বার্সেলোনা গত পাঁচ ম্যাচে জিতেছে মাত্র একটি; ড্র ৩টিতে। হার একটি। কিন্তু জেদ্দায় সুপারকোপার সেমিফাইনালে আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে ২-৩ গোলের সেই হার মেনে নিতে পারেননি কাতালান ক্লাব কর্র্তৃপক্ষ। এরনেস্তো ভালভার্দেকে পারলে সেদিনই বাদ দিয়ে দেয় তারা। ক্লাবের ‘সোনার ছেলে’ জাভি হার্নান্দেজের কাছে ছুটে যায় দুই ক্লাব কর্মকর্তা। প্রস্তাব দেওয়া হয় পরের ম্যাচ থেকেই দায়িত্ব নেওয়ার। সাবেক ক্লাবের কোচ হওয়ার স্বপ্ন তো দেখেন জাভি, কিন্তু তা মাঝ মৌসুমে নয়। আল-সাদকে অপ্রস্তুত অবস্থায় রেখে যেতে চাননি তিনি। তাই নতুন মৌসুম অর্থাৎ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন সাবেক প্লেমেকার। শনিবার জাভির উত্তর পাওয়ার পর সঙ্গে-সঙ্গে কিছু জানায়নি বার্সেলোনা। তবে রবিবার স্প্যানিশ সময় বিকাল ৪টা থেকে টানা ৪ ঘণ্টার মিটিং করেন ক্লাব কর্র্তৃপক্ষ। সভা শেষে রাত সোয়া ৯টায় জানানো হয়- তাদের ‘এখনই কোচ হওয়ার’ প্রস্তাবে রাজি হওয়ায় এনরিকে ‘কিকি’ সেতিয়েন সোলারকে আড়াই বছরের জন্য কোচ হিসেবে নিযুক্ত করা হলো। ২০২২-এর জুন পর্যন্ত সিনিয়র দলের দায়িত্ব পালন করবেন ৬১ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ। ২০০৩ সালের পর এবারই প্রথম মৌসুমের মাঝপথে কোনো কোচকে ছাঁটাই করল বার্সা। রবিবার রাতে দুটি বিষয় নিয়ে হয়েছিল বার্সার বোর্ড মিটিং। একটি ভালভার্দের বিদায় অপরটি নতুন কোচ নিয়োগ দেওয়া। নতুন কোচ আনা নিয়েই সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয় ন্যু ক্যাম্প স্টেডিয়ামে হওয়া বার্সার আলোচনা সভায়। বার্সার পছন্দের তালিকা ছিল বেশ বড়। শীর্ষে ছিলেন জাভি, যিনি এই মুহূর্তে দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন কাতারের দল আল সাদের সঙ্গে চুক্তি থাকায়। এছাড়া পরের অবস্থানেই ছিলেন ক্লাবের সাবেক ডাচ ডিফেন্ডার, অধিনায়ক রোনাল্ড কোমান। তিনি ব্যস্ত নেদারল্যান্ডস জাতীয় দল নিয়ে, সামনেই ইউরো কাপ। তার জন্যও জুন পর্যন্ত অপেক্ষা। এছাড়া মরিসিও পোচেত্তিনো, ম্যাসিমিলিয়ানো অ্যালেগ্রি, রবার্তো মার্তিনেজ, থিয়েরি অঁরি, বার্সা ‘বি’ দলের কোচ গার্সিয়া পিমিয়েন্তা ও কিকি সেতিয়েন। এদের মধ্যে একমাত্র সেতিয়েনকেই সবদিক থেকে পছন্দ হয় বার্সার। পছন্দ হওয়ার অন্যতম কারণ বার্সার ফুটবল দর্শনের সঙ্গে এই কোচের কোচিং দর্শনের মিল, তা হলোÑআক্রমণনির্ভর ফুটবল। এছাড়া সেতিয়েনকে প্রস্তাব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাওয়ায় দুইয়ে-দুইয়ে চার মিলে যায়।
শুধু এই মুহূর্তে নয় বার্সেলোনায় সেতিয়েনের আসার ব্যাপারে আরও আগেই আলোচনা হয়েছিল। গত বছর তার অধীনেই রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা- দুই জায়ান্টের বিপক্ষে ‘ডাবল’ অর্জন করে রিয়াল বেতিস। এ ক্ষেত্রে ‘ডাবল’ মানে দুই জায়ান্টকে তাদের মাঠে গিয়ে হারানো। ২০১৮’র ১১ নভেম্বর বার্সাকে ন্যু ক্যাম্পে ৪-৩ এবং পরে সান্তিয়াগো বার্নাবুতে রিয়ালকে ২-০ গোলে হারিয়ে এসেছিল সেতিয়েনের বেতিস। তা সত্ত্বেও ২০১৮-১৯ লা লিগায় ১১তম হয় বেতিস। তাই সেতিয়েনের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেনি তারা। এরপর থেকে অবসরেই ছিলেন সেতিয়েন। তাই চলতি মৌসুমের শুরুতেই ভালভার্দেকে সরিয়ে তাকে কোচ করার জোর দাবি উঠেছিল। এটাও তার সঙ্গে বার্সার মিলে যাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। গতকাল আনুষ্ঠানিক চুক্তির পরই মেসিদের দায়িত্ব নেন সেতিয়েন। রোববার লা লিগায় গ্রানাদার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ তার।
