবং বাংলাদেশকে শািন্তর পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। মিসেস গান্ধী বলেন, ভারতীয় বাহিনী প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় সেখানে অবস্থান করবে না। তিনি আরও যোগ করেন, লাখ লাখ শরণার্থী ইতিমধ্যেই দেশের পথে পা বাড়িয়েছে।

পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধে নাটকীয় শেষ অধ্যায়ে গত রাতে বিভিন্ন ধরনের সৈন্যদের একটি কম্পোজিট ফোর্সের মাধ্যমে ভারতের প্রথম অ্যাম্ফিবিয়াস ল্যান্ডিং- উভচর অবতরণ করে, নৌ-সেনারা তীরে উঠে কক্সবাজারের দক্ষিণাঞ্চলে হালকা পªতিরোধ নস্যাৎ করে দেয়। এই অ্যাম্ফিবিয়াস ল্যান্ডিং এটা বুঝিয়ে দেয় যে, একদা তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও অসংগঠিত ভারতীয় বাহিনী অংশত সোভিয়েত সহায়তায় সাম্পতিক সময়ে অনেক উন্নতি সাধন করেছে। এ যুদ্ধে ভারত অগ্রগামী প্রযুক্তি ও প্রদ্ধতি ব্যবহার করেছে- হেলিকপ্টার থেকে আক্রমণ, বিপুল সংখ্যক প্যারাট্রুপার অবতরণ এবং নৌ-অবরোধ। মিসেস গান্ধী পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতির নির্দেশের সঙ্গে জাতির উদ্দেশে তার বেতার ভাষণও পাঠানো হয়েছে। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে অবস্থানরত তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার শরণ সিংকেও তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জানান– সীমান্ত  সম্পªসারণের কোনো আগªহ ভারতের নেই। এখন যেহেতু পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশে আত্মসমর্পণ করেছে এবং বাংলাদেশ মুক্ত, আমরা মনে করি এ অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অর্থহীন।

ভারত কি বাংলাদেশকে খেয়ে ফেলবে? বিদেশি পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে ইংরেজি দৈনিক ডন লিখেছিল, যখন জিজ্ঞেস করা হলো, ফেডারেল পাকিস্তান হওয়ার কারণে ভারত না আবার বাংলাদেশকে ‘খেয়ে ফেলে’।  মুজিব হেসে ওঠেন। তিনি আশ^স্ত করলেন, ‘আজকাল কেউ কাউকে খেয়ে ফেলতে পারে না। ভারত তো তাদের বাংলাকে নিয়ন্ত্রণ করতেই হিমশিম খেয়ে যায়, আমাদের দরিদ্র লোকেরা ভেঙে পড়ার পর্যায়ে এলেও তাদের স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারবে।’

তিনি বলতে থাকলেন ‘ভিয়েতনামের দিকে তাকান, আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশ তার ইচ্ছে চাপাতে গিয়ে গরিব কৃষকের মাতৃভূমিতে কত অসহায় হয়ে পড়ছে। আমেরিকা যদি ভিয়েতনামকে খেয়ে ফেলতে না পারে, ভারত কেমন করে বাংলাদেশকে খাবে?’

জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট পূর্ব পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ সমর্থিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার গোপন বিচার নিয়ে পাকিস্তান সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নভেম্বরে পূর্ব বাংলায় হারিকেনের ধ্বংসযজ্ঞ এবং পরবর্তী সময়ে কলেরা মহামারীর চেয়ে ভয়াবহ হবে এই বিচারের পরিণতি।

নিয়াজি যখন আত্মসমর্পণ দলিলে সই করলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের  চ‚ড়ান্ত অভু¨দয় ঘটল, অভিনন্দিত নতুন দেশের সামনে প্রধান যে প্রশ্ন বিশ্ব গণমাধ্যমে তারই অনুরণন–  মুজিব কখন ফিরবেন?