পেঁয়াজ আবার আকাশে

বেশির ভাগ ভোগ্যপণ্য ও সেবার খরচ বাড়ায় নতুন বছরের শুরুতেই চাপে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। আয় না বাড়লেও এই ব্যয়চাপ কীভাবে মিটবে তা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা দূর করার যেন কেউ নেই। তাই পেঁয়াজকাণ্ডের মতো অন্য ভোগ্যপণ্যও একই দিকে যাচ্ছে কি না, তার শঙ্কাও করছেন অনেকে। সদ্য বিদায় হওয়া বছরের মতো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ধারায় এ বছরও শুরু হয়েছে। সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতেই গত তিন দিনে পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ৮০ টাকা। এ ছাড়া দাম বেড়েছে ভোজ্যতেল, চিনি, ময়দা, বিভিন্ন ধরনের মসলা, অধিকাংশ সবজি, মাছ ও মাংসের দাম। অনেকের বাড়িভাড়া বাড়ার তাগাদা এসেছে। আর বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবার খরচও বাড়ছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোশিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য বাড়লে ভোক্তার চাহিদা কমবে, যা অর্থনীতির জন্য খারাপ। জনজীবন মানে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। আমার কাছে মনে হচ্ছে, সরকার একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষদের ব্যাংকে রাখা টাকা ও সঞ্চয়পত্র থেকে আয় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসবের সুবিধা পাচ্ছে ওই বিশেষ গোষ্ঠী। তারা নৈতিক কিংবা অনৈতিক কাজ করছে কি না তা দেখা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ যাতে স্বস্তিতে থাকে ও ক্রয় সক্ষমতা বাড়ে সরকারের উচিত সেই ব্যবস্থা করা।’

গতকাল শুক্রবার দেওয়া টিসিবির তথ্যমতে, সপ্তাহের ব্যবধানে দেশি নতুন পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ৭০-৮০ টাকা। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে পণ্যটির দাম বেড়েছে ১৩৫-১৪৫ টাকা। গত সপ্তাহে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজের দাম ছিল ৯০-১০০ টাকা, গত বৃহস্পতিবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২০-১৩০ টাকা। আর গত বছরের একই দিন তা ছিল ২৫-৩৫ টাকা। গতকাল এই পেঁয়াজের কেজি ছিল ১৬০-১৮০ টাকা। এক দিনের ব্যবধানে দাম বড়েছে ৪০-৫০ টাকা। টিসিবির হিসাবে, বছরের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৪৬৭ শতাংশ। এ ছাড়া সপ্তাহ ব্যবধানে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম মানভেদে ১০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, দেশি পেঁয়াজ ছোট, মাঝারি, বড় ও নিম্নমানেরÑ এই চার ভাগে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। আগে এসব পেঁয়াজ সাধারণত নিম্নমান ও ভালো এই দুই ভাগে বিক্রি হতো। আর শ্যামবাজারে প্রতি কেজি দেশি নতুন পেঁয়াজ পাইকারিতে বিক্রি হয়েছে ১২০-১৩০ টাকা, চীনের ৫৫ ও মিসরেরটা ৭০ টাকা। আড়তদাররা বলছেন, শৈত্যপ্রবাহের কারণে পেঁয়াজের ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া কয়েক দিন আগের বৃষ্টিতেও পেঁয়াজের ক্ষেতে পানি জমে পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে। কৃষকরা পেঁয়াজ তুলছেন না। এ জন্য বাজারে পেঁয়াজের সংকট তৈরি হয়েছে। আরও দুই সপ্তাহ এ অবস্থা চলবে।

শ্যামবাজার বণিক সমিতির সহসভাপতি আবদুল মাজেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত মাসের শেষের দিকে বাজারে প্রচুর পেঁয়াজ আসছিল। কিন্তু দু-তিন দিন ধরে পেঁয়াজ আসা কমে গেছে। আজ তো (শুক্রবার) মাত্র ৩০ ট্রাক পেঁয়াজ ঢুকছে। আবার কৃষক যখন পেঁয়াজ লাগিয়েছেন, তখন দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম ছিল চড়া। এ জন্য তাদের খরচও বেশি হয়েছে। সব মিলিয়ে দাম বেড়েছে। আপাতত দাম কমার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।