স্পেনের সবচেয়ে অভিজ্ঞ কোচদের একজন এই সেতিয়েন। প্রায় ২০ বছর ধরে স্প্যানিশ বিভিন্ন ক্লাবে কোচিং করিয়েছেন। উত্তর স্পেনের সান্তান্দার শহর থেকে উঠে আসা এই কোচের শুরুটা হয়েছিল খেলোয়াড়ি জীবন দিয়েই। শুরুতে বিচ ফুটবল খেলতেন। পরে মিডফিল্ডার হিসেবে ফুটবল মাঠে। স্পেন জাতীয় দলে মাত্র তিন ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়েছে তার। ছিলেন ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ দলেও, যদিও খেলা হয়নি। নিজ শহরের ক্লাব রেসিং সান্তান্দারের হয়ে কাটিয়েছেন ২ ধাপ মিলিয়ে এক যুগেরও বেশি। সান্তান্দার ক্লাব তার সুনাম ছিল ‘দি মাস্টার’ হিসেবে। এই সান্তান্দারের দায়িত্ব দিয়েই ২০০০ সালে শুরু করেন কোচিং ক্যারিয়ার। সেখানে দুই মৌসুম পার করে পোলিদেপোর্তিভো এজিদো ক্লাবের দায়িত্ব নেন। তিন বছর পর আফ্রিকার দেশ ইকুয়াটেরিয়াল গিনির জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন। বছর খানেক বাদেই ফিরে আসেন দেশে। এবার নিজের ক্যারিয়ারের অপর ক্লাব লোগ্রোনেসের হয়ে কোচিং শুরু করেন। দুই মৌসুম পর দায়িত্ব নেন লুগোর। ছিলেন ছয় বছর। ২০১৫-তে লাস পামাসে যোগ দেন। দলটিকে রেলিগেশন থেকে তুলে নেন লা লিগায়। পরের মৌসুমে দলটি ১১তম হয়ে শেষ করে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে যোগ দেন রিয়াল বেতিসে। প্রথম বছরেই দলটিতে তুলে নেন ষষ্ঠ অবস্থানে। তাতে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইউরোপা লিগে খেলে বেতিস এবং প্রথমবারেই গ্রুপ পর্ব পেরোয় দলটি।
টোটাল ফুটবলের জনক ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ বার্সেলোনার কোচ ছিলেন ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত। সে সময়েই লা লিগার এক ম্যাচে ক্রুইফের কোচিং-দর্শনের ভক্ত হয়ে যান সেতিয়েন। সেই ম্যাচের স্মৃতিচারণ করে গত বছর এক অনুষ্ঠানে সেতিয়েন বলেন, ‘এখনো মনে পড়ে যখন ইয়োহান ক্রুইফের বার্সেলোনা আমাদের মাঠে এলো। ওদের সঙ্গে পুরো ম্যাচে বলের পেছনেই ছুটলাম। বল পাওয়া খুব কঠিন ছিল। নিজেকে বললাম- এটাই তো আমি পছন্দ করি। আমি তার দলে যেতে চাই, বুঝতে চাই কেন ও কীভাবে এসব হচ্ছে। কীভাবে একটা দল স্থায়ীভাবে বল রেখে দিচ্ছে নিজেদের কাছে আর বিপক্ষ দল বলের জন্য ছুটে মরছে। সে সময় থেকে আমি এটা নিয়ে ভাবতে থাকি। দেখলাম এতে আক্রমণ করা সহজ হয়। যখন কোচ হই তখন এটাই ফলো করার চেষ্টা করি।’ দাবা খেলার অনুরক্ত সেতিয়েনের প্রিয় ফরমেশন ৪-২-৩-১। বেশির ভাগ সময় এই ফরমেশনই অনুসরণ করেন তিনি। ক্রুইফ-দর্শনের ভক্ত একজন বার্সেলোনার দায়িত্বে এলেন। কি আবারও ক্রুইফ যুগ, সে-সময়ের সাফল্য ফিরতে যাচ্ছে বার্সায়!
দায়িত্ব পাওয়ার পর ক্লাবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি শেষে গতকালই সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হন কিকি সেতিয়েন। জানালেন বার্সার কোচ হওয়ার তার স্বপ্নেও ছিল না, ‘আমি স্বপ্নেও ভাবিনি এখানে কখনো (কোচ হিসেবে) আসব। আজ আমার জন্য বিশেষ দিন। আমাকে যারা নির্বাচন করেছেন তাদের ধন্যবাদ দিতে চাই। আমি এই চ্যালেঞ্জ ও প্রজেক্ট শুরু করার জন্য উদগ্রীব।’
বার্সার হয়ে নিজের লক্ষ্যের ব্যাপারে জানান নতুন কোচ। একই সঙ্গে মেসির সঙ্গে দারুণ একটি সম্পর্ক তৈরির ব্যাপারেও আশাবাদী এই কোচ, ‘এখানে আমার লক্ষ্য হলো সব জেতা। তার সঙ্গে ভালো খেলা। কারণ আমরা সবাই জানি কোনো কিছু জিততে হলে ভালো খেলাও প্রয়োজন। গত কয়েক বছর ধরেই মেসিকে দেখছি এবং তার খেলা উপভোগ করছি। শুধু মেসি নয়, পুরো বার্সা দলই আমাকে সময়ে সময়ে আনন্দ দিয়েছে। ওদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিও। ফুটবলারদের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক তৈরির ব্যাপারে এবং দারুণ কিছু অর্জনে আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী।’ মাঝ মৌসুমে কোচ পরিবর্তনের কারণ বলেছেন বার্সা প্রেসিডেন্ট, ‘আমরা জানতাম দলের ডায়নামিক্স উন্নতি হতে পারে। এটা নিয়ে ভালবার্দের সঙ্গে কথাও হয়েছে। তার সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ ও সহজ সম্পর্ক ছিল।’ নতুন কোচের আগমনে ছন্দ আর গতিশীলতা আসবে দলে এবং সব শিরোপা জিতবে বলে আশা করেন তিনি।