গৌরবময় গবেষণায় ৫ যুগ

১৯৫৮ সালের বসন্তে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় কলেরা রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে, যার ব্যাপ্তি কলকাতা থেকে শুরু করে ব্যাংকক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত এই রোগে অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়। এই মহামারীই সাউথইস্ট এশিয়ান ট্রিটি অর্গানাইজেশন (সিয়াটো) কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (সিআরএল) প্রতিষ্ঠার পটভূমি হিসেবে কাজ করে। ১৯৬০ সালের ৫ ডিসেম্বর সিয়াটো সিআরএল প্রতিষ্ঠিত হয়। 


বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৮ সালের ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এটি একটি অলাভজনক জনস্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান। 
কলেরা গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে শুরু হয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ বিশ্বের বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে এর গবেষণা এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে চলেছে। এ বছর প্রতিষ্ঠানটির ৬০ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। বর্তমানে আইসিডিডিআরবি গবেষণা কার্যক্রম পাঁচটি বিভাগ এবং দুটি উদ্যোগের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। ডিভিশনগুলো হচ্ছে

১. নিউট্রিশন ও ক্লিনিক্যাল সার্ভিসেস : এই বিভাগের আওতায় মাতৃ এবং শিশু পুষ্টিবিষয়ক বিভিন্ন উদ্ভাবন ও গবেষণা পরিচালিত হয়। এ ছাড়া ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত আইসিডিডিআরবি ঢাকা হাসপাতাল (আগে কলেরা হাসপাতাল নামে পরিচিত), মিরপুরে ডায়রিয়াল ট্রিটমেন্ট সেন্টার এবং চাঁদপুরের মতলবে আইসিডিডিআরবি মতলব হাসপাতাল নামে তিনটি ডায়রিয়া রোগ নিরাময় কেন্দ্র পরিচালিত হয় এই বিভাগের মাধ্যমে। প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ রোগী এই কেন্দ্রগুলো থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকে।
 
২. মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য : মাতৃত্বজনিত জটিলতা, সন্তান প্রসব-সংক্রান্ত সমস্যা, এর প্রতিকারসহ মাতৃ এবং শিশুমৃত্যু রোধে বিভিন্ন গবেষণা ও উদ্ভাবন নিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হয় এই বিভাগের আওতায়। 

৩. ইনফেকসাস ডিজিস ডিভিশন : বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগ এবং এসবের প্রাদুর্ভাব কমাতে প্রতিরোধ, চিকিৎসা এবং নির্মূলে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা নিয়ে এই ডিভিশনের কার্যক্রম। পাশাপাশি কলেরা, রোটা ভাইরাস, পোলিও, ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, জাপানিজ এনকেফেলাইটিস, এইচআইভি ও এইডস, নিপাহ, টাইফয়েড, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মাসহ অনেক রোগ প্রতিরোধে রোগ শনাক্তকরণ, টিকা ও অন্যান্য উদ্ভাবনী চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করা হয়।


৪. হেলথ সিস্টেমস অ্যান্ড পপুলেশন স্টাডিজ : সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জনসংখ্যাবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা করে থাকে এই বিভাগ। বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সবার জন্য স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যবীমা, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নসহ নীতি ও নির্দেশাবলি নিয়েও এই বিভাগ বিভিন্ন গবেষণা করে। ১৯৬৬ সাল থেকে চাঁদপুরের মতলবে এবং পরে ১৯৯৯ সাল থেকে কক্সবাজারের চকরিয়ায় ও ২০১৫ সাল থেকে ঢাকার কয়েকটি বস্তিতে হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেল্যান্স সিস্টেম পরিচালনা করা হচ্ছে এই বিভাগের আওতায়। 

