ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে যেতে পারত গৃহযুদ্ধের মতো। মানে বঙ্গবন্ধু বিপিএলের আজকের ফাইনালটা। তেমনটা হলে গতকাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে লন্ডন থেকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়ে উড়ে আসা বিপিএল শিরোপার দু’পাশে থাকতেন মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ। দুই ভায়রা। কিন্তু মাহমুদউল্লাহর চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সকে আসুরিক শক্তির ব্যাটিংয়ে হারিয়ে মুশফিকের ওপাশের জায়গাটা দখল করে হাসছেন আন্দ্রে রাসেল। আজ সপ্তম বিপিএলের শিরোপার লড়াইটা তাই মুশফিকের খুলনা চ্যালেঞ্জার্স ও রাসেলের রাজশাহী কিংসের মধ্যে।
বিপিএল ফাইনাল মানে এতদিন ছিল মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা কিংবা সাকিব আল হাসানের প্রায় অনিবার্য উপস্থিতি। সাকিব এখন ক্রিকেটে নিষিদ্ধ। এলিমিনেটর ম্যাচে হারায় মাশরাফীর ঢাকা প্লাটুন শেষ লড়াইয়ে আসতে ব্যর্থ। ঢাকাকে দুবার এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ও রংপুর রাইডার্সকে একবার করে চ্যাম্পিয়ন করে এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক মাশরাফী। গেলবারের চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স এবার এই আসরে নেই বিশেষ ব্যবস্থায় বিপিএল আয়োজন বলে।
মুশফিকের খুব দুঃখ ছিল, কখনো বিপিএলের ফাইনালে ওঠেননি। শিরোপা জেতা দলেও ছিলেন না শেষ ৬ বারের একবারও। সেই দুঃখ ঘোচানোর জন্য এবার খুলনাকে দারুণভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। প্রথম কোয়ালিফায়ারে রাসেলদের রাজশাহীকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে দল। সুবাদে মাঝে দুদিন বাড়তি সময় মিলেছে। রাজশাহীকে ফাইনালে আসতে হয়েছে বুধবার চট্টগ্রামের বিপক্ষে থ্রিলার জিতে। একদিন করে বিরতি দিয়ে টানা তিনটি নকআউট ম্যাচ খেলার কঠিন পরীক্ষায় নামতে হচ্ছে তাদের।
গতকাল দুপুরে এবারের বিপিএলের শিরোপা উন্মোচন অনুষ্ঠানে দুই অধিনায়ক হাজির। এদিন খুলনার হালকাচালে অনুশীলন থাকলেও আগের রাতের রোমাঞ্চ জিতে রাজশাহী ছিল বিশ্রামে। তবে রাসেল এলেন। মুশফিক বুঝি পণ করেছেন একবারে শিরোপা জিতেই তারপর মুখ খুলবেন। ফাইনালের আগের দিনের কথা বলার প্রসঙ্গ আসতেই মাথার ওপর দুই হাত তুলে বাতাস ঠেলে ভীড় পেরিয়ে বেরিয়ে যান হাসিমুখে। কোচ জেমস ফস্টার আসেন সাংবাদিকদের সামনে।
রাসেলের যা বলার তা অবশ্য আগের রাতে বলেই গেছেন ২২ বলে ৫৪ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলে ফাইনাল নিশ্চিত করার পর। পার্টি হবে? ‘এখন নয়। কাজ বাকি আছে। তাই তুলে রাখছি’ রাসেল মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেছিলেন, ‘একবারে শিরোপাটা জিতে তারপর পার্টি করতে চাই।’
এবারের টুর্নামেন্টে আজ আসলে খুলনা ও রাজশাহীর মধ্যে চতুর্থ লড়াই হতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৩ যুদ্ধে ২-১-এ এগিয়ে খুলনা। লিগ পর্বের ম্যাচ দুটিতে তাদের দেখা হয় চট্টগ্রামে। সেখানে প্রথম দেখায় খুলনা বড় রান তাড়া করে সহজে জিতলেও তারচেয়েও অনায়াসে পরের দেখায় জিতে সমতা আনে রাজশাহী। লিগ শেষ হলে পয়েন্ট টেবিলের ১ নম্বর হয় খুলনা। ২ নম্বর দল রাজশাহীকে প্রায় উড়িয়ে দিয়ে খুলনা ফাইনালে উঠে যায়। এবার সেই হিসেবে রাজশাহীর জেতার পালা। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটা ফাইনাল।
শক্তিতে আসলে খুলনাকে একটু বেশি এগিয়েই রাখতে হচ্ছে। যদিও টি-টোয়েন্টিতে দিনের মোমেন্টাম যে ধরতে পারে জয় হয় তার। তারপরও বলতে হয়। আসরের শুরু থেকে ওপেনিং নিয়ে ভুগছিল খুলনা। কিন্তু নাজমুল হোসেন শান্ত ঠিক শেষের আগের দু’ম্যাচে যথাক্রমে অপরাজিত ১১৫ ও ৭৮ নটআউট ইনিংসে সমাধান করেছেন তার। মেহেদী হাসান মিরাজের ওপর ভরসা করা যাচ্ছে বলে হাশিম আমলাকে বসিয়ে রাখার বিলাসিতা করছে তারা। টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ রানের তালিকার প্রথম দুটি নাম তাদের মুশফিক (৪৭০) ও রাইলি রুশো (৪৫৮) পুরো আসরে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লড়াইয়ে আছেন। শামসুর রহমান শুভ কার্যকর ছোট ছোট ইনিংস খেলেন। নাজিবুল্লা জাদরান কাজে আসছেন। রবি ফ্রাইলিঙ্ক ব্যাট হাতে সেরা ঝড়টা দেখানোর তেমন সুযোগ পাননি।
ফ্রাইলিঙ্ক (১৯), আমির (১৮) ও শহিদুল ইসলাম (১৮) টুর্নামেন্টের সেরা বোলার হওয়ার প্রতিযোগিতায় আছেন। আমির শেষ ম্যাচে বিপিএলের ইতিহাসের সেরা পারফরম্যান্স করেছেন। সঙ্গে শফিউল ইসলামকে নিয়ে দারুণ পেস আক্রমণ। অফস্পিনার মিরাজের সঙ্গে লেগি আমিনুল ইসলাম বিপ্লব। খুলনার এই একাদশ পরিবর্তনের সুযোগ তেমন নেই।
ঠিক একইভাবে ফাইনালে উঠে আসা একাদশের বাইরে হয়তো যাবেন না রাসেলরা। মিডল অর্ডারের সমস্যা নিয়েই এতদূর এসেছে রাজশাহী। লিটন কুমার ও আফিফ হোসেনের ওপেনিং পার্টনারশিপ নকআউটে এসে গোত্তা খেয়েছে। তাদের জ্বলে ওঠার দিন মিডল অর্ডার শক্তি পাচ্ছে। তিনে শেষ ম্যাচে ইরফান শুক্কুরকে এনে ফল পেয়েছে দল। অলক কাপালী বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। শোয়েব মালিক তো বিপিএলের পারফরম্যান্স দিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে দেশে খেলার জন্য পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি দলে ঢুকেই পড়েছেন। এরপরই রাসেল। অলরাউন্ডারের দলের রাজশাহীতে তারপর আছেন মোহাম্মদ নাওয়াজ ও ফরহাদ রেজা।
পেস আক্রমণে রাসেলকে সঙ্গ দিচ্ছেন নিয়মিত পারফরমার মোহাম্মদ ইরফান, স্থানীয় আবু জায়েদ রাহী, ফরহাদ রেজা ও কামরুল ইসলাম রাব্বি। দুই আফিফ ও শোয়েব মালিক। বাঁহাতি স্পিনে নাওয়াজ। টি-টোয়েন্টির জন্য প্রায় আদর্শ দল।
তাহলে? আজ শেষ হাসিটা কার? যেই হাসুক, নতুন চ্যাম্পিয়ন পাচ্ছে বিপিএল।