মাধুর্যপূর্ণ ভাষা দিয়ে মুহূর্তেই কারও মন জয় করা যায়। আবার কর্কশ ভাষা অন্যের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে। অশ্রাব্য ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা এবং অহেতুক বাচালতা যেকোনো সমাজে নিন্দনীয়।
সংস্কৃতিবান মানুষ অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে বিরত থাকেন। এটা তাদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়ী, যারা অসার কার্যকলাপ বা অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ১-৩)
রাসুল (সা.) বলেন, ‘ব্যক্তির জীবনে ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তার অহেতুক কথা ও কাজ ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৮)
ব্যক্তিত্বের গুণ বোঝা যায় আচরণ-উচ্চারণে। মান-মর্যাদাও প্রকাশ পায় ব্যবহারে। অহেতুক কথা বিপদ টেনে আনতে পারে। তাই ইসলামে বাকসংযমের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা সংরক্ষণের জন্য তার কাছেই (অদৃশ্য) তৎপর প্রহরী রয়েছে।’ (সুরা ক্বাফ, আয়াত : ১৮)
কথার মাধ্যমে ভাববিনিময় মানুষের জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। ইসলাম মুখ তালাবদ্ধ করে রাখতে বলেনি। বরং নম্রভাবে ও বিনয়ের সঙ্গে কথা বলতে আদেশ দিয়েছে। নিজেকে প্রভু দাবিদার ফিরাউনের কাছে হজরত মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে যখন পাঠানো হয়, তখন আল্লাহতায়ালা তাদের আদেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলবে। (এতে) হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় পাবে।’ (সুরা ত্বাহা, আয়াত : ৪৪)
হজরত লোকমান (আ.) তার পুত্রের প্রতি অনেক উপদেশ দিয়েছিলেন। তার কিছু উপদেশ আল্লাহ পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন। এক স্থানে তিনি বলেন, ‘সংযতভাবে তুমি তোমার পা পরিচালনা করবে আর তোমার কণ্ঠস্বর নিচু রাখবে। নিশ্চয়ই কণ্ঠস্বরের মধ্যে গাধার কণ্ঠস্বরই সবচেয়ে অপ্রীতিকর।’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৯)
কখনো কখনো হয়তো বিতর্ক ও বাগ্বিতণ্ডার মুখোমুখি হতে হয়। যুক্তিতর্ক ও বিবাদ জীবনের গতি ব্যাহত করে। তাই বলে শালীনতার সীমা অতিক্রম কখনোই করতে নেই। বরং বাকসংযমের পাশাপাশি মার্জিতভাব রক্ষা করতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা উত্তম পন্থায় আহলে কিতাবের সঙ্গে যুক্তিতর্ক করবে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৪৬)
কাউকে কটাক্ষ করা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত করা এবং মন্দ বিশেষণে ভূষিত করা ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অন্যের প্রতি দোষারোপ কোরো না এবং একে অন্যকে মন্দ নামে ডেকো না; ইমান আনার পর মন্দ নামে ডাকা অতিনিন্দনীয়।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১১)
একজন সত্যিকার মুমিন বান্দার মৌলিকত্ব ফুটে ওঠে চিন্তা-আদর্শ, মননশীলতা, চলন-বলন ও সর্বোপরি জীবনের সামগ্রিকতায়। তাই জীবনাচারে মার্জিতভাব, বাক্য ব্যবহারে পরিমিতিবোধ বজায় রাখা প্রতিটি মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য। সাহাবি মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) একবার রাসুলের কাছে জানতে চাইলেন, ‘আমরা কি নিজেদের কথার জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হব?’ রাসুল (সা.) উত্তর দিলেন, ‘ওহে জাবালের পুত্র! তোমার কথায় অবাক হতে হয়, জিহ্বার কারণেই তো (বহু) মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬১৬)
আরেক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে তার জিহ্বা ও লজ্জা স্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারবে, আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিতে পারব।’ (বুখারি, হাদিস : ৪০৩৮)
মহানবী (সা.) মানবজাতির অনুকরণীয় মহান উদার, বিনয়ী ও নম্র ব্যক্তিত্ব। তিনি উত্তম চরিত্র ও মহানুভবতার আধার। অবিস্মরণীয় ক্ষমা, মহানুভবতা, বিনয়-নম্রতা, সত্যনিষ্ঠতা প্রভৃতি চারিত্রিক গুণ দিয়েই তিনি বর্বর আরব জাতির আস্থাভাজন হয়েছিলেন। তিনি যে সৎচরিত্রের অধিকারী ছিলেন, তা সকলে একবাক্যে অকপটে স্বীকার করেছে। তিনি মানুষকে সদাচরণ, উত্তম ব্যবহার ও সততার মাধ্যমে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তার চারিত্রিক গুণাবলি সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি সুমহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ (সুরা আল-কালাম, আয়াত: ৪)
সব মানুষের জন্য অকৃত্রিম ও মহান আদর্শ। কল্যাণকর প্রতিটি কাজেই তিনি সর্বোৎকৃষ্ট। তার অসাধারণ চারিত্রিক মাধুর্য ও অনুপম ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আল-আহজাব, আয়াত: ২১)
তাই কথাবার্তা, বাক্যালাপ, আচার-আচরণ ও সামগ্রিক জীবনযাত্রায় মহানবী (সা.)-এর আদর্শ হোক প্রতিটি মুমিনের অনুসরণীয়।