অস্ট্রেলিয়ায় এক থেকে লাখো উটের গল্প

অস্ট্রেলিয়াতেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বুনো উট রয়েছে। ধারণা করা হয়, এই দ্বীপ মহাদেশটির বিশাল শুষ্ক অঞ্চলে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানো উটের সংখ্যা অন্তত ১০ লাখ। সংখ্যাধিক্যের জন্যই অস্ট্রেলিয়ান সরকার এবার ১০ হাজার উট মেরে মেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় এত উট এলো কীভাবে, যেখানে ১৮৪০ সালের আগে একটি উটও ছিল না! লিখেছেন পরাগ মাঝি

মুক্ত উটের দেশ অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ায় মানুষের বসতি শুরু হয়েছিল ৫০ থেকে ৬০ হাজার বছর আগে। যদিও সপ্তদশ শতকের আগ পর্যন্ত বহির্বিশ্বের মানুষ এ দ্বীপ মহাদেশ সম্পর্কে খুব কমই জানত। ১৬০৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা রেখেছিলেন ডাচ অভিযাত্রী উইলেম জেন্সজোন। মতপার্থক্য থাকলেও, অনেকে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে পা রাখা প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে তাকেই চিহ্নিত করেন। বিশাল এই ভূখন্ড টিতে তখন শুধু আদিবাসীরাই বাস করত।

অস্ট্রেলিয়ায় পা রাখার পর সেখানে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন জেন্সজোন। সমুদ্রপথে অস্ট্রেলিয়ার চারপাশ তো বটেই, দেশটির বিশাল ভূখন্ডে ও এখনকার দিনের পর্যটকদের মতো ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। তারপর আরও অসংখ্য অভিযাত্রী অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা রেখেছেন এবং উপনিবেশ স্থাপন করেছেন। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম উটটি পা রেখেছিল ১৮৪০ সালে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াকেই বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বুনো উটের দেশ। ধারণা করা হয়, এখন সেখানে ১০ লাখেরও বেশি বুনো উট রয়েছে। দেশটির মূল ভূমির বিস্তীর্ণ মরুভূমি ও জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে বিচরণ করে এসব উটের অসংখ্য পাল। এ প্রাণীটির সংখ্যাধিক্য বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, দেশটির উটের সংখ্যা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে অন্তত ১০ হাজার উটকে মেরে ফেলার অনুমোদন করা হয়।

উটের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের এ ধরনের প্রচেষ্টা এর আগেও চালিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু এ ধরনের সিদ্ধান্তকে অমানবিক আখ্যায়িত করেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু প্রশ্ন হলো কীভাবে এ প্রাণীটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পৌঁছাল আর কেনইবা এরা দেশটির সরকারের মাথাব্যথার কারণ হলো?

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম উট

১৮০ বছর আগেও অস্ট্রেলিয়ার মরুময় শুষ্ক অঞ্চলে উটের কোনো চিহ্নই ছিল না। দেশটিতে ঘাঁটি গেড়ে বসা ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীই প্রথম এ প্রাণীটির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা বিস্তীর্ণ এ দেশের মরুময় ও দুর্গম অঞ্চলগুলোকে আবিষ্কারের নেশায় মেতে ওঠে। সে সময় মোটরগাড়ি কিংবা রেললাইনের মতো কোনো যোগাযোগমাধ্যম না থাকায় মরুভূমিতে যাতায়াত ছিল খুবই কঠিন। আর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা যেসব ঘোড়া ব্যবহার করত সেগুলো অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ অংশের শুষ্ক আবহাওয়ায় ছিল একেবারেই অনুপযুক্ত। এ সমস্যা সমাধানের জন্য ১৮২২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় উট আমদানি করার পরামর্শ দেন ভূগোলবিদ ও সাংবাদিক কনরাড মাল্টে ব্রুন (Conrad Malte-Brun)। যদিও এরপর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম উটটি পা রাখতে চলে যায় আরও দুই দশক।

১৮৩৬ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের ঔপনিবেশিক সরকার ভারত থেকে অস্ট্রেলিয়ায় উট আমদানি করার চিন্তাভাবনা শুরু করে। সেই চিন্তা থেকেই চার বছর পর ১৮৪০ সালের অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো পা রাখে একটি উট। এক কুঁজবিশিষ্ট হ্যারি নামের ওই উটটি ভারত থেকে আমদানি করা হয়নি। আমদানি করা হয়েছিল স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ থেকে।

