নতুন মোড়কের র‌্যাগিংয়ে অতিষ্ঠ বেগম রোকেয়ার শিক্ষার্থীরা

বুধবার সকাল ১০টা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার সামনের মাঠ,স্বাধীনতা স্মারক ও শহীদ মিনার, পুলিশ ফাঁড়ি সংলগ্ন ১ নম্বর খেলার মাঠ এবং বঙ্গবন্ধু হলের পেছনের মাঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীদের পরিচিত হওয়ার জন্য ডেকেছেন।

এ সময় নবীনদের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে কীভাবে চলাফেরা করতে হবে সে বিষয়ে 'শিক্ষা' দেন।তারা সিনিয়রদের নাম মুখস্থ করান। ফেইসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে বাধ্য করেন। আচরণ শেখানোর নামে বিভিন্ন শাস্তি দিতে থাকেন। দুপুর প্রায় ১টা পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলে।

'পরিচিতি পর্বে' অংশ নেওয়া ১ম বর্ষের কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, ডিপার্টমেন্টের বড় ভাইয়েরা সকাল ১০টায় মাঠে ডাকেন। সেখানে বড় ভাই-আপুরা আমাদের সঙ্গে পরিচিত হন। তারপর আমাদের ছোটখাটো অপরাধ যেমন সালাম না দেওয়া, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে বিলম্ব হওয়া, সিনিয়রদের নাম মুখস্থ করতে দেরি হওয়া, পরিচিতি পর্বে আসতে দেরি হওয়াসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে মানসিক নির্যাতন চালান।
এ সময় সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে আরো কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ১ জানুয়ারির উদ্বোধনী সমাবর্তন অনুষ্ঠানের পর থেকে এ নির্যাতন চলছে। প্রায় প্রতিদিন ক্লাসের আগে কিংবা পরে ইমিডিয়েট সিনিয়ররা ক্লাসরুম কিংবা মাঠে ডাকেন। সেখানে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা পরিচিতি ও আচরণ শেখানোর কার্যক্রম চলে। এরপর আবার বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় ব্যাচের সবাইকে নিয়ে সিনিয়রদের সঙ্গে দেখা করতে হয়। এ ছাড়া প্রতিদিন ব্যাচ থেকে কয়েকজন ছাত্রকে চিহ্নিত করে 'স্পেশাল পর্বে'র জন্য বড় ভাইদের মেসে ডেকে পাঠানো হয়।

এই 'স্পেশাল পর্বে' অংশ নেওয়া কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থী নিজেদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ক্যাম্পাসে আসার পর থেকে আমাদের ভুলগুলো সিনিয়ররা আইডেন্টিটিফাই করে রাখেন, এবং নির্দিষ্ট দিনে ডাকেন। স্পেশাল পর্বের শুরুতে কয়েকজন সিনিয়র গল্পগুজব করেন। একপর্যায়ে আরো কয়েকজন সিনিয়র এসে তাতে যোগ দেন। এ সময় দাঁড়িয়ে সালাম না দেওয়ার অপরাধে সবাইকে এক পা খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেন। যারা দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না তাদের গান অথবা নামতা বলতে হয়। এ দুটিতে ব্যর্থ হওয়ার পর কাঠি দিয়ে রুমের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপতে হয়। স্পেশাল পর্ব শেষে পার্শ্ববর্তী রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়ার পর এ অভিজ্ঞতা কাউকে বলতে নিষেধ করা হয়। নিষেধ অমান্য করলে ক্যাম্পাসে থাকতে না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, আমরা শুধু পরিচিত হতে যাই। জুনিয়ররা যাতে কোনো বিপদে না পরে সে জন্য ক্যাম্পাস এবং আশপাশের এলাকা সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করি। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সহযোগিতা করি। তবে মাঝেমধ্যে দু একজন একটু কড়া আচরণ করেন বলে জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ক্যাম্পাসে র‌্যাগিং নিষিদ্ধ থাকায় এর নতুন নাম দিয়েছে 'পরিচিতি পর্ব'। হলে র‌্যাগ দিলে জানাজানি হওয়ার আশঙ্কায় মেসগুলোতে র‌্যাগিং দেওয়া হচ্ছে। 
র‌্যাগিং একটি অপরাধ উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক নূর আলম সিদ্দিক বলেন, র‌্যাগিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালান হয়। ক্যাম্পাসে ইতিমধ্যে র‌্যাগিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে।আমি নবীন শিক্ষার্থীদের বলব যদি তারা র‌্যাগিংয়ের স্বীকার হয়, তবে ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা  দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট যেকোনো দপ্তরে যেন অভিযোগ করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আতিউর রাহমান এক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন, র‌্যাগিং একটি সামাজিক অপরাধ। এর ফলে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশের বিঘ্ন হয়। র‌্যাগিংয়ের স্বীকার শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, কোথাও কোনো প্রকার র‌্যাগিং করা যাবে না। কেউ র‌্যাগিং করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।