টিসিবির তথ্যে দেখা যায়, বাজারে সপ্তাহ ব্যবধানে লিটারপ্রতি খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ৬ টাকা, বার্ষিক বৃদ্ধির হার ১৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বোতলজাত সয়াবিন তেলের বেড়েছে ২ টাকা। বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১ শতাংশ। ৫ লিটারের বোতলে বেড়েছে ১৫ টাকা, বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১ শতাংশ। খোলা পাম অয়েলের দাম বেড়েছে ৬ টাকা, বছরব্যবধানে দাম বেড়েছে ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সুপার পাম অয়েলের দাম বেড়েছে ৬ টাকা, বছরব্যবধানে দাম বেড়েছে ২২ শতাংশ। খোলা ও প্যাকেটজাত ময়দার দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ১ টাকা, আর বছরব্যবধানে খোলা আটার দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ ও প্যাকেটজাত ময়দার দাম বেড়েছে ১ শতাংশ। চিনির দাম বেড়েছে ২ টাকা আর বছরব্যবধানে দাম বেড়েছে ২৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ ছাড়া সপ্তাহব্যবধানে ফার্মের ডিমের দাম হালিতে বেড়েছে ২ টাকা ও আলু দাম মানভেদে বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারে সয়াবিন তেলের দামে বাজারভেদে ভিন্নতা রয়েছে। মহল্লার খুচরা দোকানিরা এসব তেল মোড়ক বা বোতলের গায়ে লেখা মূল্যে বিক্রি করলেও বড় দোকানগুলোতে লিটারে ২-৩ টাকা করে ছাড় দিচ্ছে। আর পাম অয়েলের দামও দোকানভেদে ভিন্ন। প্রতি লিটার লুজ পাম অয়েল সর্বোচ্চ ৮৮ ও সুপার পাম অয়েল সর্বোচ্চ ৯২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ৫ লিটারের বোতলে ছাড় দিচ্ছে সুপারশপ ও বড় দোকানিরা। এ ছাড়া বাজারে সব ধরনের ময়দার কেজিতে ১-২ টাকা করে দাম বেড়েছে। চিনির দামও কেজিতে গত সপ্তাহের চেয়ে ৩ টাকা বেড়ে ৬৬ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।

দাম বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে তেল, চিনি, আটার দাম বেড়েছে। আর সরকারও চিনি, ভোজ্যতেলে ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ করেছে। আবার পোশাকশিল্পের সুবিধার জন্য ডলারের দামও বাড়িয়েছে সরকার। এসব চাপ তো অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়বেই। আমাদের আশঙ্কা, সরকার যদি ভ্যাট-ট্যাক্স না কমায় তাহলে রমজানে এসব পণ্যের দাম আরও বাড়বে। চিনির কেজি ১০০ টাকা হতে পারে। বিষয়টি আমরা বাণিজ্যমন্ত্রীকেও জানিয়েছি।’

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, ‘ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ, বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধি ও ডলারের দাম বাড়ায় ভোজ্যতেল, চিনি, আটার দাম বেড়েছে। বিষয়টি আমরা বাণিজ্যমন্ত্রীকেও অবহিত করেছি। আমরা তো লোকসান দিয়ে পণ্য বিক্রি করব না। নিশ্চিত থাকেন, বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে সরকার যদি ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহার না করে, তবে এসব পণ্যের দাম আরও বাড়বে।’

রাজধানীর বাজারগুলোতে সবজির পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও প্রায় সব সবজির দাম এখনো চড়া। গতকাল শিমের কেজি ৫০-৬০, বেগুন ৪০-৬০, শালগম ৪০, মুলা ৩০, গাজর ৪০-৫০, পেঁপে ৩০, বরবটি ৪০-৫০, উচ্ছে ৮০-১০০, করলা ৮০, টমেটো ৫০, কাঁচামরিচ ৪০-৫০ ও নতুন আলু ৩০-৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া বাঁধাকপি-ফুলকপি প্রতিটি ৪০-৫০, মিষ্টিকুমড়া ও লাউ ৪০-৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। পুঁইশাক প্রতি আঁটি ২০, লাউশাক ২০-৩০, কুমড়াশাক ২০-২৫, পালংশাক ১০ ও লালশাক ১০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

এদিকে গতকাল মাছের দাম আরও বেড়েছে। আগের শুক্রবার রুই, কাতল, মৃগেল বড় ও ছোট দুই ভাগে বিক্রি হলেও অনেক বিক্রেতা গতকাল এসব মাছ চার ভাগে ভাগ করে বিক্রি করেছেন। প্রতি কেজি রুই, কাতল, মৃগেল ২০০-৪০০ টাকা, পাঙ্গাশ আগের দামে ১৪০, তেলাপিয়া ১৪০-১৮০, হাইব্রিড কই ২০০-২২০, পাবদা ও বাগদা ৫০০-৬০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া দেশি কইয়ের কুড়ি ৪০০-৫০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন বিক্রেতারা। বাজারে অপরিবর্তিত আছে চালের দাম।

কারওয়ান বাজারের ক্রেতা আবদুল হাকিম বলেন, বছরের শুরুতেই এমন দাম বৃদ্ধিতে আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস বের হচ্ছে, চরম মানসিক চাপে আছি। এ অবস্থায় সরকারের উচিত ভোগ্যপণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া।

এদিকে বছরের শুরুতেই অনেককে বাড়িভাড়া বাড়ানোর কথা শুনিয়েছেন বাড়িওয়ালারা। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মী সোহেল রানা বলেন, ‘দুই বছরে আমার কোনো বেতন বাড়েনি। কিন্তু নতুন বছর এলেই বাসাভাড়া বাড়ছে। এ বছর আরও ৫০০ টাকা বেড়েছে। বাজার খরচসহ সংসারের অন্যান্য ব্যয়ও বেড়েছে। এখন শুনছি বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবার খরচও নাকি বাড়বে। আয় না বাড়লে এত সব আমি কীভাবে মেটাব। দেশের উন্নতি দিয়ে আমি কী করব?’