প্রথম উটের করুণ দশা

অস্ট্রেলিয়ার বিপুলসংখ্যক উটের জনক হিসেবে হ্যারি নামের উটটিকে কৃতিত্ব দেওয়ার কোনো উপায় নেই। তাকে বেশ করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল। জানা যায়, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ থেকে বেশ কয়েকটি উটকে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে জাহাজে তোলা হলেও একটি ছাড়া বাকি সবই দীর্ঘ যাত্রাপথে প্রাণ হারায়। বেঁচে যাওয়া উটেরই নাম রাখা হয় হ্যারি।

অ্যাডিলেডের ফিলিপ ব্রাদার্স নামে তিন ভাই এই উটগুলো অর্ডার করেছিলেন। পরে তাদের কাছ থেকে হ্যারিকে কিনে নেন জন অ্যা হরোক্স নামে এক অভিযাত্রী। ১৯৪৬ সালে ১ সেপ্টেম্বর তিনি হ্যারির পিঠে চড়ে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার লেক টরেন্স এলাকায় চাষযোগ্য নতুন ভূমির খোঁজ করছিলেন। এ সময় উটের পিঠে বসেই একটি পাখি শিকারের জন্য বন্দুকের ট্রিগার চেপেছিলেন হরোক্স। যে মুহূর্তে তিনি বন্দুকের ট্রিগার চাপেন ঠিক সেই মুহূর্তেই নড়ে উঠেছিল হ্যারি। ফলে মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন ওই অভিযাত্রী। এ দুর্ঘটনায় তার ডান হাতের মাঝখানের আঙুলটি উড়ে যায় এবং পথভ্রষ্ট গুলিটি তার বাম গাল দিয়ে ঢুকে এক সারি দাঁতও উড়িয়ে নেয়। মারাত্মক এ ক্ষতস্থানে কয়েক দিনের মধ্যেই ইনফেকশন শুরু হয় এবং ২৩ দিন পর মাত্র ২৮ বছর বয়সে হরোক্স মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি হ্যারিকে গুলি করে মারার নির্দেশ দিয়ে যান। নিজের মৃত্যুর জন্য তিনি হ্যারিকেই দায়ী করেছিলেন।

দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ক্ল্যারি ভ্যালিতে প্যানোর্থাম নামে একটি গ্রামের গোড়াপত্তন করেছিলেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বংশধর হরোক্স। বর্তমানে ওই গ্রামটি একটি ছোট শহরে রূপ নিয়েছে।

যেভাবে উটের বংশবৃদ্ধি শুরু হয়

মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী, হ্যারিকে গুলিকে করে মারা হলেও এর আগেই আরও বেশকিছু উট অস্ট্রেলিয়ায় আমদানি করা হয়েছিল। দেশটির মাটিতে হ্যারি পা রাখার দুই মাস পর অর্থাৎ ১৮৪০ সালের ডিসেম্বরেই একটি মাদি ও মর্দা মিলিয়ে আরও দুটি উট আমদানি করা হয়। পরের বছর আমদানি করা হয় আরও দুটি। এভাবে আরও বেশকিছু।

যেখানে সাধারণ ঘোড়া দিয়ে শুষ্ক অঞ্চলগুলোতে চলাচল দুষ্কর হয়ে উঠেছিল, সেখানে বেশ মানিয়ে নিয়েছিল উট। বৈশিষ্ট্যগত কারণে অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলগুলোতে বেশ ভালোভাবেই টিকে গিয়েছিল এ প্রাণীটি। উটের পিঠে চড়ে অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম শুষ্ক অঞ্চলে যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। কারণ কোনো পানি পান না করেও কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত মরুভূমিতে চলাচল করতে পারে উট। অভিযাত্রীদের জন্য এ বাহনটি বেশ কাজে দেয়। টানা কয়েক দশকের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে এক মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয় প্রাণীটি।

প্রয়োজন ফুরাল যখন

যোগাযোগের ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে উটের চাহিদা এমনই বেড়েছিল যে, ১৮৪০ থেকে ১৯০৭ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ২০ হাজার উট আমদানি করে ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী। মূলত ভারত, আফগানিস্তান এবং আরব অঞ্চল থেকেই এসব উট আমদানি করা হয়। এসব উটের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় যায় তাদের অসংখ্য বাহকও। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম। অস্ট্রেলিয়ার উন্নয়নে কয়েক দশক ধরে তারাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেশটির আদিবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের পাশাপাশি তারা চা এবং তামাকের মতো পণ্যও আমদানি করতে শুরু করেন।

