আমরা সবাই মহাপাপী, মহাঅপরাধী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুকিম চৌধুরী নামের এক শিক্ষার্থী এই লেখাটা লেখার সময় টিএসসিতে অবস্থান নিয়েছেন। তার দাবি খুব পরিষ্কার : ‘শিবির’ করার কথিত অভিযোগের ভিত্তিতে তাকেসহ আরও চার শিক্ষার্থীকে সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে গেস্টরুম নামের নির্যাতন কক্ষে ডেকে কয়েক ঘণ্টা ধরে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়। দফায় দফায় তাকে পেটানো হয় হাতুড়ি, মোটা তার এবং ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে। এই নিপীড়নের বিবরণ সব পত্রিকায় এসেছে, সকলেই জানেন বলেই বিস্তারে যাওয়ার আর তেমন প্রয়োজন নেই। এমনকি শিক্ষার্থীদের যার অভিভাবক হওয়ার কথা, সেই উপাচার্য-প্রক্টরসহ বিশববিদ্যালয়ের প্রশাসন এ ঘটনায় কতটুকু কী ভূমিকা রেখেছেন, তাও আপনারা জানেন। জানেন এমন একটি ঘটনায় পুলিশ কতটুকু ভূমিকা রেখেছে, তারও খবর। তাহলে আর বলবার বাকি কী থাকে?

বলবার আসলেই তেমন কিছু নেই। এক বাউলের গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাও আপনারা সকলেই নিশ্চয়ই দেখেছেন। গ্রাম-বাংলায় চিরকালের প্রচলিত শরিয়ত-মারফত তর্কও হঠাৎ করেই আজ অপরাধমূলক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই শরিয়ত বয়াতি নামের এক মারফতি সম্প্রদায়ের বাউল গ্রেপ্তার হয়ে সংসদে আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছেন।

২. মুক্তিযুদ্ধের পরপর দাউদ হায়দার নামে এক তরুণ কবি ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ নামের বেশ আলোচিত একটি কবিতার জন্ম দিয়েছিলেন সদ্য স্বাধীন দেশে। পাপ-অপরাধ ইত্যাদি ধারণা ভারাক্রান্ত সেই কবিতাটার কথা মনে পড়ল অকস্মাৎ। ২২ বছরের তরুণ দাউদ লিখেছিলেন,

“জন্মই আমার আজন্ম পাপ, মাতৃজরায়ু থেকে নেমেই জেনেছি আমি

সন্ত্রাসের ঝাঁঝালো দিনে বিবর্ণ পত্রের মতো হঠাৎ ফুৎকারে উড়ে যাই পালাই পালাই সুদূরে।

...

আমিও ভাবি তাই, ভাবি নতুন মডেলের চাকায় পিষ্ট হব

আমার জন্যই তোমাদের এত দুঃখ

আহা দুঃখ

দুঃখরে!

আমিই পাপী, বুঝি তাই এ জন্মই আমার আজন্ম পাপ।”

নিতান্তই সহজ ও সরল কবিতা। সদ্য কৈশোর পেরুনো এক তরুণ ভাবছে চতুর্দিকের এই আনন্দের শোরগোলে সে-ই অপরাধী, তার জন্যই বাকিদের আনন্দে একটু খামতি পড়ছে। আবিষ্কার করে সে তার পৌরুষের অক্ষমতার, তার পান্তায় নুনের অভাব, জন্মনিয়ন্ত্রণের বিনিময়ে পাওয়া সামান্য বিশ টাকা দিয়ে চাল ও অন্যান্য সামগ্রী কেনা যাবে কি না সেই সব দুশ্চিন্তা, আর সুখীদের কাছে বিরক্তি ও উপদ্রব হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অনুভূতি এবং শেষ পর্যন্ত এই আবিষ্কার যে, শত্রু নেই কোনো, সে নিজে ছাড়া। নিজের শত্রু নিজে এই তরুণ উপলব্ধি করে, জন্মই তার আজন্ম পাপ। এই তো, সামান্য সাধারণ কবিতা।স

