ফিজি ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। ফিজি দ্বীপপুঞ্জে ৩৩০টিরও বেশি দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে ১১০টিতেই জনবসতি নেই। ২০১৪ সালের এক জরিপে ফিজি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেশ নির্বাচিত হয়েছিল। ধনী এই দেশের জনপ্রতি জিডিপি দশ হাজার ডলার। ফিজির ডলারের মানও বেশ। এক মার্কিন ডলারে মাত্র দুই ফিজিয়ান ডলার।
ফিজির মোট আয়তন ১৮ হাজার ২৭৪ বর্গকিলোমিটার। আগ্নেয়গিরির লাভা জমে ফিজির বেশির ভাগ দ্বীপই তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন তথ্যে বলা হয়েছে, এগুলোর প্রায় ১৫ কোটি বছর আগে তৈরি হয়েছে। ফিজিতে জনবসতি শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে। দেশটির প্রায় ৮৭% মানুষ দুটি দ্বীপে বাস করে। রাজধানী সুভা (ঝাঁধ) ভিটি লেভুতে অবিস্থত। ফিজি ওই অঞ্চলের অন্যতম সমৃদ্ধ ও সম্পদশালী দেশ। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটির আয়ের মূল উৎস বনভূমি, খনিজ ও মাছ। পর্যটন ও চিনি রপ্তানি থেকেও ভালো আয় করে থাকে দেশটি।
‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট লাইন’-এ অবস্থিত পৃথিবীর একমাত্র বসতিপূর্ণ অঞ্চল ফিজি। ডেটলাইনের পাশেই অনিন্দ্য সুন্দর ও মনোরম একটি মসজিদ রয়েছে। এখান থেকেই প্রতিদিন পৃথিবীর সর্বপ্রথম আজান শোনা যায়। এখানেই প্রতিদিন সবার আগে সূর্য ওঠে।
ফিজিতে ইংরেজদের শাসন
ফিজিতে ইংরেজদের আগমন ঘটে ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে। তারা এ অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করে। এই উপনিবেশ স্থায়ী ছিল ১৯৭০ সাল পর্যন্ত। ফিজিকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয় ১৯৮৭ সালে। ১৯৯৮ সালের ২৭ জুন দেশটির নতুন সংবিধান কার্যকর হয়।
ফিজিতে ভারতীয়দের আগমন
ফিজির মোট জনসংখ্যার ৪৭.৬ শতাংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তাদের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যাই বেশি। ভারতীয়দের যেভাবে ফিজিতে আনা হয়েছিল, সেটি সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের বর্বর ও পৈশাচিক চরিত্রের দৃষ্টান্ত। ইংরেজরা যখন এই অঞ্চলে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করে, তখন সেখানকার আদিবাসীরা চাষাবাদে অনভিজ্ঞ ছিল। ইংরেজ গভর্নর তাই ভারতীয় অভিজ্ঞ চাষিদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করে। তারা চেন্নাই, কেরালা, বাংলা ও উত্তর প্রদেশের গরিব
কৃষকদের প্রলোভন দেখায়। দরিদ্র কৃষকরা অল্প পরিশ্রমে বেশি উপার্জনের সুযোগ দেখে দূর প্রাচ্যের ফিজিতে যেতে রাজি হয়। কিন্তু যাওয়ার পর তারা ভিন্ন চিত্রের মুখোমুখি হয়। দাসত্বের জাঁতাকলে নির্মমভাবে পিষ্ট হতে থাকে তারা।
ফিজির সৌন্দর্য তাদের রক্তের সিঞ্চিত ফসল
ফিজি দ্বীপপুঞ্জে সাগরঘেঁষা সারি সারি বিপুল নারকেল গাছের উপস্থিতি ফিজির সৌন্দর্যকে বিকশিত করেছে। অর্থনীতিতেও যোগ করেছে দারুণ সমৃদ্ধি। কিন্তু এগুলো সেই হতভাগা
কৃষকদের ঘাম ও রক্তের সিঞ্চিত ফসল; ইংরেজরা যাদের ‘ভারতীয় কৃষক’ বা ‘কবুলি’ হিসেবে নিয়ে যায়।
যুগ পরম্পরায় তারা দাসত্বের জীবন কাটিয়েছে। পরবর্তীকালে তাদের এ দাসত্বের হতশ্রী জীবনের অবসান ঘটে। জীবনে উদিত হয় নতুন দিনের সূর্য। ফলে জীবিকার তাগিদে ভারতীয় অঞ্চল থেকে আরও বহু মানুষ সেখানে ছুটে যায়। বাংলাদেশে থেকেও শ্রমবাজার তৈরি হয়েছে সেখানে। এভাবেই জনসংখ্যার ৪৭ শতাংশ উপমহাদেশীয়দের দখলে।
ফিজিতে মুসলমানদের আগমন যেভাবে