৫. ল্যাবরেটরি সায়েন্স অ্যান্ড সার্ভিসেস : এই বিভাগের আওতায়, আইসিডিডিআরবিতে চলমান গবেষণার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের রোগ নির্ণয়ে আটটি বিশ্বমানের গবেষণাগার পরিচালিত হয়। আইএসও ১৫১৮৯/১৫১৯০ সনদপ্রাপ্ত গবেষণাগারসহ এই বিভাগের আওতায় একটি জিনোমিকস ল্যাবরেটরি আছে।
উল্লিখিত পাঁচটি বিভাগ ছাড়াও আইসিডিডিআরবি স্বাস্থ্যের ওপর ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব’ এবং ‘অসংক্রামক ব্যাধি’বিষয়ক গবেষণার জন্য বিশেষ দুটি উদ্যোগ পরিচালনা করে। আইসিডিডিআরবির শুরু থেকে এ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলো নিম্নে আলোচিত হলো
 
১৯৬০ সাল : এ বছরের ৫ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের অধীনে কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (সিআরএল) প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একটি ভবনে এর কার্যক্রম শুরু হয়। বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী ড. ফ্রেড এল সোপারের (১৯১৯-৭৫) প্রথম পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। কলেরার প্যাথোজেনেসিস ও ফিজিওলজি, রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা এবং কলেরা নিরাময়ে সহজে ব্যবহারযোগ্য সমাধান নিয়ে প্রাথমিক গবেষণা শুরু হয়।
১৯৬২ সাল : দুজন ডাক্তার, তিনজন নার্স এবং দুজন নার্সিং সহকারী নিয়ে ১৯৬২ সালের নভেম্বরে রোগীদের চিকিৎসা প্রদানে একটি ওয়ার্ড খোলা হয়। প্রথম তিন মাসে ১৩৭ জন ডায়রিয়া রোগীর সফল চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরবর্তী মাসগুলোতে রোগীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় জনবল বৃদ্ধি করা হয় এবং ওয়ার্ডটি একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়, যা পরে কলেরা হাসপাতাল নামে পরিচিতি লাভ করে। ক্লিনিক্যাল রিসার্চ সেকশন, ব্যাক্টেরিয়োলজি সেকশন, সিআরএল ওয়ার্ড ও এপিডেমিওলজি সেকশন পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।
১৯৬৩ সাল : এ বছর চাঁদপুরের মতলবে উপকেন্দ্র স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
১৯৬৬ সাল : চাঁদপুরের মতলবে ডেমোগ্রাফিক সার্ভেল্যান্স সিস্টেম প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৬৮ সাল : আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা সফলতার সঙ্গে খাবার স্যালাইন উদ্ভাবন করেন, যা পরে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি উন্নয়নশীল দেশে কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। ১৯৮০ দশক থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান খাবার স্যালাইনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়। শুধু ইউনিসেফই প্রতি বছর উন্নয়নশীল দেশে ৫০ কোটি খাবার স্যালাইনের প্যাকেট বিতরণ করেছে। বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট মন্তব্য করেছে, সম্ভবত খাবার স্যালাইনই বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাভিত্তিক অগ্রগতি।
১৯৬৯ সাল : শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করার সঙ্গে আবার মাসিক ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার প্রমাণ প্রদর্শন করা হয়।
১৯৭১ সাল : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় হাসপাতালের কর্মীরা বিনা বেতনে চাকরি করেও স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখেন। শরণার্থীশিবিরে কলেরা ছড়িয়ে পড়ায় খাবার স্যালাইনের বহুল ব্যবহার এবং সফলতার প্রমাণ নিশ্চিত হয়। 
১৯৭৫ সাল : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ ওআরটির ওপর গবেষণালব্ধ ফলাফল এবং এর ব্যবহার বৃদ্ধিকল্পে একটি সর্বজনীন ফর্মুলা নির্ধারণ করে। এই সর্বজনীন ফর্মুলাই ওরাল রিহাইড্রেশন সল্টস বা সলিউশন (ওআরএস) নামে অভিহিত হয়, আমাদের দেশে এটি এখন ওআরএস বা খাবার স্যালাইন হিসেবে জনপ্রিয়।
১৯৭৭ সাল : মতলবে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক কর্মসূচির সূচনা ঘটে।
