সদ্য ফেলে আসা দশকে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তীর-ধনুকের খেলা আরচারির ঘটেছে বিস্ময়কর উত্থান। দশকের শেষ বছরে এসে খেলাটা পেয়েছে একজন সুপারস্টারও। তিনি রোমান সানা। পুরো ক্রীড়াঙ্গনেই যে তরুণ এখন গর্বের নাম। তাকে নিয়ে লিখেছেন তোফায়েল আহমেদ
১
৮ নভেম্বর, ২০১৮। রোমান সানা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির বৃত্তি নিয়ে তখন সুইজারল্যান্ডে। টোকিও অলিম্পিকের আগ পর্যন্ত দুই বছর সেখানেই উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে ট্রেনিং করবেন। মাঝে দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া বড় প্রতিযোগিতায় খেলবেন এটাই কথা।
অনুশীলন কেমন চলছে সেই খোঁজ নিতেই সেদিন রোমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা। কিন্তু ইউরোপের স্বপ্ন শহর থেকে রোমান বিস্ময় উপহার দিলেন।
‘আমি আসলে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হয়তো এবার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে এসে আর এখানে ফিরব না।’Ñ ফোনের ও প্রান্তে রোমান।
দুই বছরের বৃত্তির মাত্র পাঁচ মাস কেটেছে তখন। এর মধ্যে রোমানের এই সিদ্ধান্ত!
রোমান এমন বলছেন কেন? কারণ রোমান অনুধাবন করতে পেরেছেন, ‘এখানে থাকলে আমার পারফরম্যান্সের উন্নতি হবে না। এই বৃত্তি যারা আরচারিতে পিছিয়ে থাকা দেশ, তাদের জন্য। হয়তো এখানে আধুনিক প্রযুক্তি আছে। তবে আমি যাদের সঙ্গে থেকে প্র্যাকটিস করছি তাদের সঙ্গে খেলে খুব বেশি এগোতে পারব না। কারণ ওরা অনেক পিছিয়ে। দেশে থেকে অনুশীলন করলে আমার জন্য এরচেয়ে বেশি ভালো হবে। তাছাড়া শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবলে তো হবে না। টিম ইভেন্ট নিয়েও তো আমাকে ভাবতে হবে।’ ২৪ বছর বয়সী কোনো তরুণের এমন পরিণত ভাবনা কি বিস্ময় না জাগিয়ে পারে?
রোমান ডিসেম্বরে দেশে এসে সত্যি সত্যি আর ফিরলেন না। দেশেই শুরু করলেন মনের কোনে থাকা লক্ষ্যপূরণের মিশন। তখনো রোমান দেশের সেরা আরচার, তবে সবার মুখে মুখে ফেরা নাম নন। কিন্তু ‘আরচারিই দেশের সেরা খেলা’Ñ এমন বিশ^াস ধারণ করা এক জেদি তরুণ তিনি। যার চোখে স্বপ্নÑ দেশের আরচারি একদিন মাথা তুলে দাঁড়াবে। আরচাররাও পৌঁছাবে জনপ্রিয়তার শিখরে।
কে ভেবেছিল সেই পথটা রোমান নিজ হাতে তৈরি করবেন এত দ্রুত? মাস ছয়েকের মধ্যে খুলনার তরুণ হয়ে উঠলেন সবার পরিচিত।
২০১৯ সালের ১৩ জুন। রোমান গড়লেন ইতিহাস। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ডামাডোল তখন চারদিকে। প্রতিদিনই সবার চোখ থাকে ইংল্যান্ডে। কিন্তু নেদারল্যান্ডস থেকে রোমান সানা দিলেন সবচেয়ে মধুর খবর। হুন্দাই বিশ্ব আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে ছেলেদের ব্যক্তি গত রিকার্ভ ইভেন্টে স্বাগতিক সেফ ফন ডেন বার্গকে হারিয়ে উঠলেন সেমিফাইনালে। তাতেই নিশ্চিত হয়ে গেল তার সরাসরি টোকিও অলিম্পিকে (২০২০) খেলার টিকিট। বাংলাদেশে মাত্র দ্বিতীয় ক্রীড়াবিদ যিনি সরাসরি খেলবেন অলিম্পিকে। পরে সেই আসরে ব্রোঞ্জপদক জোটে রোমানের। আরচারির বিশ্ব আসরে যা বাংলাদেশের প্রথম পদক।
