ঢামেক নার্স মৌসুমীর আত্মহত্যা

মিথ্যা পরিচয়ে বিয়ে করেন সঞ্জয়!

সমাজসেবা কর্মকর্তার মিথ্যা পরিচয় দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নার্স মৌসুমী দত্তকে (২৫) বিয়ে করেন সঞ্জয় দত্ত (৩০)। বিষয়টি জানাজানি হলে মৌসুমীর পরিবারের সঙ্গে বিবাদ শুরু হয় সঞ্জয়ের। সম্পর্কের অবনতি হয় দুজনের। স্বজনরা জানান, মৌসুমী-সঞ্জয় রাজধানীর চকবাজার এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। মৌসুমীর গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন থানার কুতুবা। তিন ভাই বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন মৌসুমী। চার বছর ধরে ঢামেক হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন তিনি। সঞ্জয়ের জন্মস্থান পটুয়াখালী হলেও তার বাবা-মা থাকেন বরিশালের সবুজবাগে।

মৌসুমীর সহকর্মী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমীকে তার বাবার বাড়ির কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে দিতেন না সঞ্জয়। একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয়। বিয়ের সাত মাসের মাথায় মৌসুমী অন্তঃসত্ত্বা হলে গর্ভপাত করতে বাধ্য করেন সঞ্জয়।

গত ২৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ফোন বন্ধ পেয়ে বাসার মালিকের ফোনে কল দিয়ে সঞ্জয়ের সঙ্গে কথা বলে মৌসুমী। এর কিছুক্ষণ পরই হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে ২৮ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১১টায় মারা যান মৌসুমী।

আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে শাহবাগ থানায় মৌসুমীর বাবা হারাধন দত্তের করা মামলায় ২৮ ডিসেম্বর রাতেই সঞ্জয়কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এক দিনের রিমান্ড শেষে আদালতের নির্দেশে তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই কামাল মুনশি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সঞ্জয়কে এক দিনের রিমান্ড শেষে গত মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার দিন মৌসুমীর সঙ্গে ফোনে ঝগড়া হওয়ার কথা স্বীকার করেছে সে। মৌসুমীর পরিবারের করা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার দিন মৌসুমী-সঞ্জয় একসঙ্গে রাজধানীর বংশাল এলাকাতে একটি ব্যাংকে যায়। সেখান থেকে টাকাও তোলে তারা। ওই দিন দুপুর ২টা পর্যন্ত তারা ধর্মীয় কারণে না খেয়ে ছিল। পরে সঞ্জয় বাসায় পিঠা খেলেও মৌসুমী না খেয়ে ছিল। ফোনে ঝগড়া হওয়ার পর সঞ্জয় ঢামেক হাসপাতালে আসে। কিন্তু এর মধ্যেই মৌসুমী আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তদন্ত শেষ হলে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।’

মৌসুমীর সহকর্মীরা জানান, সব সময় হাসিখুশি থাকতেন মৌসুমী। তবে ঘটনার দিন তার খুব মন খারাপ ছিল। অফিসেও আসেন দেরি করে। এরপর ফোনে কথা বলার এক পর্যায়ে কান্নাকাটিও করেন তিনি। স্বামীর সঙ্গে তার বিরোধের বিষয়টি সবাই জানতেন। বিয়ের ৬-৭ মাসের মাথায় মৌসুমী অন্তঃসত্ত্বা জানিয়ে সহকর্মীদের মিষ্টিও খাওয়ান।

মৌসুমীর বাবা হারাধন দত্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সঞ্জয় সরকারি কর্মকর্তার মিথ্যা পরিচয়ে আমার মেয়েকে বিয়ে করে। প্রতি মাসে বেতন পাওয়ার পর সব টাকা সে নিয়ে নিত। মেয়েকে নিজের খরচের টাকাটাও দিতে চাইত না। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দিত না। আমরা ভোলাতে থাকায় তার খবরও ঠিকমতো রাখতে পারতাম না। মৌসুমী বিয়ের মাস ছয় পরে অন্তঃসত্ত্বা হলে সেই সন্তানও নষ্ট করতে বাধ্য করে সঞ্জয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘মৌসুমী বিয়ের আগে আমার বড় ছেলে ধানমন্ডি ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ছাত্র মোহন দাসের সঙ্গে একই বাসায় থাকত। বিয়ের পরদিনই আমার ছেলেকে বাসা থেকে বের করে দেয় সঞ্জয়।’

শাহবাগ থানায় করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর মৌসুমীর সঙ্গে পারিবারিকভাবে সঞ্জয়ের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় সঞ্জয় নিজেকে সমাজসেবা অফিসার হিসেবে পরিচয় দেয়। বিয়ের অল্প দিনের মধ্যে মৌসুমীর পরিবার জানতে পারে সঞ্জয় সমাজসেবা অফিসার হিসেবে চাকরি করে না। সে একটি এনজিওর কর্মী। বিয়ের পরও বিভিন্ন মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল এবং মোবাইলে কথা বলত। এসব নিয়ে মৌসুমীর সঙ্গে প্রায়ই কলহ লেগে থাকত। বিয়ের পর থেকে মৌসুমীকে তার পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে দিত না। সে মাঝেমধ্যে যোগাযোগ করলেও স্বামীর ভয়ে মোবাইল নম্বরটি মুছে দিত। তারপরও যোগাযোগের বিষয়টি জানতে পারলে মৌসুমীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত সঞ্জয়। বিয়ের সময় ও বিয়ের পরে বিভিন্ন সময় মৌসুমীর পরিবারের কাছ থেকে সঞ্জয় প্রায় সাত লাখ টাকা এবং ১০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার যৌতুক হিসেবে নেয়। এছাড়া মৌসুমীকে চাপ দিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রায় চার লাখ ৫০ হাজার টাকা ধার নিতে বাধ্য করে। এসবের কোনো প্রতিবাদ করলে মৌসুমীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করত এবং বলত, ‘তুই মরে গেলে অনেক মেয়ে পাওয়া যাবে, তুই মরতে পারিস না। তুই মরলে আমি মুক্তি পাই।’ এভাবে বিভিন্ন সময় মৌসুমীকে আত্মহত্যার জন্য প্ররোচনা দিত সঞ্জয়।