শেয়ারশূন্য অর্ধেক বিও হিসাব

দুই বছর ধরে মন্দার কারণে পুঁজিবাজার থেকে সটকে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। লোকসানের হাত থেকে বাঁচতে বিও (বেনিফিসিয়ারি ওনার্স) হিসাবে থাকা শেয়ার বিক্রি করে সাইডলাইনে চলে যাচ্ছেন তারা। অনেকেই বিও হিসাব নবায়ন না করে পুঁজিবাজার ত্যাগ করছেন। ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে যত বিও হিসাব ছিল, তার ৫৫ শতাংশে কোনো শেয়ার নেই। বাজার পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ায় শেয়ার না থাকা বিও হিসাবের সংখ্যা আরও বাড়ছে বলে জানা গেছে। 

শেয়ার রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ হিসাব বছর শেষে পুঁজিবাজারে মোট ২৮ লাখ ৯ হাজার ৮৫০টি বিও হিসাব ছিল। এর মধ্যে শেয়ার ছিল না ১৫ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯টি বিও হিসাবে। অর্থাৎ মোট বিও অ্যাকাউন্টের ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে কোনো শেয়ার নেই। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ বিও হিসাব রয়েছে, যেগুলো কখনই শেয়ার লেনদেনের জন্য ব্যবহার হয়নি।

সিডিবিএলের হিসাবে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত শেয়ার রয়েছে এমন বিও হিসাবের সংখ্যা হচ্ছে ১২ লাখ ৭৩ হাজার ২৫১টি। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শেয়ার রয়েছে এমন বিও হিসাবের সংখ্যা প্রতি বছরই কমছে। ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময়ে শেয়ার থাকা সক্রিয় বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৯১ হাজার। পরের বছর তা ১৫ লাখ ৩১ হাজারে নেমে আসে। ধারাবাহিকভাবে শেয়ার থাকা বিও হিসাবের সংখ্যা কমে গিয়ে ২০১৮ সালের জুন মাসে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৭৩০টিতে নেমে দাঁড়ায়। এক বছরে ৩০ হাজার ৪৭৯ সক্রিয় বিও হিসাবধারী পুঁজিবাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন।

২০১৮ সালের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরও পুঁজিবাজার বড় ধরনের দরপতনের মধ্যে পড়েছে। ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ও বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির প্রবণতায় তালিকাভুক্ত প্রায় ৮০ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারের দর কমে গেছে। ফলে চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। আগের বছরও সূচকটি ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পয়েন্ট হারায়। 

টানা পতনের কারণে পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর ফলে মোট বিও হিসাবের সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০১৫ সালে মোট বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ৩১ লাখ ৯৫ হাজার ৮৫২টি। ২০১৭ সালের জুন শেষে তা কমে দাঁড়ায় ২৯ লাখ ২৮ হাজারে।

আর চলতি বছরের জুন শেষে মোট বিও হিসাব দাঁড়ায় ২৮ লাখ ৯ হাজার ৮৫০টিতে। তবে দরপতন তীব্র হওয়ায় জুলাই মাস থেকে অনেক বিনিয়োগকারী বিও হিসাব নবায়ন করেননি। ফলে গত ১৯ ডিসেম্বর মোট বিও হিসাবের সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৭৭ হাজার ৮৬১টিতে। এ হিসাবে গত ছয় মাসেরও কম সময়ে ২ লাখ ৩২ হাজার বিও বন্ধ হয়ে গেছে। আর গত পাঁচ বছরে বিও হিসাবের পরিমাণ কমেছে ৭ লাখ ১৮ হাজার।

বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশিদের নামে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫২৬টি বিও রয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন কোম্পানির নামে ১৩ হাজার ১৪৪টি বিও রয়েছে। মোট বিও হিসাবের প্রায় ৬৪ শতাংশ রয়েছে একক ব্যক্তির নামে। এছাড়া নারী বিনিয়োগকারীদের নামে রয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ বিও। 

সিডিবিএলের আয়ের বড় অংশ আসে বিও হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ থেকে। ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে বিও হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি বাবদ সিডিবিএল ২৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা আয় করেছে। প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে বেশি আয় করে শেয়ার নিষ্পত্তি থেকে। সর্বশেষ হিসাব বছরে এ খাত থেকে সিডিবিএলের আয় হয় ৩৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। তবে পুঁজিবাজারে মন্দার কারণে লেনদেন কমে যাওয়ায় আগের বছরের তুলনায় শেয়ার নিষ্পত্তি বাবদ আয় কমেছে। এ সময় সুদসহ অন্যান্য আয় বেড়েছে। ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে সিডিবিএলের পরিচালন মুনাফা হয় ১০৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি। বিও হিসাব কমলেও আগের বছরের তুলনায় ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে কোম্পানির নিট মুনাফা সাড়ে ৪ কোটি টাকা বেড়েছে।