মতপ্রকাশে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যক্তি-অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। যেকোনো বিষয়ে নিজের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। ব্যক্তির এই অধিকার ইসলাম সর্বতোভাবে স্বীকার করে। ভিন্ন কিছু চিন্তা করে তা মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে ইসলামে কোনো বাধা-নিষেধ নেই। বরং নিজস্ব অনুভব-অনুভূতি ও মতামত প্রকাশে গুরুত্বারোপ করে ইসলাম। তবে সেই মতপ্রকাশ যেন অন্যের প্রতি জুলুম হয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মতপ্রকাশের নামে সমাজ, দেশ ও মানুষের ক্ষতি করার অধিকার কারও নেই।

মতপ্রকাশ মৌলিক অধিকার

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। ইসলামি সভ্যতার শুরু থেকেই এই অধিকার চর্চিত হয়ে আসছে। তাই কেউ চাইলেই এই অধিকার হরণ কিংবা অস্বীকার করতে পারে না। বরং স্বাধীনভাবে নিজের মতামত জানানো মুসলমানের জন্য আবশ্যক। কেউই তা থেকে মুক্ত নয়। কেননা, মানুষের কল্যাণ কামনা করা আল্লাহতায়ালা তার জন্য আবশ্যক করেছেন। সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে না পারলে এসব দায়িত্ব কীভাবে পালন করবেন একজন মুসলিম? স্বাধীন মতপ্রকাশ যেহেতু এসব দায়িত্ব পালনে আবশ্যক, তাই মতপ্রকাশও একজন মুসলমানের জন্য আবশ্যক হয়ে পড়ে।

মতপ্রকাশ ও কল্যাণকামিতা

কোরআন-হাদিসের বিভিন্ন স্থানে কল্যাণকামিতার কথা আলোচিত হয়েছে। সৎকাজে আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ করতে বলা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভালো কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৭১)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ধর্ম হলো কল্যাণকামিতা।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কার কল্যাণকামিতা হে আল্লাহর রাসুল?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসুল, মুসলিম শাসক ও সাধারণ মানুষের।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮)

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ‘মুসলিম শাসকদের প্রতি কল্যাণকামিতার অর্থ হলো, ভালো কাজে জনগণ তাদের সাহায্য করবে। তাদের আনুগত্য করবে। তাদের সত্যের আদেশ দেবে। সত্য-বিরোধিতায় নিষেধ করবে। কোমল ভাষায় তাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেবে। অবহেলিত দিকগুলো তাদের সামনে তুলে ধরবে। (মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ আল-মিনহাজ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৮৩)

তা ছাড়া দায়িত্বশীল ও শাসকশ্রেনির জন্য ইসলামের নির্দেশনা হলো, সব কাজে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে সেই ব্যক্তি নিজের মতামত জানাবে কীভাবে?

সোনালি যুগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

সাধারণ মানুষের কথা বলতে এবং সামজের বর্ণবৈষম্য তুলে ধরতে উৎসাহিত করে ইসলাম। রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর মতকে স্বাগত জানাতে কখনোই কার্পণ্য করেননি রাসুল (সা.)। আহজাবের যুদ্ধে রাসুল (সা.) গাতফান গোত্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করতে চেয়েছিলেন। মদিনার এক-তৃতীয়াংশ খেজুরের বিনিময়ে প্রস্তাবিত সেই চুক্তিতে তিনি কয়েকজন সাহাবির মতামত জানতে চান। তারা রাসুল (সা.)-এর মতের বিরুদ্ধে নিঃসংকোচে নিজেদের মতপ্রকাশ করেন। তারা বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এটা কি আসমানি প্রত্যাদেশ, না আপনার নিজস্ব মত ও প্রত্যাশা? প্রথমটা হলে তো আল্লাহর আদেশ হিসেবে মেনে নিতাম। কিন্তু আমরা দেখছি, এটি আপনার নিজস্ব মত ও প্রত্যাশা। আপনি যদি আমাদের প্রতি সদয় হতে চাইতেন, আল্লাহর কসম, আমাদের ও তাদের সমান চোখে দেখতেন। তারা আমাদের কাছ থেকে একটি খেজুরও পাবে না। অবশ্য কিনে নিলে বা মেহমান হিসেবে পেলে ভিন্ন কথা।’ (তবরানি, হাদিস : ৬১৪৫)

স্বাধীন মতামতদানের এমন ঘটনা সাহাবা ও তাদের পরবর্তী যুগে খুবই সাধারণ ব্যাপার ছিল। একবার খলিফা উমর (রা.) মসজিদে দেনমোহরবিষয়ক আলোচনা করছিলেন, সেখানে এক নারী দাঁড়িয়ে তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। খলিফা তাকে বাধা দেননি। বরং নিজের ভুল স্বীকার করে নিয়ে বলেন, ‘একজন নারী সঠিক কথা বলল আর উমর ভুল করল।’ (তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ৫৯)

মতপ্রকাশে সততা ও দায়িত্বশীলতা

মানুষের কল্যাণের জন্যই ইসলাম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে। তাই মতপ্রকাশের মাধ্যমে কারও ক্ষতি করা ইসলাম অনুমোদন করে না। তাই মন্তব্যকারীকে সৎ ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সমালোচনা হতে হবে বস্তুনিষ্ঠ। সে যা সত্য মনে করে, তা-ই নিঃসংকোচে প্রকাশ করবে। সেই সত্য যত তিক্তই হোক না কেন। ধোঁয়াশা সৃষ্টি করা এবং সত্য গোপন করা কখনো মতপ্রকাশের উদ্দেশ্য হতে পারে না। এখানে কল্যাণকামিতাই মুখ্য বিষয়। মতামতের নামে সত্য নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি কিংবা সত্য-মিথ্যার মিশ্রণে বানোয়াট কথা বলা ইসলাম সমর্থন করে না। তেমনি মতামতের নামে মানুষের অধিকার খর্ব করা, শাসকশ্রেনির মন্দকাজের প্রশংসা করা, ভালো কাজের সমালোচনা করা, তাদের মর্যাদাহানি করা, এসব করে সুনাম কুড়ানোর আশা করা, সাধারণ মানুষকে অহেতুক উসকানি দেওয়া– সবই ইসলামে নিষিদ্ধ। তাই সাধারণ মানুষের উচিত, সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নিজের মতপ্রকাশ করা এবং মানুষের কল্যাণে সত্যকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। আর শাসকশ্রেণির উচিত, মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা সৃষ্টি করা এবং মতপ্রকাশে মানুষ যাতে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়– তার জন্য যথাযথ উদ্যোগ হাতে নেওয়া। এতে দুই পক্ষের সহযোগিতায় গড়ে উঠবে সুন্দর ও কল্যাণময় রাষ্ট্র।