১৯৭৮ সাল : খাবার প্রথম স্যালাইনের বড় ধরনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয় মতলবে। গ্লুকোজের পরিবর্তে সুক্রোজ বা খাবার চিনির ব্যবহার সাধারণ মানুষের জন্য আশার আলো দেখায়। সে সময় মতলব বাজার থেকে চিনি, খাবার সোডা, লবণ, পটাশিয়াম লবণ কিনে স্থানীয়ভাবে খাবার স্যালাইন তৈরি করে গ্রামবাসীর মধ্যে বিতরণ করে দেখা হয়েছে ডায়রিয়া রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির হার ২৯ শতাংশ কমে। এই ফলাফল ১৯৮০ সালে জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনে প্রকাশিত হয়। একই বছর ডা. রফিকুল ইসলাম ও সহকর্মীরা মিলে ঢাকার কলেরা হাসপাতালে লবণ-গুড় ব্যবহার করে খাবার স্যালাইনের একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করেন। এই গবেষণায় দেখা যায় এটিও কার্যকর। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯-৮০ সালে মতলবে প্রায় দুই লাখ মানুষের মধ্যে লবণ-গুড় দিয়ে তৈরি স্যালাইনের সঙ্গে গ্লুকোজ স্যালাইনের তুলনা করে নিশ্চিত হওয়া যায় এটিও কার্যকর। লবণ-গুড়ের স্যালাইন ব্যবহারেও হাসপাতালে রোগী ভর্তির হার ৩০ শতাংশ কমে। ১৯৮২ সালে এই গবেষণালব্ধ ফলাফল ট্রানজেকশন অব দ্য রয়াল সোসাইটি অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন ও হাইজিনে প্রকাশিত হয়। আইসিডিডিআরবি প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত বাংলাদেশ সরকারের অধ্যাদেশ স্বাক্ষরিত হয়।
১৯৮০ সাল : আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা যায়, গর্ভবতী মাকে টিটেনাস টক্সইড টিকা দিলে নবজাতকের মৃত্যুহার ৭৫ শতাংশ হ্রাস পায়। এই যুগান্তকারী গবেষণার ফলে ১৯৯০-এর দশকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ ‘মা ও শিশুর টিটেনাস নির্মূল কর্মসূচি’ গ্রহণ করে এবং ৫৩টি দেশে প্রায় পনেরো কোটি মাকে টিটেনাস টিকা দেওয়ার মাধ্যমে প্রায় ৪৮টি দেশে টিটেনাস নির্মূলে সহায়তা করে এবং শিশুমৃত্যু হার কমায়। 
আইসিডিডিআরবি ও সরকারের সহায়তায় ব্র্যাকের মাঠকর্মীরা বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষদের লবণ-গুড় দিয়ে খাবার স্যালাইন তৈরি ও তার ব্যবহার শেখানো শুরু করে। 
১৯৮২ সাল : মতলবে ১৯৭৫ সালে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। এই ধারাবাহিকতায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ‘মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা মডেল’ গ্রহণ করা হয়, যা অত্যন্ত সফল হয়। পরে বাংলাদেশের দুটি জেলায় এর পরীক্ষামূলক সম্প্রসারণ ঘটে এবং এই ধারাবাহিকতায় সারা বাংলাদেশে স্বাস্থ্যকর্মীভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনাসেবা সম্প্রসারিত হয়। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে মোট প্রজনন হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট-টিএফআর) ছিল ৬ দশমিক ৩, যা ২০১৪ সালে হয় ২ দশমিক ৩। বাংলাদেশের জন্মনিয়ন্ত্রণ সফলতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়। 
এ বছরই চালের গুঁড়োর খাবার স্যালাইনের ওপর মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা শুরু হয়। 
১৯৮৪ সাল : আইসিডিডিআরবি ইউনিসেফ-প্রদত্ত মরিস প্যাইট পুরস্কার অর্জন করে।
১৯৮৫ সাল : মতলবে পূর্ণাঙ্গ সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির পরীক্ষা শেষ হয়। 
১৯৮৭ সাল : আইসিডিডিআরবি ইউএসএআইডি-প্রদত্ত সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফর ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক পুরস্কার অর্জন করে।
১৯৮৮ সাল : শ্বাসনালির মারাত্মক সংক্রমণের চিকিৎসা এবং এ-বিষয়ক গবেষণা শুরু হয়।
১৯৮৯ সাল : মতলবে রেকর্ড-কিপিং সিস্টেম সরকারি কর্মসূচিতে ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে এর সম্প্রসারণ ঘটে।
১৯৯৩ সাল : নতুন কলেরা-জীবাণু Vibrio cholera 0139 Bengal চিহ্নিত করা হয় এবং এর প্রকৃতি নিরূপণ করা হয়।
১৯৯৪ সাল : খাবার স্যালাইন আবিষ্কারের পঁচিশ বছর পূর্তি উদ্যাপিত হয়; কলেরা-আক্রান্ত রুয়ান্ডা শরণার্থীশিবিরে সহায়তাদানের জন্য গোমায় আইসিডিডিআরবি মহামারী নিয়ন্ত্রণ দল প্রেরণ করে : জীবাণুর ধরন শনাক্তকরণে এবং মৃত্যুহার শতকরা ৪৮ দশমিক সাত থেকে একভাগেরও নিচে নামিয়ে আনতে সমর্থ হয় দলটি।
