ভিডিও প্রকাশের সবচেয়ে বড় অনলাইন মাধ্যম ইউটিউবে সময় দেন না এমন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীকে বর্তমানে খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ এটি যে এখন বিনোদন, খবর, শিক্ষা, বিপণন ও আয়ের বড় উৎসও। এই মাধ্যমে বহুমাত্রায় আয়ের পথ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে প্রবল ঝোঁক সৃষ্টি করেছে, আয়ের বড় ক্ষেত্রও সৃষ্টি হচ্ছে। বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী তরুণরাই এ ক্ষেত্রে অগ্রগামী। শুধু প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষিত বেকার নয়, অনেকে চাকরি বা ব্যবসার পাশাপাশি বিকল্প আয়ও করছেন উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে। ফলে জনবহুল এই দেশের বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দারুণ সুযোগও যেন হাতছানি দিচ্ছে ইউটিউবে। তাই এই অর্থনীতির বিকাশে সংশ্লিষ্টরা চান সরকারের সহযোগিতা।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) হিসাব মতে, সর্বশেষ গত নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটি ৯৫ লাখ ৫০ হাজার। এর মধ্যে শুধু মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন ৯ কোটি ৩৩ লাখ ১৫ হাজার মানুষ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে ইন্টারনেট সুবিধা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফেইসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। বর্তমানে দেশের কয়েক হাজার মানুষ ইউটিউবে কাজ করছেন। যদিও বর্তমানে বাংলাদেশে কতজন ইউটিউবার রয়েছেন তার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। তবে দেশের অন্যতম ইউটিউব ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান বঙ্গবিডি বলছে, বাংলাদেশে নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করছে এমন চ্যানেলের সংখ্যা বর্তমানে তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে। গত পাঁচ বছরে দেশে চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ।
দেশে ফোরজি ইন্টারনেট সেবা আসার পর আগের চেয়ে ইউটিউবে বেশি সময় দিচ্ছেন মানুষ। গুগলের ইন্টারনাল ডেটামতে, ২০১৮ সালের অক্টোবরে ৪৭ শতাংশ বিনোদন, ২৪ শতাংশ সংগীত, ১৭ শতাংশ জীবনধারা, ৮ শতাংশ সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং বাকি ৪ শতাংশ খেলাধুলা ও জ্ঞানবিষয়ক ভিডিও দেখার জন্য ইউটিউবে সময় দিয়েছেন দর্শকরা, যার ৬০ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। সম্প্রতি গুগল তাদের প্রেস উইংয়ের মাধ্যমে জানিয়েছে, বিশ্বে এখন পর্যন্ত ইউটিউবের মোট দর্শকের সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি এবং প্রতিদিন ১০০ কোটি ঘণ্টা ভিডিও দেখা হয় ইউটিউবে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সংস্থা ও অনলাইন পত্রিকা, সংগীত প্রতিষ্ঠান, প্রচার ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। এর বাইরে গায়ক-অভিনেতা-তারকাসহ কয়েক হাজার ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। ইউটিউব চ্যানেলের র্যাংকিং নিয়ে কাজ করা ওয়েবসাইট সোশ্যাল ব্লেডের হিসাব মতে, দেশে ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাবস্ক্রাইবার ‘মায়াজাল’ নামের চ্যানেলটির। কয়েকজন তরুণ এই চ্যানেলটিতে কাজ করেন বলে জানা গেছে। চ্যানেলটিতে বর্তমানে সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ৩০ লাখ ৬৪ হাজার। চ্যানেলটি থেকে প্রতি মাসে গুগল থেকে আয় আসে আনুমানিক ২ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা। দেশে সাবস্ক্রাইবার সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ‘ফারজানা ড্রইং অ্যাকাডেমি’ নামের একটি ড্রইং চ্যানেল। ফারজানা নামে এক তরুণী ঘরে বসে একাই চ্যানেলটি পরিচালনা করেন। বর্তমানে চ্যানেলটির সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ৩০ লাখ ২৪ হাজার। এই চ্যানেলটি থেকে প্রতি মাসে আয় আনুমানিক দেড় থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। এভাবেই ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও বানিয়ে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে রয়েছে ‘তৌহীদ আফ্রিদী’ নামের চ্যানেলটি। কৌতুকবিষয়ক ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে জনপ্রিয়তায় এগিয়েছে ‘আজাইরা লিমিটেড’। সিরাজগঞ্জে বসেই বাংলাদেশের সংস্কৃতি তুলে ধরছে ‘এরাউন্ড মি বিডি’ নামের চ্যানেলটি। টেক রিভিউ বানিয়ে ইতিমধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে ‘এটিসি অ্যান্ড্রয়েড টোটো কোম্পানি’ নামের চ্যানেলটি। রান্নাবান্নাবিষয়ক চ্যানেলের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ‘কুকিং স্টুডিও বাই উম্মে’। দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে জনপ্রিয় খাবারের রিভিউ করে জনপ্রিয়তায় রয়েছেন এক সময়ের জনপ্রিয় নাট্যাভিনেতা আদনান ফারুক। তার চ্যানেলটির নাম ‘আদনান ফারুক’।