অস্ট্রেলিয়ায় একদিকে যেমন উটের সংখ্যা বাড়ছিল, অন্যদিকে ওই সময়ের মধ্যেই নতুন নতুন উদ্ভাবনী প্রযুক্তি আবিষ্কারের নেশায় মেতে ওঠে পৃথিবী। বিংশ শতকের গোড়ার দিকেই মোটরচালিত যান বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে দুনিয়াজুড়ে। এর ছোঁয়া লাগে অস্ট্রেলিয়াতেও। ১৯২০ সালের দশকে অস্ট্রেলিয়ায় যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে উটের প্রয়োজন ফুরাতে শুরু করে।

অস্ট্রেলিয়ায় উটের মুক্ত জীবন

উটের প্রয়োজন যখন ফুরাল তখন এগুলোকে বাড়িতে পুষে রাখার আর প্রয়োজন মনে করেনি অস্ট্রেলিয়ানরা। ফলস্বরূপ এক দশকের মধ্যেই বেশিরভাগ উটকে মুক্ত করে দিল তারা। পরিত্যক্ত এসব উট অস্ট্রেলিয়ার মরুময় দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর অস্ট্রেলিয়া এবং কুইন্সল্যান্ডের প্রায় ৩৩ লাখ বর্গকিলোমিটারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে শুরু করল। অসংখ্য পালে বিভক্ত এসব উট এখন সম্পূর্ণ বুনো। উন্মুক্ত পরিবেশ তাদের প্রজননে নতুন মাত্রা যোগ করে। ফলে খুব দ্রুত বাড়তে শুরু করে উটের সংখ্যা।

১৯৬৯ সালে অস্ট্রেলিয়ান বুনো উটের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২০ হাজার। কিন্তু পরবর্তী ২০ বছরের মধ্যেই তাদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। ধারণা করা হয়, ১৯৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ায় মুক্ত উটের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪৩ হাজারে। ২০০১ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে পরিচালিত এক জরিপে বলা হয়, দেশটিতে উটের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখে। এমন পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা অস্ট্রেলিয়াকে সতর্ক করে যে, ৮ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এ সংখ্যাটিও দ্বিগুণ হয়ে যাবে। তাৎক্ষণিকভাবে দেশটির সরকার উটের সংখ্যা কমানোর জন্য জাতীয় পরিকল্পনা হাতে নেয়। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ২০১৩ সালের মধ্যেই উটের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে।

উটের সংখ্যাধিক্য সমস্যা কেন

বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় যেসব উট মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায় তাদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে আরও ১০০ বছর আগেই মানুষের বন্ধন ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। যেসব শুষ্ক অঞ্চলে বুনো উটেরা বিচরণ করছে সেসব অঞ্চলে মূলত অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা বসবাস করে। অতীতের শিকারি জীবন থেকে বেরিয়ে তারা এখন পশুপালন এবং কৃষিকাজে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এদিকে বুনো উটেরা আদিবাসীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আদিবাসীরা এবং তাদের পশুপালগুলো যেসব সীমিত জলাধারের ওপর নির্ভর করে, তাতে এসে ভাগ বসিয়েছে উটের পাল। একে তো শুষ্ক, তার ওপর ২০১৯ সালে অন্যান্য বারের চেয়ে ওই অঞ্চলগুলোর তাপমাত্রা ছিল বেশি এবং তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে দেখা দিয়েছিল মাত্রাতিরিক্ত খরা।

আদিবাসীদের অভিযোগ, উটের পাল মাঝেমধ্যেই তাদের বসতিগুলোর ওপর এসে চড়াও হচ্ছে এবং পানির উৎসগুলোকে দূষিত করে দিচ্ছে। দেখা যায়, কোনো একটি জলাধারে একসঙ্গে হাজার হাজার উট গিয়ে হামলে পড়ে। এতে নিজেদের পায়ে পিষ্ট হয়েই মারা যায় কিছু উট। মৃত এ উটগুলো পচে গলে দূষিত করে ফেলছে অবশিষ্ট পানিও। শুধু তাই নয়, আদিবাসীদের পশুপালের জন্য নির্দিষ্ট গোচারণ ভূমিগুলোর ঘাস প্রায়ই সাবাড় করে দিচ্ছে ওইসব বুনো উট। এছাড়াও বিভিন্ন স্থাপনা থেকে শুরু করে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র এবং গাছপালার বিপুল ক্ষতি সাধন করছে এরা। এক জরিপে দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ার বুনো উটেরা প্রতি বছর যে পরিমাণ ক্ষতিসাধন করছে তার মূল্যমান প্রায় এক কোটি মার্কিন ডলার।

