অলিতে-গলিতে এখনো রাজনৈতিক নেতাদের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতির চিহ্ন। আছে একালের পোস্টারটাও। কিন্তু তার প্রতিফলন নেই এলাকায়। নাখালপাড়া-আরজতপাড়ার সরু রাস্তা তেমনিই আছে। সেখানে সামান্য বৃষ্টিতেই জমছে পানি। সংস্কার অভাবে খানাখন্দে আরও বেহাল দশা। আর রাত-বিরাতে মাদকাসক্তদের ভিড়ে পাগলারপুলে রেললাইনে পথচারীদের ভয় কেউ দেখে না। তবে কোনো দিবসের শুভেচ্ছা জানাতে ভোলেন না নেতারা। নতুন বছর, বিজয় দিবস সব শুভেচ্ছাই জানান তারা। অবশ্য নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণায় পর নতুন করে আশ্বাস দিয়ে চলেছেন নেতারা। শুধু নাগরিকের অসুবিধাগুলোর কখনো সমাধান নেই। ফলে দীর্ঘদিনের অপ্রশস্ত রাস্তা, জলাবদ্ধতা, খানাখন্দ আর মাদকের আগ্রাসনে ‘নাকাল’ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান ওয়ার্ড কমিশনার শেখ মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে আল্লাহর রহমতে লোকজন শান্তিতে আছে।’ রাস্তাগুলোর সংস্কার কেন হচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আবার নির্বাচিত হলে রাস্তাগুলো প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ মাদকের আগ্রাসন নিয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এই কমিশনার বলেন, ‘কারে বলব ভাই বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিমœ পর্যায়ের অনেকেই এসবের সঙ্গে জড়িত।’
পরিকল্পিত, প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ, যানজটমুক্ত স্বচ্ছ ওয়ার্ড গড়ার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা। একই সঙ্গে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজমুক্ত করে ওয়ার্ডটিতে মডেল হিসেবে গড়তে চান তারা। এছাড়াও ওয়ার্ডটিতে স্থায়ী বাজার স্থাপন, কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ, খেলার মাঠ ও পাঠাগার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
ডিএনসিসির ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা হলেন– বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মজিবুর রহমান, তেজগাঁও থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল মঞ্জু, তেজগাঁও থানা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম ইকবাল, ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়েরা আফরিন রুমি ও ২৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. শহিদুল্লাহ সদু। বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হচ্ছেন ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. হাসেম মিয়া, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মামুনুর রশিদ মামুন ও ২৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মুজাহিদ।
ওয়ার্ডের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পূর্ব-পশ্চিম নাখালপাড়া সড়ক, নাখালপাড়া রেলক্রসিং ও লোকাস মোড় সড়কে প্রায় প্রতিদিন অধিকাংশ সময়ে তীব্র যানজট লেগেই থাকে। এছাড়া নাখালপাড়া, ৬, ৮ ও ১২ নম্বর গলি, আরজতপাড়া, লিচুবাগানসহ ওয়ার্ডের প্রায় ৮০ ভাগ রাস্তা অপরিকল্পিত ও অপ্রশস্ত।
ডিএনসিসির ২৫ নম্বর ওয়ার্ডটি (মহাখালী অঞ্চল-৩) আঞ্চলিক কার্যালয়ের অন্তভু©ক্ত। এ ওয়ার্ডটি সাবেক ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড ছিল। এটি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল (আংশিক) ও তেজগাঁও থানা (আংশিক) অন্তভু©ক্ত। ওয়ার্ডের পূর্বে মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, পশ্চিমে বিজয় সরণি প্রধান সড়ক, উত্তরে মহাখালী রেলক্রসিং ও দক্ষিণে আলকাতরা-তেজকুনিপাড়া-নাখালপাড়া সীমানা। এর মধ্যে রয়েছে নাখালপাড়া পূর্ব-পশ্চিম, শাহিনবাগ, আরজতপাড়া, শাহিনবাগ এলাকা। প্রায় ২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ওয়ার্ডটিতে হোল্ডিং রয়েছে প্রায় দেড় হাজার। ঘনবসতিপূর্ণ এ ওয়ার্ডে প্রায় ৭৮ হাজার ভোটার হলেও এখানে দুই লাখের বেশি মানুষের বাস।
এই ওয়ার্ডের বেশিরভাগ রাস্তায় দুটি রিকশা পাশাপাশি চলাচল করলে পথচারীদের হাঁটার সুযোগ কমে যায়। এখানে ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা ও অটোরিকশার দৌরাত্ম্য রয়েছে। সরু রাস্তায় দ্রুতগতিতে যানবাহন চলাচল করে বলে প্রায়ই এখানে নানা দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়াও রেললাইনের দুপাশে দীর্ঘদিনের অবৈধ বাজার রয়েছে। বর্তমান কাউন্সিলর শেখ মজিবুর রহমান টানা ২০ বছর ধরে কাউন্সিলরের দায়িত্বে থাকলেও ওয়ার্ডটিতে তেমন উন্নয়ন হয়নি বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। ইতিমধ্যে নগর ভবনে কাউন্সিলর বোর্ড সভার টানা তিনটিসহ আটটি সভায় অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে এ কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তখন আমি একটু অসুস্থ ছিলাম তাই উপস্থিত থাকতে পারিনি।’
তেজগাঁও থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল মঞ্জু বলেন, ‘কাউন্সিলর নির্বাচিত হলে রেললাইনে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কারসহ এলাকাকে মাদকমুক্ত করে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন করব।’
ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়েরা আফরিন রুমি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাউন্সিলর নির্বাচিত হলে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তরুণ ও নারীদের উন্নয়নে কাজ করব। পাশাপাশি ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড গড়ে তুলব।
তেজগাঁও থানা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম ইকবাল বলেন, ‘ওয়ার্ডের মূল সমস্যা হচ্ছে মাদক। সবাই মিলে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে রাস্তাঘাট সংস্কার, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন সমাজ ও আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ওয়ার্ড গড়ার লক্ষ্যে কাজ করব।’ ডিএনসিসির ২৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. শহিদুল্লাহ সদু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি যদি বলি জনগণকে হাতি-ঘোড়া দিয়ে দেব; তাইলে লাভ কী। জনগণ যদি মনে করে তাহলে ভোট দেবে।’
ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. হাসেম মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ওয়ার্ডটি আসলে অবহেলিত। ওয়ার্ডটির ভাঙা রাস্তা সংস্কার ও মাদক-সন্ত্রাস প্রতিরোধ করে পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড গড়ে তুলতে চাই।’ কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মামুনুর রশিদ মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিএনসিসির ২৫ নম্বর ওয়ার্ডটি ঘনবসতিপূর্ণ, ঘিঞ্জি ও অপরিকল্পিত। রাস্তাঘাটসহ আধুনিক ওয়ার্ড গড়ে তুলব। পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে সবাই মিলে আধুনিক পরিচ্ছন্ন সমাজ গড়তে নিরলসভাবে কাজ করব।’