কিছুদিন আগে মাদ্রিদে হয়ে গেল ২০১৯ জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন কপ-২৫। ‘অ্যাকশন ফর সারভাইভাল : ভালনারেবল নেশনস কপ-২৫ লিডার্স সামিট’ শীর্ষক ওই সম্মেলনটিকে বলা হচ্ছিল বর্তমানে বিশ্ব জলবায়ু পরিস্থিতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন। এ যাবৎ চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে একের পর এক প্রাকৃতিক প্রলয়ে বিপর্যস্ত হয়েছে বিভিন্ন দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতির ওপর সৃষ্টি হয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। খরা, দাবানল, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতÑ এমন কোনো দুর্যোগের রূপ নেই যার অভিজ্ঞতা নেয়নি বিশ্ববাসী। সেই অবস্থা থেকে একটা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কথা ছিল এই সম্মেলনে। তবে মোটা দাগে বলতে গেলে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এই সম্মেলন।
বিশেষজ্ঞদের মতে বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ার বিষয়টি ছিল চরম হতাশার। বিশেষ করে যেসব শিল্পোন্নত রাষ্ট্র পরিবেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী। তারা মনে করেন, উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো একদিকে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোকে নির্ধারিত ভর্তুকি প্রদানে অবহেলা করছে, অপরদিকে কার্বনের মাত্রা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু পরিকল্পনার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশে অস্বীকৃতি জানানোয় জলবায়ু রক্ষার্থে বেশকিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হবে, যা ভয়াবহ হতে পারে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এই ব্যর্থতার পেছনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।
এর মধ্যে প্রথম কারণ হিসেবে বলা হয়েছে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর অপেশাদারি মনোভাব। সম্মেলনে অংশ নেওয়া ১৯৬টি দেশের প্রতিনিধিদের বেশিরভাগের মধ্যেই ইস্যুটি নিয়ে পেশাদারিত্বের অভাব ছিল। ফলে তারা মুখে অনেক কথা বললেও কাজের ক্ষেত্রে এক মতে পৌঁছাতে পারেনি।
আরেকটি কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, দোষীদেরই সংকট নিরসনের দায়িত্ব দেওয়া। এএফপি বলছে, বিষয়টি ছিল অনেকটা শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেওয়ার মতো। সম্মেলনে রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিক, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিকসহ সব মিলিয়ে ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ যোগ দেন। অথচ তাদের অনেকেই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার ইন্ধনদাতা হিসেবে চিহ্নিত। তারা সবাই জানেন কী কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তীব্র হয়ে উঠছে। কিন্তু নিজেদের স্বার্থের কারণে বৈশ্বিক প্রয়োজনীয়তা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন তারা।
আরেকটি কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব। ট্রাম্প যেখানে তার দেশকে জলবায়ু চুক্তি থেকে সরিয়ে নিয়েছেন সেখানে তার মিত্র বা স্বার্থভোগী রাষ্ট্রগুলো মুখে যতই বলুক বাস্তবে হাঁটতে চায় ট্রাম্পের পথেই। এ কারণে তাদের আন্তরিকতায় ঘাটতিও থাকে। ফলে ফলপ্রসূ কিছু হয়নি।
বিশ্ব বাণিজ্যে চীনের আধিপত্য ও তাদের উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডকে দায়ী করা হয়েছে কপ-২৫ সম্মেলনে কোনো সফলতা না আসার পেছনে। কারণ তারা উৎপাদন বাড়াতে এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপরই বেশি নির্ভর করছে।
এর আগে জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক নির্বাহী সম্পাদক প্যাট্রিসিয়া এস্পিনোসাও সম্মেলনের পরপরই স্বীকার করেছেন লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার কথা। সে সময় প্যাট্রিসিয়া বলেন, এবারের এই আয়োজনটিকে বলা হচ্ছিল বর্তমানে বিশ্ব জলবায়ু পরিস্থিতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন। কিন্তু কোনো স্থির সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি ওই সম্মেলনে।