৩. পুলিশ ধরেছে, এটাই যখন বাউলের অপরাধের প্রমাণস্বরূপ সংসদে আলোচিত হচ্ছে, ছাত্রলীগ মেরেছে, এটাই মুকিম চৌধুরীর অপরাধের যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা (যদিও এমনকি শিবিরের সদস্য হওয়াকেও আইন দিয়ে অপরাধমূলক করা হয়নি)। এই বিবেচনা আরও শক্তপোক্ত হওয়ার কথা এই বাড়তি কারণেও যে, ছাত্রলীগ পেটাবার এই রকম ভয়াবহ ফৌজদারি অপরাধ মুকিম চৌধুরীর সঙ্গে করলেও পুলিশ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তা থেকেও কিন্তু অনুমান করা যায় মুকিম চৌধুরীর অপরাধের মাত্রা। তাহলে মুকিম চৌধুরীর যেখানে রীতিমতো কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, পুলিশ তাকে ছেড়ে দেওয়ার পর যেখানে অতীতে মার খাওয়া আর সকলের মতো বাড়ি ফিরে যাওয়া, পারলে কৃতজ্ঞতাসূচক কিছু লেখা সামাজিক গণমাধ্যমে, সেখানে সে কি না বসে আছে টিএসসিতে! তদন্ত এবং শাস্তি চাইছে

পালাতে চায় না এ কেমন ছেলে? তবে কি এমন ছেলেমেয়েরা এই দেশে আবারও জন্ম নিচ্ছে, বেড়ে উঠছে, যারা ঘুরে দাঁড়াতেও চায়? রুখে দিতে চায়? জবাব চায়?

বাউলের বিষয়টাই দেখেন। বাউল বলে কথা, বাংলার বিশ্বঐতিহ্য, লোকজ দার্শনিক সম্প্রদায়। এরা আর যাই হোক জামায়াত-শিবির না। ফলে বাউলের ওপর নির্যাতনের খবরে মোসাহেবরা জোট বেঁধে সম্মিলতভাবে প্রতিবাদ করার কথাই ভাবছিলেন। কিন্তু সংসদে যখন রায় হয়ে গিয়েছে, তখন কী আর তার ওপর কথা কওয়া যায়? শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য তা কি শোভন হয়? দেশের সম্মান আর ইজ্জতটা তখন কোথায় থাকে বলেন? তাই ‘অপরাধী’ বাউলের প্রশ্নটাকে আপাতত পুলিশ-আদালত এই সবের ওপর ছেড়ে দেওয়াই যায়। আবার একদম কথা না কইলে হয়? তাই মনের বেদনা মনেই পুষে রেখে মোলায়েম কণ্ঠে এইটুকু আপত্তি জানিয়ে তসলিম জানাতে জানাতে নতুন আশায় বুক বাঁধেন মোসাহেব সম্প্রদায়।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ে চার শিক্ষার্থীকে পিটিয়েছে তো ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের যখন বিশ্বাস, এরা অপরাধী, অপরাধ যাই হোক, যে কিসিমেরই হোক, কিছু একটা তো আছেই। অতএব, সম্মিলিতভাবে মোসাহেবরা জোট বেঁধে এই বিষয়ে আর কিছু আপাতত করছেন না, পেটানোর সংস্কৃতি তাই শহীদ মিনার আর টিএসসি নামের বাংলা সংস্কৃতির দুই বড় কেন্দ্রের অনতিদূরেই অবিরাম চলতে থাকতে পারবে।স

৪. মার খেতে খেতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় আজ বারুদের স্তূপ হয়ে আছে। আজ, কাল কিংবা পরশু সেই বারুদের স্তূপে আগুন লেগে মহাবিস্ফোরণ ঘটবে। ডাকসুর দাবিতে অনন্য আন্দোলন, কোটা সংস্কারের রাষ্ট্রজোড়া আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ সেই ভিত্তি অনেকখানিই প্রস্তুত করেছে। রাষ্ট্র ভাবছে একতরফা মার দিয়ে যেতে পেরেছি, কোনো প্রতিবাদ কোনো প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়নি। ছাত্রাবাসগুলো জুড়ে গুতন্ত্র ঠিকঠাক বহাল আছে, গেস্টরুম নামের গেস্টাপো শিবিরগুলোও ঠিকঠাকই চলছে। চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়া, হাত-পা ভাঙা শিক্ষার্থীরা নীরবেই দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু এই অজস দাপটের উদাহরণের মাঝেও স্পষ্টতই বোঝা যায়, মাত্র দুই-তিন বছর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ে গুণতন্ত্রের প্রতি যে সমীহটা ছাত্রদের ছিল, তাতে ফাটল ধরছে। মার খাওয়া ছাত্ররা এখন আর নীরবে পালিয়ে না গিয়ে কম কিংবা বেশি, সাধ্যমতো প্রতিবাদও করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের একটা সম্মিলিত ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের জোটও তৈরি হয়েছে