রোমানের এই সাফল্য যে সবাইকে গর্বিত করবে সেটাই স্বাভাবিক। রোমান তাই প্রচারের আলোয় আসেন। তার অর্জনের সেই গুণগান চলতে থাকে দেশময়। তিন মাসের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে ফিলিপাইনে এশিয়া কাপ র্যাংকিং আরচারিতে খেলতে যান। স্বর্ণ জয় করেন রিকার্ভ এককে। এবার আরও বেশি আলোয় আসেন খুলনা থেকে উঠে আসা তরুণ।
বছরের শেষে এসে এসএ গেমস মিশন। যেখানে আরচারির ১০ ইভেন্টের সবকটিতেই স্বর্ণ জয় করে বাংলাদেশ। রোমান ক্যারিয়ারে প্রথমবার এসএ গেমসে অংশ নিলেন। তিন ইভেন্টে খেলে তিনটিতেই (ব্যক্তিগত, দলগত ও মিশ্র দলগত) স্বর্ণ জয় করলেন রোমান নামটিতে যে ধূমকেতুর মতো ‘তারা’ নয়, যেন সেটিরই সাক্ষ্য দিয়ে যান এই ধারাবাহিক সাফল্য দিয়ে। আর এ কারণেই ওয়ার্ল্ড আরচারির বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও জায়গা মেলে তার।
২
খুলনার এই তরুণের নিখুত নিশানা শুরু থেকেই ছিল আশা জাগানিয়া। এমনিতে একেবারে শান্ত স্বভাবের। কিন্তু তীর ধনুক হাতে নিলেই তিনি হয়ে যান অন্য এক রোমান। বিশ্বসেরা আরচারদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়ার ক্ষমতা তার। নিজের দিনে হারিয়ে দিতে পারেন যে কাউকেই। যেভাবে এগোচ্ছিলেন কোচ, কর্মকর্তারা হয়ে উঠেছিলেন আশাবাদী। সতীর্থদের কাছে রোমান তো দীর্ঘদিন ধরেই ছিলেন অনুপ্রেরণা। স্বপ্নময় ২০১৯ সালের পর রোমান এখন নতুন মিশনে। অলিম্পিকের বছর ২০২০। যে অলিম্পিকে অংশগ্রহণই বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের জন্য আরাধ্য, সেই অলিম্পিকে পদক জয়ের স্বপ্নও এখন রোমানকে ঘিরে!
৩
রোমানের জীবনটা সত্যিই রূপকথার গল্পের মতো। গ্রামের সাধারণ এক ছেলে ছিলেন। সেখান থেকে দেশের একটা খেলার সুপার স্টার। বিশ্বদরবারেও যে নামকে দেখা হয় সমীহর চোখে।
এখনকার শান্ত স্বভাবের রোমানের সঙ্গে হয়তো মেলানোটা কষ্টের। তবে দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট রোমানের শৈশব কেটেছে দুরন্তপনাতেই। গুলতি দিয়ে পাখি শিকার করা ছিল তার নেশা। মার্বেল খেলাতেও হাত ছিল পাকা। চুটিয়ে ক্রিকেট-ফুটবলও খেলতেন আজকের দেশসেরা আরচার।
ক্রিকেটে অলরাউন্ডার ছিলে এমন দাবিও করেন রোমান। তার শৈশব-কৈশোরের সেই সময়টায় আবার জাতীয় ক্রিকেট দলে ছিল খুলনা অঞ্চলের ক্রিকেটারদের বেশ প্রভাব। রোমান তাই সাকিব আল হাসান বা মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার মতোই হতে পারতেন। কিন্তু ২০০৮ সালে নতুন একটা খেলার সঙ্গে পরিচয় হলো তার। এক পর্যায়ে যে খেলাটাতেই আটকা পড়ল তার ভাগ্য।
সে বছর জাতীয় আরচারি দলের জন্য খেলোয়াড় সংগ্রহে ট্যালেন্টহান্ট প্রোগ্রাম আয়োজিত হয়েছিল খুলনায়। রোমান তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। স্কুলের একজন শিক্ষক (হাসান স্যার) তাকে সেই ট্যালেন্টহান্টে অংশ নিতে পরামর্শ দেন। কিন্তু রোমানের মন অতটা টানে না। প্রথম দিন তাই স্যারের ডাকে সাড়া দিলেন না। দ্বিতীয় দিন অবশ্য স্যারের ডাক আর ফেলতে পারলেন না। স্যারের কাছেই প্রথম জানলেন খেলাটার নাম আরচারি। তার হাতে সাইকেলের রাবার টিউব ধরিয়ে দিয়ে তীর মারা শিখিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু রোমানের সেদিন প্রথম যা মনে হয়েছিল তা হলোÑ ‘এটা আবার কেমন খেলা।’
