গতবার পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে পুলিশ সদর দপ্তরের দরবারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বেশ কিছু প্রস্তাব দেওয়া হলেও বাস্তবায়নে বেশিরভাগই আলোর মুখ দেখেনি। আজীবন দুই সদস্যের রেশন, বিশেষ ভাতা যৌক্তিক পর্যায়ে নেওয়া, হতাহতদের এককালীন বরাদ্দ বাড়ানো, নিজস্ব মেডিকেল কলেজ, ক্যাডার পদে জনবল বাড়ানোসহ বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিলেও দীর্ঘ এক বছরেও বেশিরভাগ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে আগামী ৫ জানুয়ারি পুলিশ সপ্তাহ-২০২০ শুরু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন।
‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার পুলিশ হবে জনতার’ স্লোগানে এবারের পুলিশ সপ্তাহ সফলে প্রস্তুতি নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করে গতবারের প্রস্তাবনার চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। পাশাপাশি নতুন প্রস্তাবনা তৈরি করছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গতবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপিত প্রস্তাবনার কয়েকটির কিছু অগ্রগতি হলেও চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। অনেকগুলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন পেলেও মন্ত্রণালয়ে এসে থমকে গেছে। এসবের মধ্যে আজীবন দুই সদস্যের রেশন প্রস্তাবটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অনুমোদন হয়ে ফের মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ শাখায় এসে থেমে আছে। বিদ্যমান বিশেষ ভাতা যৌক্তিক পর্যায়ে উন্নীতকরণ প্রস্তাবের আলোকে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাকাডেমি ও মিরপুর পুলিশ স্টাফ কলেজে কর্মরত/পদায়িতদের জন্য শর্তসাপেক্ষে ৩০ শতাংশ প্রশিক্ষণ ভাতা দিতে সম্মতি দিয়েছে অর্থ বিভাগ। এ ছাড়া প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম গাড়ি সেবা নগদায়নের সুবিধা ও বিভিন্ন ভাতা বাড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এসব প্রস্তাব বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ শাখা যাচাই-বাছাই করছে।
তারা আরও জানান, এর বাইরে কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত বা গুরুতর আহত সদস্যদের এককালীন অনুদান বৃদ্ধির খসড়া নীতিমালা অনুমোদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর ৮ এপ্রিল চূড়ান্ত সংশোধন করে নীতিমালা প্রণয়নে অনুরোধ করা হয়। নিহত পুলিশ সদস্যের পারিবারিক রেশন সুবিধা প্রস্তাবের আলোকে দুষ্কৃতিদের হামলায় নিহত ২৮ জনের পরিবারকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে নিহতরা এ সুবিধা পাননি। পরে গত ২ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ে ফের প্রস্তাব পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। আর পুলিশ এককভাবে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব দিলেও সেটি গ্রহণ করা হয়নি। তবে সব ক’টি বাহিনীর জন্য মেডিকেল কলেজ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে অবাস্তবায়িত এসব প্রস্তাবের সঙ্গে দরবারে উপস্থাপনের জন্য নতুন প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এবার হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন বাতিল, গ্রেড-১ বাড়ানো, ডিআইজির পদ বাড়ানো, সুপার নিউমারারি পদ বৃদ্ধি, নতুন ১ লাখ পুলিশ নিয়োগ, এভিয়েশনে দুটি ইউনিট চালু, আবাসন সংকট সমাধান, অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম, গাড়ির সংখ্যা বাড়ানোসহ একগুচ্ছ প্রস্তাব দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর দরবারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অবাস্তবায়িত প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে নতুন প্রস্তাবনা তুলে ধরা হবে। মন্ত্রণালয়ের ধীরগতির কারণে যেসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি তাও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হবে।
এদিকে সেবা, সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদকের (পিপিএম) জন্য চারটি ক্যাটাগরিতে ১১৮ জনের নামের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন। গতবার পুলিশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৪৯ জনকে পদক দেওয়া হয়েছিল। এবার অতিরিক্ত আইজিপি মইনুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে ৫ সদস্যের কমিটি এ তালিকা চূড়ান্ত করার পর তার গেজেট হয়েছে। উদ্বোধনের দিন প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের হাতে এসব পদক তুলে দেবেন। অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ও অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) মইনুর রহমান চৌধুরী উপস্থিত থাকবেন।
পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতির ভাষণ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দরবার, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মেলন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের সম্মেলন, আইজি’জ ব্যাজ, শিল্ড প্যারেড, অস্ত্র/মাদক উদ্ধারে পুরস্কার বিতরণ, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের পুনর্মিলনী, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইজিপির সম্মেলন ইত্যাদি। আগামী ১০ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ সংক্রান্ত মতবিনিময় সভার মধ্য দিয়ে শেষ হবে পুলিশ সপ্তাহ।