নয়াদিল্লিতে জামেয়া মিল্লিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের নৃশংস হামলার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন বলিউডের তারকারা। চলমান নাগরিকত্ব বিলকে ঘিরে ছাত্র বিক্ষোভকে সমর্থন জানিয়ে টুইট করেছেন তাদের অনেকেই।
মহেশ ভাট, অনুরাগ কাশ্যপ, মনোজ বাজপেয়ি, রাজকুমার রাও, রিতেশ দেশমুখ, অনুভব সিনহা, পরিনীতি চোপড়া, তাপসী পান্নু, কঙ্কণা সেনশর্মা, সুধীর মিশ্র, দিয়া মির্জা, আয়ুষ্মান খুরানা, ভিকি কৌশল, রিচা চাড্ডা, রেভাথি, সিদ্ধার্থ, স্বরা ভাস্কর, সায়ানী গুপ্তা, হুমা কোরেশির মতো একের পর এক অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক টুইট করে নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট করেছেন।
তাদের প্রত্যেকেই ছাত্র বিক্ষোভকে সমর্থন দিয়েছেন। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
মনোজ বাজপেয়ি টুইটে বলেন, ‘অনেক সময় অন্যায়ের প্রতিবাদে আমাদের সক্ষমতা থাকে না। কিন্তু প্রতিবাদ জানাতে এখন আমাদের ব্যর্থ হওয়া যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এবং তাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে আছি। ছাত্রদের ওপর যে সহিংসতা চালানো হয়েছে তার বিরুদ্ধে নিন্দা জানাই।’
নাগরিকত্ব আইনের বিরোধীদের ওপর নির্যাতনে চুপ থাকতে পারলেন না ‘সেক্রেড গেমস’ খ্যাত অনুরাগ কাশ্যপ।
একাধিক টুইটে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের লড়াইয়ের ভিডিও শেয়ার করেছেন বলিউডের গুণী এই নির্মাতা। এক টুইটে নরেন্দ্র মোদি সরকারকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলেন তিনি।
টুইটারে অনুরাগ লেখেন, ‘ঘটনা অনেক দূর গড়িয়েছে। এখন চুপ করে থাকার সময় নয়। এই সরকার পরিষ্কার ফ্যাসিবাদী। যারা কিছু বললে অবস্থার পরিবর্তন হতো, তারা চুপ দেখে আমার রাগ হচ্ছে।’
একইভাবে ক্ষুব্ধ অভিনেত্রী পরিনীতি চোপড়া। টুইটার বার্তায় তিনি বলেন, ‘প্রতিবারই নাগরিকদের মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে ক্যাবের কথা ভুলে যান বরং এমন একটি আইন পাস করা উচিত যাতে আমাদের দেশকে আর গণতন্ত্র বলা না হয়। নিজের মত প্রকাশ করতে গিয়ে নিরীহ মানুষকে এভাবে পেটানো হলো, বর্বর!’
স্বরা ভাস্কর লিখেন, ‘শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কেন অপরাধীদের মতো আচরণ করা হচ্ছে? কেন ছাত্রাবাসে টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়েছে?’ পুরো ঘটনায় ‘মর্মাহত ও লজ্জিত’ বলে উল্লেখ করেন।
বলিউডের জনপ্রিয় রাজকুমার রাওয়ের মতে, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার সবার রয়েছে। নির্মাতা মহেশ ভাট একাধিক টুইটে বিক্ষোভে ক্ষমতা প্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছেন। নাগরিকত্ব আইনবিরোধী অবস্থানে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসাও করেছেন।
নাগরিকত্ব আইন ও বিক্ষোভ নিয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানান রেণুকা সাহানে। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে তিনি টুইট করে বলেছেন, ‘দয়া করে আপনার লোকেদের, আইটি সেলকে বলুন চুপ করে থাকতে। তারাই ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বিরুদ্ধে মিথ্যা রটাচ্ছে।’
মোদি-অমিত শাহের দিকে হুমা কোরেশি প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যা ঘটছে তা মোটেই কাম্য নয়। নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। জামিয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ অতি নিন্দনীয়। মুখ বন্ধ করার এটাই কি বিকল্প রাস্তা?’
এদিকে মোদির সঙ্গে তারকাদের তোলা একটি সেলফি শেয়ার করেন সায়ানী। তিনি ছবিতে থাকা কয়েকজন তারকাকে ট্যাগ করেন, যাতে তারা মোদির কানে বিষয়টি তোলেন।
জামেয়া মিল্লিয়ার সাবেক শিক্ষার্থী ও লিপিস্টিক আন্ডার মাই বুরকা নির্মাতা অলঙ্কৃতা শ্রীভাস্তভা বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিজের শিক্ষাজীবনের কথা স্মরণ করেন এবং জানান, আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের জন্য তার ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
এদিকে নরেন্দ্র মোদি ঘনিষ্ঠ বলিউড তারকা অক্ষয় কুমার জামিয়া মিলিয়ার শিক্ষার্থীদের ব্যঙ্গ করা টুইটার পোস্টে লাইকে দিয়ে বিতর্কে জড়ালেন। এই ঘটনার জেরে টুইটার জুড়ে ট্রেন্ড উঠেছে ‘বয়কট অক্ষয় কুমার’। এমনকি তার কানাডীয় নাগরিকত্ব নিয়ে খোঁচা দিয়েও লেখা হলো ‘#বয়কট কানাডিয়ান কুমার’।
তবে এই ঘটনার পরই অক্ষয় টুইটারে লেখেন, ‘ভুল করে লাইক করে ফেলেছি। স্ক্রল করছিলাম ফোন, তাতেই অসাবধানে লাইক পড়ে যায়। যখন ভুল বুঝতে পারি তখনই আনলাইক করে দিই। আমি কোনোভাবেই এ রকম কাজকে সমর্থন করি না।’
কিন্তু ততক্ষণে অক্ষয়ের লাইকের স্ক্রিনশট ভাইরাল। বলিউড খিলাড়ির বিরুদ্ধে খেপে ওঠেন অনেকেই।
একইভাবে বলিউডের তিন খান শাহরুখ, আমির ও সালমানের নীরবতা নিয়েও অনেকে খোঁচা দিয়েছেন। এর মধ্যে জামেয়া মিল্লিয়ার সাবেক শিক্ষার্থী শাহরুখ চুপ কেন এমন প্রশ্ন তুলেছেন কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের প্রতিবাদে পদত্যাগকারী আইএস অফিসার কান্নান গোপীনাথান।
প্রসঙ্গত, ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় অত্যাচারের কারণে ভারতে শরণার্থী হিসেবে হিন্দু, পারসি, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা আশ্রয় নিতে বাধ্য হলে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। সেখানে প্রতিবেশী দেশ থেকে যাওয়া মুসলিমদের বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। ধর্মের ভিত্তিতে করা এই আইনকে অসাংবিধানিক ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে পুরা ভারতের নাগরিক সমাজ ও ছাত্ররা বিক্ষোভে নামে।