‘বাংলাদেশি ফুড রিভিউয়ার’ চ্যানেলটির কনটেন্ট ক্রিয়েটর মাহাথির মোহাম্মদ ফাহিম চাকরি ছেড়ে মনোযোগী হয়েছেন ইউটিউবে। চাকরি ছেড়ে ইউটিউবকে বেছে নিয়েছেন কেন জানতে চাইলে মাহাথির মোহাম্মদ ফাহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক বছর আগে শখের বসে ইউটিউব শুরু করি। এখন ইউটিউবিং আমার একমাত্র পেশা। শুধু আমি নই, ইউটিউব থেকে আয় করে বর্তমানে অনেক তরুণ নিজের পড়াশোনা এমনকি সংসার চালাচ্ছেন। ২০২৫-২৬ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ইউটিউবারের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেড়ে যাবে বলে আমার ধারণা।’
২০১৫ সালে ‘টেন মিনিট স্কুল’ নামে ইউটিউব চ্যানেল খোলেন শিক্ষা উদ্যোক্তা আয়মান সাদিক। চ্যানেলটির মাধ্যমে অনলাইনে শিক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন তথ্য ও সহযোগিতা বিনামূল্যে দেওয়া হয়ে থাকে। এই উদ্যোগ ঘিরে বর্তমান প্রায় অর্ধশতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া কাজ করছেন। মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানি রবিসহ কিছু এনজিও এই প্রতিষ্ঠানকে অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকে।
বহুমাত্রিক আয়ের ক্ষেত্র : বর্তমানে বাংলাদেশি ইউটিউবারদের বহুমাত্রিক আয়ের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিও প্রকাশ করলে গুগল অ্যাডসেন্সের মাধ্যমে আয়ের পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন বিজ্ঞাপন সংস্থা বা কোম্পানির সরাসরি বিজ্ঞাপন পাওয়া যাচ্ছে ইউটিউব চ্যানেলে। এমনকি ইউটিউবার নিজেই নিজের বা অন্যের প্রোডাক্ট বা সেবা প্রচারের মাধ্যমে তার ব্যবসায় উন্নতি করছেন। চ্যানেল থেকে আয়ের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই বলে জানিয়েছেন ইউটিউবাররা। তবে একটি চ্যানেল থেকে মাসে সর্বনিম্ন ৮ হাজার থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত আয় করা সম্ভব বলে তারা জানিয়েছেন।
ইউটিউব থেকে আয় নিয়ে টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা ঠিক যে ইউটিউব অনেক বড় একটি মাধ্যম মেধা ও প্রতিভা প্রকাশের।’ তবে পেশা হিসেবে ইউটিউব বেছে নেওয়ার সময় এখনো আসেনি বলে তার মত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘বাংলাদেশ ইউটিউবারস কমিউনিটি’ নামে সংগঠনের আহ্বায়ক হৃদয় চৌধুরী বলেন, ‘শখের বসে এবং আয়ের উৎস হিসেবে ইউটিউবকে ব্যবহার করলেও দেশের বেকার সমস্যা কিছুটা হলেও দূর হচ্ছে। তাছাড়া ইউটিউবাররা দেশের অর্থনীতিতে যেমন ভূমিকা রাখছেন, তেমনি দেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতেও বিশাল ভূমিকা রাখছেন। ফলে আমাদের দিকে সরকারের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।’
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউটিউবাররা দেশের জন্য বিদেশি মুদ্রা আনছেন এটা খুবই ইতিবাচক। সরকারের উচিত হবে তাদেরকে আরও সহযোগিতা করে এগিয়ে নেওয়া। তবে ইউটিউবারদেরও উচিত হবে দেশের সংস্কৃতি, রীতিনীতি এবং নৈতিকতা মেনে কনটেন্ট তৈরি করা।’
বাংলাদেশে ইউটিউবারদের সীমাবদ্ধতা : ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশ করলেই যে আয় করা যায় বিষয়টি এমন নয়। কোনো চ্যানেল খোলার পর বছরে ১ হাজার সাবস্ক্রাইবার ও ৪ হাজার ঘণ্টা ভিউ অর্জন করলে চ্যানেলটিতে আয়ের জন্য বা বিজ্ঞাপনের (মনিটাইজেশন) জন্য আবেদন করতে পারে চ্যানেলটি। এরপর যাচাই-বাছাই করে গুগল আবেদনটি অনুমোদন করতে পারে আবার নাও করতে পারে। এছাড়া ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে কপিরাইট ও কমিউনিটি গাইডলাইন নামে দুটি ক্যাটাগরিতে ইউটিউবের নিজস্ব কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। যদিও এটাকে কোনো প্রতিবন্ধকতা নয় বরং ইউটিউবকে পরিচ্ছন্ন রাখতে এই নিয়মের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশি ইউটিউবাররা। এছাড়া বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভিডিও প্রকাশ করতে হবে বলেও জানান তারা। তবে বাংলাদেশের ইউটিউবাররা সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতার শিকার হন মনিটাইজেশন (গুগলের অনুমোদিত বিজ্ঞাপন) নিয়ে। চ্যানেলের লোকেশনে ‘বাংলাদেশ’ নামটি ব্যবহার করলেও এখন পর্যন্ত গুগল মনিটাইজেশন দেয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘সোহাগ ৩৬০ ডিগ্রি’ নামের চ্যানেলটির কনটেন্ট ক্রিয়েটর সোহাগ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার চাইলে এর সমাধান করতে পারে। কিন্তু কী কারণে বাংলাদেশকে গুগল মনিটাইজেশন দেয় না সেটা বোধগম্য নয়।’
অনেক সম্ভাবনা : বাংলাদেশে তরুণ সমাজের জন্য ইউটিউব প্ল্যাটফর্মটি অনেক বড় সম্ভাবনার হয়ে উঠতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বেসিসের প্রেসিডেন্ট মো. সৈয়দ আলমাস কবির। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু ভিডিও কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে দেশের অনেক তরুণ ইউটিউবের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনছেন, ফলে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো এই ক্ষেত্রটিও অনেকখানি সম্ভাবনার হয়ে উঠতে পারে। দেশের বিশাল জনশক্তিকে ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশের জন্য দক্ষতা অর্জনে সরকারের কাজ করা উচিত।’