গুলতি খেলায় পটু রোমান তীর ছুড়লেন। বাছাইপর্বের শেষ ধাপে গিয়ে রোমান জানলেন, তিনি সিলেক্টেড। দেশের আরচারিতে ‘রোমান সাম্রাজ্যের’ শুরু এভাবেই।
সেদিন রোমানের বদলে অন্য একজনকে নেওয়ার জন্য স্থানীয় পর্যায় থেকে বেশ চাপ দেওয়া হয়েছিল। যে কথা এখন প্রকাশ্যে বলেন রোমানকে বাছাই করা কোচ সাজ্জাদ হোসেন।এবং সেটা মনে বেশ গর্ব নিয়েই, ‘আমি বলেছিলাম একজনকে ঢাকায় নিয়ে গেলে সেটা হবে রোমান।’ সাবেক আরচার ও বর্তমান কোচ সাজ্জাদ যে সোনা চিনতে ভুল করেনি, তা দেখছে আজ পুরো বিশ্বই।
৪
রোমান এরপর ঢাকায় এলেন এক মাসের ইয়্যুথ ক্যাম্পে। ২০১০ এসএ গেমসের ক্যাম্পে ডাকা হলেও বাবা-মার অনাগ্রহে আসা হয়নি। এসএসসি পরীক্ষার জন্য বাসা ছাড়েননি তার বাবা-মা। তবে রোমান দূরে থাকতে পারেননি খেলাটা থেকে। এসএসসি পাসের পর এ কারণেই নিজে থেকেই আবার যোগাযোগ করে চলে আসেন ঢাকায়। অংশ নেন সে বছর সিনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের। মিশ্র দলগততে রুপার পদকও জয় করেন। আরচারিতে যা তার প্রথম পদক।
সেই সাফল্যে তিনি নজরে এলেন তখনকার জাতীয় দলের কোচ নিশিত দাসের। অতিরিক্ত খেলোয়াড় হিসেবে যিনি রোমানকে ইয়্যুথ অলিম্পিকের ক্যাম্পে রাখেন। ২০১১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ইয়্যুথ আরচারি চ্যাম্পিয়শিপে দলগত বিভাগে রুপা জয় করে রোমান তার মান রাখেন। একই সঙ্গে জানান দেন আগমনী বার্তার।
কিন্তু ২০১২ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় রোমান প্রায় হারিয়েই যেতে বসেছিলেন। কখনো খেলায় ফিরতে পারবেন তো দূূরের কথা, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার স্বপ্নও হারিয়ে ফেলেন। ৭-৮ মাস বন্দি ছিলেন বিছানায়। যার মধ্যে তিন মাসেরও বেশি সময় তার কাটে খুলনা পঙ্গু হাসপাতালে।
সেই দুঃসময় কাটিয়ে অবশ্য রোমান ফিরলেন পরের বছরই। বাংলাদেশ আনসারে চাকরি মিলল। যার জন্য রোমান একজনের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞ, ‘বাবুল স্যার আমার ইনজুরি গোপন করে আনসারে এনেছিলেন। স্যারের অবদান তাই ভুলতে পারব না।’
সে বছরই বাংলাদেশ গেমসে রোমান জিতলেন জোড়া স্বর্ণপদক। একটি ব্যক্তিগত, অন্যটি দলগত। যে কোনো পর্যায়েই রোমানের স্বর্ণজয় সেটিই প্রথম।
শুরু হলো দেশে রোমানের একচ্ছত্র আধিপত্য। টানা তিনটি (২০১৪, ১৬, ১৮) জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে রোমান রিকার্ভ এককে সেরা হলেন। ২০১৮ সালেই আরেকটি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে (সে বছর দুটি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়) অবশ্য রোমান ব্যক্তিগত ইভেন্টে স্বর্ণজয় করতে পারেননি। পারেননি অলিম্পিকে যোগ্যতা অর্জন ও এসএ গেমসে বাজিমাত করা বছরেও। দুই আসরেই ব্রোঞ্জে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে তাকে।