১৯৯৫ সাল : গর্ভবতী মাকে নিউমোকক্কাল পলিস্যাক্কারাইড টিকা দিলে ২২ সপ্তাহ পর্যন্ত বয়সের শিশুদের সংশ্লিষ্ট রোগ থেকে রক্ষা করা যেতে পারেÑ এমন তথ্য-প্রমাণ প্রদর্শন করা হয়।
১৯৯৬ সাল : কলেরা হাসপাতাল বিশ্বের সেরা ডায়রিয়া চিকিৎসা-কেন্দ্র বলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন।
১৯৯৮ সাল : আইসিডিডিআরবির বিশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পন্ন হয়; বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় জাতীয় এইচআইভি সার্ভেল্যান্স কর্মসূচিতে আইসিডিডিআরবির অংশগ্রহণের সূচনা ঘটে।
১৯৯৯ সাল : আইসিডিডিআরবির বিশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সপ্তাহব্যাপী কর্মকাণ্ডের উদ্বোধন করেন এবং দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত মারাত্মক অপুষ্টির শিকার শিশুদের জন্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত স্বাস্থ্য-ব্যবস্থাপনার প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন দানের আহ্বান জানান।
২০০০ সাল : বাংলাদেশে ডেঙ্গু মহামারী নিয়ন্ত্রণের জন্য আইসিডিডিআরবি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়ায়; বিষয়ভিত্তিক গবেষণার জন্য কেন্দ্র ছয়টি ক্ষেত্রে চিহ্নিত করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণের অভিযান চালায়।
২০০১ সাল : আইসিডিডিআরবি সম্মানসূচক গেইটস অ্যাওয়ার্ড ফর গ্লোবাল হেলথ শীর্ষক পুরস্কার অর্জন করে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে এই পুরস্কারের সমমানের এক মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অনুদান পায়; যক্ষ্মাবিষয়ক কর্মসূচির সূচনা ঘটে।
২০০২ সাল : ডায়রিয়ায় মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রে আইসিডিডিআরবি জিংক-সংবলিত চিকিৎসা-পদ্ধতির উপকারিতা ব্যাখ্যা করে।
২০০৩ সাল : আইসিডিডিআরবি পঁচিশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন করে; এইচআইভি/এইডস এবং দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিষয়ভিত্তিক গবেষণা কর্মসূচিতে অঙ্গীভূত হয়; প্রতিষ্ঠার পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় রাষ্ট্রপতি স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন।
২০০৫ সাল : আইসিডিডিআরবি বাংলাদেশ সরকার-প্রদত্ত সর্বোচ্চ সম্মানসূচক স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত হয়।
২০০৬ সাল : শিশুদের ডায়রিয়ায় খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি ‘বেবি জিংক’ নামের ট্যাবলেট খাওয়ানোর পরামর্শ প্রদান এবং এই ট্যাবলেট উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের উদ্যোগে আইসিডিডিআরবি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের স্বীকৃতি হিসেবে আইসিডিডিআরবি বাংলাদেশ টুডে অ্যাওয়ার্ড ২০০৬ শীর্ষক পুরস্কার অর্জন করে; আইসিডিডিআরবি নতুন লোগো প্রবর্তন করে এবং কেন্দ্রের নামের সঙ্গে knowledge for Global Lifecaving Solutions  (বৈশ্বিক পর্যায়ে জীবন রক্ষার সমাধান-সংক্রান্ত জ্ঞান) শীর্ষক ট্যাগলাইন সংযোজিত হয়।
২০০৭ সাল : যথাযথ মাত্রায় ও নিয়মে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সাফল্যের জন্য অ্যালায়েন্স ফর প্রুডেন্ট ইউজ অব অ্যান্টিবায়োটিক নামের প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবিকে ‘লিডারশিপ পুরস্কার’ প্রদান করে। ২০০৭ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, খাবার স্যালাইন বিশ্বব্যাপী পাঁচ কোটির ওপর জীবন বাঁচিয়েছে এবং এখনো প্রায় প্রতি বছর ১০ লাখেরও বেশি জীবন বাঁচাচ্ছে। এই একই খাবার স্যালাইন ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ যেকোনো পানিশূন্যতায় ব্যবহার করা হয়। স্পোর্টস ড্রিংক বা খেলোয়াড়রা যেসব পানীয় পান করেন, সেসবের মূলেও রয়েছে খাবার স্যালাইনের যোগসূত্র। 