এই দেশে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে এক প্রবল প্রতাপ স্বৈরাচারের পতন ঘটেছিল। সেই হিসেবে ২০২০ সাল ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ৫০তম বার্ষিকী। আইয়ুব খান নামের সেই গুনতন্ত্রের প্রধানের স্লোগান ছিল ‘উন্নয়ন’। বিরোধীদের সে দমন করেছিল এনএসএফ নামের এক গু-বাহিনী সবগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কায়েম করে। বিরোধী রাজনীতিবিদদের নামে যা-তা কথা সে যখন-তখন বলতে পারত, কারণ প্রতিবাদের উপায়টি ছিল না। পুলিশ, সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা সর্বত্র গিজগিজ করত। এমনই ছিল তার দাপট যে, দুনিয়ার গণমাধ্যম পর্যন্ত বিশ্বাস করত যে, আইয়ুবের শাসন চিরস্থায়ী। সেই আইয়ুবের তস রাতারাতি চোখের সামনে উচ্ছেদ করে দিয়েছিল এই দেশের জনগণ। বলা যায়, এক যুগ আইয়ুবের শাসন সহ্য করার ‘মহাঅপরাধের’ তারা প্রায়শ্চিত্ত করেছিল মহা এক গণঅভ্যুত্থানে।

৫. বাউল অপরাধী বলেই পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, খুব মিথ্যা কথা নয়। তবে একটাই খুঁত আছে তার বক্তব্যে। বাউল শুধু অপরাধী না, মহাঅপরাধী। মহাপাপীও। অপরাধ বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি দেশ থেকে পাচার। ভয়াবহ সব দুর্নীতি। অবিশ্বাস্য সব কেলেঙ্কারি। অপরাধ বলতে বুঝি খুন-ধর্ষণ-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে প্রবল এক গুনতন্ত্র দেশজুড়ে কায়েম করা। মহাঅপরাধ হলো আমাদের, জনগণের। আমরা নাগরিকরা এসব ঘটনাকে বাড়তে দিয়েছি, সহ্য করেছি, ঘটতে দিয়েছি। আমাদেরই সম্মিলিত নিষ্ক্রিয়তা গোটা দেশকে এই চোরাবালিতে আটকে ফেলেছে। সন্দেহাতীতভাবেই আমরা মহাঅপরাধী, মহাপাপী। আমাদের শহরের বাতাস বিষাক্ত থাকবে, আমাদের খাদ্যে ভেজাল বাড়তে থাকবে, আমাদের দেশে গুম-খুন আর ক্রসফায়ার বাড়তে থাকবে, আমাদের ব্যাংকগুলো বিপর্যয়ের মাঝে পড়তে থাকবে, এটা তো খুবই স্বাভাবিক। অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত না করা পর্যন্ত এই আমাদের ভবিতব্য।

তাই খুব আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। সাধারণত সেইখান থেকেই মুক্তধারার  স্রোতের মতো ঢল নেমে সমাজকে পরিশুদ্ধ করে। অতীতে অজস্ররবার তাই ঘটেছে। আমাদের মতোই অপরপক্ষও তা জানে। বাকি জনগণের এই ভরসার উৎস হওয়াটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাঅপরাধ, তাই সেখানে স্থায়ী পাহারাদারি আর স্থায়ী নির্যাতন-শিবির। তাই আসাদ-মতিউরের মতোই অনেক বড় কোনো আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়েই এই মহাঅপরাধের অবসান ঘটতে পারে, মুক্ত বিশববিদ্যালয়গুলো হয়তো বাংলাদেশকে মুক্ত করার প্রথম পদক্ষেপ হবে।
লেখক

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট