বাঙালি যেমন মিশ্র জাতিসত্তা তেমনি বাংলাদেশ বহু ধর্ম-বর্ণ-জাতি-সম্প্রদায়ের দেশ। দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সম্প্রীতিময় সহাবস্থানের সংস্কৃতি এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বজায় আছে। বর্ণবৈষম্য আর জাতপাতের বিষাক্ত প্রভাব কোনো কোনো সময় এখানকার সমাজকে গ্রাস করলেও এটি সাধারণ চিত্র নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট থাকার দীর্ঘ ইতিহাস রীতিমতো গর্ব করার মতো। এদেশের মুক্তিসংগ্রামে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ যুথবদ্ধভাবে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। তাদের যৌথ অবদানে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা।
ঈদ-পূজা-বড়দিন-বুদ্ধপূর্ণিমা এই ধর্মীয় উৎসবগুলোতে এ অঞ্চলের মানুষ যেভাবে আনন্দমুখর হয়ে ওঠে, তা বিভেদমুক্ত সমাজের কথাই বলে। রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলো ধর্মীয় উৎসবগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেই আয়োজন করা হয়ে থাকে। সেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিবেচনায় নিয়ে অবশেষে নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখ পেছাল।
রাজধানী ঢাকা মহানগরে প্রায় এক কোটি সত্তর লাখ মানুষের বসাবাস। গুরুত্বের বিবেচনায়, জাতীয় নির্বাচনের পরেই ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের অবস্থান। বিপুল সংখ্যক মানুষের উন্নয়ন যেমন এই নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত তেমনি দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আবহাওয়া তৈরিতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণে আগাম সতর্কতা প্রয়োজন ছিল। এই নির্বাচনে যাতে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যক মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটদান করতে পারে সেটাই নির্বাচন কমিশনের সর্বাগ্রে বিবেচনায় রাখা জরুরি। অধিকাংশের অংশগ্রহণে যাতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে সেটা নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব।
হিন্দু সম্প্রদায়ের সরস্বতী পূজা ও ভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হওয়া কঠিন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এই পূজা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাড়ম্বরে পালিত হয়ে থাকে। আর ভোটগ্রহণও হয়ে থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। তাই একই দিনে পূজা এবং ভোটগ্রহণ একটা সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করেছিল। কেন পূজার দিনে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সতর্কতা পরিলক্ষিত হয়নি, তা খতিয়ে দেখা দরকার এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে অধিক সতর্কতা কাম্য।
নির্বাচন কমিশনের এই তারিখ নির্ধারণ ব্যাপক বিতর্ক এবং সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। শুধু হিন্দু সম্প্রদায় নয়, রাজনৈতিক দলগুলো, নাগরিক সমাজ এবং অনেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তারিখ পেছানোর জোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বিরোধী দল বিএনপি এবং তার নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তো বটেই ক্ষমতাসীন দলেরও অনেকেই এই দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও তারিখ পেছানো নিয়ে ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ থেকে শুরু করে আমরণ অনশনের মতো কর্মসূচিও পালন করে আসছিলেন। ভোটের তারিখ পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনে নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন সংগঠন। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও সংবাদ সম্মেলন করে ভোটের তারিখ পেছানোর দাবিতে কিছু কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। এত আপত্তি সত্ত্বেও এতদিন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন অনড় অবস্থান প্রদর্শন করে আসছিল। অবশেষে জরুরি বৈঠকে বসে ইসি। গত শনিবার বৈঠক শেষে রাত সোয়া ৮টার দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা ৩০ তারিখের নির্বাচন পিছিয়ে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করার কথা জানান।
ভোটের তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিল। এই ইতিবাচক অবস্থান অব্যাহত রাখতে হলে দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি। নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোট প্রদানের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করবে এটাই প্রত্যাশিত।