২০০৮ সাল : আইসিডিডিআরবির ‘প্রজন্ম’ প্রকল্প দ্য ল্যানসেটে ৩৪ শতাংশ শিশুমৃত্যুর হারের প্রতিবেদন প্রকাশ করে; ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন ছয় বছরের কমবয়সী শিশুদের মধ্যে অসুস্থতা ৬৩ শতাংশ হ্রাস করে এবং জ্বর ও শ্বাসজনিত অসুস্থতা এক-তৃতীয়াংশ দূর করে।
২০১০ সাল : বাংলাদেশের পারিবারিক সহিংসতা আইনে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা-সংক্রান্ত গবেষণা সম্পৃক্ত করা হয়; রোটা ভাইরাস টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা-সংক্রান্ত গবেষণা : মূল ফলাফলগুলো দ্য ল্যানসেটে প্রকাশ; শিশুর প্রসবের পর মায়ের মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণ চিহ্নিতকরণের উদ্দেশ্যে ক্লিন ডেলিভারি কীট অ্যান্ড আইসিডিডিআরবি বার্থিং ম্যাটের উদ্ভাবন। 
২০১১ সাল : যক্ষ্মার একটি নতুন রোগ নির্ণয় পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট ৭৬৩৮২৭১ লাভ; ‘কন্টিনিয়াম অব কেয়ার’ শীর্ষক প্রকল্পের সক্রিয় কর্মকাণ্ডে শিশুর জন্মদানের পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে মায়েদের মৃত্যুহার ৩৬ শতাংশ হ্রাস। 
২০১৩ সাল : বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে আইসিডিডিআরবির ভূমিকা সম্পর্কে দ্য ল্যানসেটের প্রশংসা অর্জন।
২০১৪ সাল : অপুষ্টি লাঘবে অন্ত্রের অণুজীবগুলোর ব্যাপক প্রভাব-সংক্রান্ত তথ্য প্রদর্শন; বাংলাদেশের বিদ্যমান টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে মুখে খাওয়ার টিকার কার্যকারিতা প্রদর্শন।
২০১৫ সাল : শিশুদের মধ্যে তীব্র নিউমোনিয়া ও হাইপোক্সিমিয়ার চিকিৎসায় অত্যন্ত কম খরচে বাবল-সিপ্যাপ পদ্ধতির উদ্ভাবন; শিশুদের অপুষ্টি প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় রেডি-টু-ইউজ সাপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড থেরাপেটিক ফুডের (আরইউটিএফ) উদ্ভাবন; তৈরি পোশাকশিল্পের কর্মীরা যেন বুকের দুধ সংরক্ষণ করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে বুকের দুধের পাস্তুরিতকরণ-সংক্রান্ত পরীক্ষামূলক গবেষণা।
২০১৬ সাল : আইসিডিডিআরবি সম্পর্কে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুনের উচ্চ প্রশংসা; আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীর চার্লস সি শেপার্ড পুরস্কার লাভ; নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনের প্রতিবেদনে প্রকাশ মহামারী পরিস্থিতিতে এক ডোজের মুখে খাওয়ার টিকা (ওসিভি) কার্যকর ।
২০১৭ সাল : রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে জোরপূর্বক স্থানচ্যুত মিয়ানমারের জনগণকে মানবতামূলক সহায়তা প্রদান; আইসিডিডিআরবির কনরাড এন হিলটন হিউম্যানিটেরিয়ান প্রাইজ অর্জন।
২০১৮ সাল : মুখে খাওয়ার টিকা (ওসিভি) তৈরির জন্য আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীদের প্রিন্স মহিদল অ্যাওয়ার্ড ২০১৮ লাভ।
২০১৯ সাল : সায়েন্স জার্নাল আইসিডিডিআরবি এবং ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ত্রিক জীবাণু-সংক্রান্ত গবেষণাকে ২০১৯ সালের বিশেষ বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
হাইতি, ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়াসহ পৃথিবীর যে দেশেই কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, সেখানেই আইসিডিডিআরবির চিকিৎসক ও গবেষকরা ছুটে গিয়েছেন এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যকরভাবে কলেরা চিকিৎসা এবং নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। 
আইসিডিডিআরবির অব্যাহত অগ্রযাত্রায় এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এখন আর কেবল বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। সারা বিশ্বে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশসমূহে, এই প্রতিষ্ঠানের গবেষণালব্ধ ফলাফল কাজে লাগিয়ে আর্তমানবতার সেবার জন্য গৃহীত নানা কার্যক্রম ক্রমাগত সমৃদ্ধ হয়ে চলেছে।