তবে কখনো কখনো রোমানের এই না পারাটাও আনন্দের বার্তা দেয়! রোমানের দেখানো পথে যে আরও নবীন উঠে আসছে, দেশেও রোমানের সাফল্য অর্জন করা যে একেবারে সহজ কিছু নয়, তার প্রমাণ যে এটি।
৫
আন্তর্জাতিক আসরে রোমানের প্রথম স্বর্ণজয় ২০১৪ সালে। থাইল্যান্ডে এশিয়ান আরচারি গ্র্যান্ড প্রিক্স আসরে সেই সাফল্য দেখান তিনি। এরপর ২০১৭ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আইএসএসএফ আন্তর্জাতিক সলিডারিটি চ্যাম্পিয়নশিপে জয় করেন দলগত ও মিশ্র দলগততে স্বর্ণ। একই বছর কিরগিজস্তানের বিশকেকে আন্তর্জাতিক আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণজয় করেন ব্যক্তিগত ইভেন্টে। ২০১৮ সালে ঢাকায় তৃতীয় এশিয়ান আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে গলগত ও মিশ্র দলগত ইভেন্টে স্বর্ণ ও ব্যক্তিগত ইভেন্টে পান রুপা। ঢাকাতেই তৃতীয় আইএসএসএফ আন্তর্জাতিক চ্যাম্পিয়নশিপে গলগততে স্বর্ণ জিতলেন, একক ও মিশ্র দলগততে জিতলেন রুপা।
এরপর তার স্বপ্নময় বছর-২০১৯। যদিও বছরটা যে প্রত্যাশা মতো শুরু হয়েছিল তার তা নয়। টানা তৃতীয়বার ঢাকায় আয়োজিত আইএসএসএফ ইন্টারন্যাশনাল সলিডারিটি ওয়ার্ল্ড র্যাংকিং আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে পারলেন না তিন ইভেন্টের কোনোটিতেই স্বর্ণ জিততে। ব্যক্তিগত ও দলগত ইভেন্টে রৌপ্য, মিশ্র দলগততে জিতলেন ব্রোঞ্জ। যদিও এই আসরে খেলেছেন শীর্ষ সারির আরচাররা।
তবে বাজিমাত করলেন নেদারল্যান্ডসের ওয়ার্ল্ড আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে। টোকিও অলিম্পিকে কোয়ালিফাই করলেন। ফিলিপাইনে এশিয়া কাপ বিশ্ব র্যাংকিং টুর্নামেন্টে জয় করলেন স্বর্ণ। দলগত ও মিশ্র দলগতওে এলো পদক। এই সাফল্যের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে ডেকে নিয়ে মিষ্টিমুখ করালেন রোমানকে। দায়িত্ব নিলেন তার অসুস্থ মায়ের চিকিৎসারও।
৬
তির-ধনুকের খেলাটা আজ রোমানকে শুধু আলোকিত করেছে তা নয়, একইভাবে তার পরিবারকে দিয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি। আরচারি খেলে উপার্জিত অর্থ দিয়ে খুলনা শহর থেকে খানিক দূরে বাড়ি করার জন্য জমিও কিনেছেন রোমান। এখন অপেক্ষা সেই জমিতে বাড়ি করে বাবা-মাকে উপহার দেওয়া। অসুস্থ মায়ের চিকিৎসারও নিশ্চয়তা মিলেছে। মাকে দেশের বাইরে নিয়ে চিকিৎসার কথাও এখন ভাবতে পারছেন রোমান।
অথচ এই পরিবারেই একটা সময় ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর’ জোগাড় ছিল। বাবা আব্দুল গফুর সানা বেসরকারি মাছ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের খুবই অল্প বেতনে চাকরি করেন। বড় ভাইও মাছ রপ্তানি কারক প্রতিষ্ঠানের চাকুরে। এই সময়ে এসেও দুজনের মিলিত আয়ও ২০ হাজার টাকার কম। ভাসা যায়! আনসার থেকে ভাতা পাওয়া রোমান নিয়মিত সংসারে কিছু দিতেন। তিনজনের আয়ে খুলনার শহরে বাসা বাড়া, মায়ের চিকিৎসাসহ যাবতীয় সব খরচ চলত তাদের। তারও আগে অর্থাৎ রোমানদের শৈশবটা কেমন ছিল তা তো অনুমান করা সহজেই। ২০১২ সালে রোমানের যখন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হলেন, চিকিৎসার খরচ জোগাতে গ্রামের জমি বিক্রি ও বন্ধক পর্যন্ত রাখতে হয়েছিল রোমানের বাবাকে।