এদিকে সাম্প্রতিক বিধ্বংসী দাবানলের প্রভাবে খরা পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ দিকে। তার মধ্যে বিভিন্ন জলাধারের সব পানি শুষে নিচ্ছে উট। দাবানলের মধ্যে পানির অভাব হওয়ায় মানুষের বাড়ি ঢুকে হামলা করছে উটের পাল। বাড়িঘর এবং মানুষেরও ক্ষতি করছিল তারা। খাবার ও জলের অভাব এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

এমন প্রতিকূল অবস্থার কথা বিবেচনা করেই, ২০২০ সালের শুরুতেই (৮ জানুয়ারি) উটের সংখ্যা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়ান সরকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাঁচ দিনের অপারেশনে ১০ হাজার উট মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ৫ হাজার উট হত্যা করা হয়। এর আগে ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত বেশ কয়েক বছর ধরে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭৫ হাজার করে উট হত্যা করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে ওই অপারেশনের দলনেত্রী লিন্ডি স্যাভারিন বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘এমন নয় যে, ব্যাপারটাকে আমরা উপভোগ করছি। তবে বিষয়টা এমন যে, এটা আমাদের করতেই হবে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উটের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য অস্ট্রেলিয়া কর্র্তৃপক্ষ অবশ্য আরও বেশকিছু পরিকল্পনা হাতে নেয়। এর অংশ হিসেবে উটের মাংস রপ্তানি এবং বুনো উটকে ধরে খামারে আবদ্ধ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মুক্তভাবে বিচরণের জন্য অস্ট্রেলিয়ার উটের স্বাস্থ্যও ভালো হয়ে থাকে। তাই এ উটের মাংস কিংবা জীবিত রপ্তানি করার ক্ষেত্রেও ভালো চাহিদা রয়েছে। সরকারি সূত্রমতে, মাংসের চাহিদা মেটাতে অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি বছর প্রায় পাঁচ হাজারের মতো উট নিধন করা হয়। এছাড়া উটের দুধ এবং পশমেরও বাজার রয়েছে। কিছু অঞ্চলের পর্যটকদের বাহন হিসেবে উটকে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে তারা। অবশ্য এসব পরিকল্পনাকে উটের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট মনে করছে না দেশটির জাতীয় উট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ন্যাশনাল ফ্যারেল ক্যামেল অ্যাকশন প্ল্যান’। আর তাই কিছু উট গুলি করে হত্যা করে মাটিতে পুঁতে ফেলা কিংবা পুড়িয়ে ফেলার মত দিয়েছে তারা।

প্রকৃতির আশীর্বাদ

অস্ট্রেলিয়ার বুনো উট প্রাকতিকভাবেই বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট। তাই রুক্ষ ও শুষ্ক পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য তাদের যথেষ্ট সামর্থ্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীরা খুব সহজেই তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সুবিধাভোগের জন্যই অস্ট্রেলিয়ার উটেরা রোগশোকে কম ভোগে। উটেদের সাধারণ কিছু রোগ যেমন ব্রুসেলিয়সিস, টিউবারকুলোসিস, ক্যামেল পক্স কিংবা ট্রাইপ্যানোসোমিয়াসিসের মতো রোগগুলো অস্ট্রেলিয়ার উটদের মধ্যে নেই বললেই চলে।

ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য অস্ট্রেলিয়ার ‘ন্যাশনাল ফ্যারেল ক্যামেল অ্যাকশন প্ল্যান’ কার্যকর কোনো শিকারি প্রাণীর কথাও ভেবেছিল, যারা উটদের খেয়ে তাদের সংখ্যা কমিয়ে রাখতে পারবে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ওই রুক্ষ পরিবেশে উট শিকার করতে পারবে এমন প্রাণীর মধ্যে আছে শুধু ডিঙ্গো। এটি মূলত অস্ট্রেলিয়ার এক বিশেষ প্রজাতির শিকারি কুকুর। তবে এই ডিঙ্গোরা শুধু উট শাবকদেরই শিকার করতে পারে, বড় উট শিকার করা তাদের প্রায় দুঃসাধ্য কাজ। এছাড়া বেশকিছু উটশিকারি মানুষও আছে যারা উটের মাংস সংগ্রহ করে। সব মিলিয়ে এসব শত্রুদের মোকাবিলা করে অস্ট্রেলিয়ার মুক্ত উটেরা দারুণভাবেই তাদের সংখ্যা বাড়িয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।