ভারতীয় উপমহাদেশের সেই কৃষক ও পরবর্তীকালে আগতদের সঙ্গেই ফিজিতে ইসলামের আগমন ঘটে। ১৮৭৯ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে কয়েক দফায় মুসলমানরা ফিজিতে যায়। প্রথম কৃষক হিসেবে ভারত উপমহাদেশ থেকে ষাট হাজার ৫৫৩ জন ফিজিতে যান। তাদের মধ্যে দুই হাজার ৫৩৭ নারীসহ সাত হাজার ৬৩৫ জন মুসলিম ছিলেন। তাদের মাধ্যমেই এ অঞ্চলে ইসলামের পসার ঘটে। এরপর পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ ও মালয় অঞ্চল এবং পূর্ব আফ্রিকা থেকে মুসলিমরা ক্রমান্বয়ে ফিজিতে আগমন করতে থাকে। এভাবে ফিজিতে মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
ফিজির মুসলিমদের জনসংখ্যা
ফিজির মুসলিমদের মোট সংখ্যা ৬২ হাজার ৫৩৪ জন। তবে বিভিন্ন বেসরকারি তথ্য মতে, ফিজিতে বর্তমানে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজারের মতো। দেশের মোট জনসংখ্যার ৭.৭%। ভারত-পাকিস্তানিদের মাঝে মুসলমানদের সংখ্যা ১৫.৯%। ৫৭.১৯% মুসলমান গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে। ১৯.১১% রাজধানীতে। বাকিরা অন্য অঞ্চলে অঞ্চলে বসবাস করে।
ফিজিতে প্রথম মসজিদ নির্মাণ
সর্বপ্রথম যেসব মুসলমান প্রথম ফিজিতে যান, তারা নামাজ-রোজা প্রভৃতি ধর্মীয় মৌলিক বিষয় মেনে চলতেন। ইসলামের প্রতীকী বিষয়গুলোর প্রতি তারা বেশ যত্নবান ছিলেন। ফিজিতে তারা প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন।
কিন্তু নতুন প্রজন্মের মুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। ফলে তারা ধর্মীয় আমল-আচরণের প্রাণোচ্ছলতা হারিয়ে ফেলে। তবে দাওয়াত ও তাবলিগের দ্বীনের আলো ফের সে দেশে ফিরে আসে। ১৯৬৭ সালে ফিজিতে প্রথম তাবলিগের জামাত আসে। তারা মানুষকে দ্বীন-ধর্মের প্রতি ফিরে আসার প্রেরণা দেন। ফিজির প্রাচীন অধিবাসীরাও তাদের ধর্মীয় কর্তব্য ও সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। নতুন নতুন মসজিদ নির্মাণ শুরু হয়। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে মক্তব প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মসজিদ-মাদ্রাসা ও ইসলামি সংস্থা
প্রায় ২৫টি মসজিদ রয়েছে ফিজিতে। মসজিদগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ফিজি ইসলামিক অর্গানাইজেশন মসজিদগুলোর তত্ত্বাবধান ও দেখভাল করে। প্রতিটি মসজিদ ফিজির মুসলিমদের নিজস্ব উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফিজিতে ১৩টি প্রাথমিক ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। বেশিরভাগ শিক্ষাকেন্দ্র মসজিদ-সংলগ্ন। একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়েছে।
ফিজির মানুষের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি দারুণভাবে বিকশিত হচ্ছে। সেখানে মসজিদ, মক্তব-মাদ্রাসা ও ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশের একজন আলোকিত মানুষ মাওলানা আবদুল গোফরান ফিজিতে ইসলামি শিক্ষা বিস্তারে দারুণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি একটি দাওরায়ে হাদিস মাদ্রাসার সূচনা করেছেন। বাংলাদেশের মাওলানা জাফর আলম ও মাওলানা কামরুজ্জামানসহ আরও কয়েকজন বাংলাদেশি আলেম রয়েছেন। তাদের নিবিড় তত্ত্বাবধান ও পরিচর্যায় ফিজিতে বর্তমানে অভিজ্ঞ ও মানসম্পন্ন আলেম তৈরি হচ্ছে।
ইসলামের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো ফিজিতেও ইসলামবিরোধী নানা প্রচারণা রয়েছে। তবু ফিজির মুসলিমদের মধ্যে ধর্মীয় অনুরাগ বাড়ছে। দেশটির মুসলিম যুবকরা দিন দিন ধর্ম পালনে আগ্রহী হয়ে উঠছে। মসজিদমুখী হচ্ছে মানুষ; বাড়ছে মুসল্লির সংখ্যা। বর্তমানে ফিজির রাজনীতি ও অর্থনীতিতে মুসলিমদের জাগরণ চোখে পড়ার মতো।