রোমানদের পৈতৃক নিবাস খুলনার কয়রা উপজেলার বাগলি গ্রামে। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সেখানেই কেটেছে রোমানের। এরপর পরিবার নিয়ে খুলনা শহরে চলে আসেন বাবা গফুর সানা। উঠলেন ভাড়া বাসায়। রোমানদের সংগ্রামের জীবনে আরও দুর্দশা নেমে এলো ২০০৭ সালে তাদের গ্রামে ঘূর্ণিঝড় সিডরের থাবা পড়লে। তাদের ফসলি জমিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলো। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। খুলনা শহরে পাড়ি দিলেও গ্রামের ফসলি জমি থেকেও যে আয়ের পথ ছিল সেটা প্রায় বন্ধই হয়ে গেল।
তীর-ধনুকে নিশানা ভেদ করে রোমান সেই দুর্দশার চিত্রটাও বদলে দিয়েছেন। ‘বাবা-মাকে ভালো রাখতে হবে’, এই পণটা সব সময় ছিল তার। যে ছেলের ভাবনার জগৎটা এমন, তার হাত ধরে তো সাফল্য আসবেই।
৭
রোমান যখন তীর ছুড়বে আপনাকে তখন মুগ্ধ হয়ে দেখতে হবে। বিশে^র যত বড় প্রতিযোগীই হোক আপনি নির্ভার থাকতে পারবেন। স্বপ্ন দেখতে পারবেন বড় কিছুর। এটা যেন এখন সহজাত ব্যাপার হয়ে গেছে তার জন্য। ক্রিকেটের সাকিব আল হাসানের ব্যাটিং কিংবা বোলিংয়ের দেখার মতো বিষয়। সাকিব বল করতে এলেই যেমন মনে হয় এই বুঝি উইকেট পড়ল। ব্যাটিংয়ে এলে মুগ্ধ চোখে উইকেটের চারপাশে খেলা তার শটগুলো দেখতে হয়। আরচারির ব্যাপারটা হয়তো ক্রিকেটের মতো নয় ঠিক। তবে ৭০ মিটার দূর থেকে তীর ছুড়ে ‘বুলস আইয়ে’ লাগানোÑ এ যেন শিল্পীর কাজ। রোমান মানে যেখানে আলাদা সৌন্দর্য।
২০০৮ থেকে ১০১৯। মাত্র ১১ বছরে ‘রোমান রূপকথা’র উত্থান। সাধারণ থেকে এখন তিনি অসাধারণ একজন। কিন্তু এটা তো রোমান রূপকথার প্রথম পর্ব। পরের পর্বগুলো নিশ্চয়ই হবে আরও গৌরব ও বিস্ময়ে ঠাসা।
ফিলিপাইনে স্বর্ণজয় করে ফেরার পর রোমান দেশ রূপান্তরকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন স্বপ্নের কথা, ‘আমি যখন খেলা শুরু করি, তখন থেকেই একটা স্বপ্ন ছিল বিশ্বের সব আসরে পদক জিতব। সে লক্ষ্য নিয়েই নিজেকে তৈরি করছি। যতদিন খেলব ততদিন লক্ষ্য থাকবে যে এমন একটা কিছু করব, যাতে খেলা ছাড়ার বহুদিন পরও মানুষ আমাকে মনে রাখে।’ ২০২০ অলিম্পিকের বছর। যেখানে সরাসরি খেলবেন রোমান। তার কথার সূত্র ধরেই তাই অলিম্পিক পদকে চোখ রাখাই যায়। না, রোমান এখানে বাস্তববাদী। তাকে জিজ্ঞেস করুন, বাস্তবতার জমিতে পা রেখেই তিনি স্বপ্নের কথা বলবেন। যার চোখে টোকিও অলিম্পিক হবে তার উপভোগের মঞ্চ। যতটা সম্ভব নিজেকে তৈরি করে খেলে যাওয়া ও কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়া। আর কোয়ার্টারে যাওয়া মানে তো ফাইনাল যে কারও জন্যই হতে পারে এমন। তবে নিজেকে ২০২৪ অলিম্পিকের জন্য অন্যভাবে তৈরির লক্ষ্য রোমানের।
অবশ্য সে অনেক দূরের পথ। আপতত না হয় বর্তমান নিয়েই ভাবা যাক। আরচারির বিশ^মঞ্চে রোমান ২০১৯ এর মতো হেঁটে বেড়াক। গতি হোক দুরন্ত। সেই হারে বাড়ক তাদের সুযোগ-সুবিধাও। বৃত্তি নিয়ে সুইজারল্যান্ডে পড়ে থাকা নয়, বাংলাদেশের কোনো আরচারি কমপ্লেক্সই যেন হয় হাজারো রোমানের স্বপ্নের ঠিকানা।