প্রতিশ্রুতি, অঙ্গীকার, প্রতিজ্ঞা বা ওয়াদা পালন করা মানব জীবনের একটি মহত্তম গুণ। সংসার জীবনে কঠিনতম কাজগুলোর মধ্যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা, ওয়াদা পালন করা কঠিনতম সর্বোৎকৃষ্ট কাজ। সংসার, সমাজ জীবনে যারা এই গুণের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন, তারাই মানুষের কাছে আদরণীয়, সম্মানিত ব্যক্তি। মনে রাখতে হবে, অপরের সঙ্গে ওয়াদা করা, প্রতিশ্রুতি দেওয়া, শপথ সংকল্প বা বিভিন্ন ধরনের চুক্তি এবং অঙ্গীকার পালন করা ইমানের একটি অঙ্গ। যেকোনো ধর্মে ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি পালনের গুরুত্ব অপরিসীম। দুনিয়ার সবাই ওয়াদা পালনকারী ব্যক্তিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে থাকে। তাকে সম্মান করে এবং মান্যও করে।
আমাদের দেশে কারা সবচেয়ে বেশি কথা দেয় এবং সবচেয়ে কম কথা রাখে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কারণ, এ বিষয়ে তেমন কোনো গবেষণাকর্ম চোখে পড়েনি। তবে আমাদের চারপাশের মানুষগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলে খুব সহজেই চোখে পড়ে রাজনীতিকদের কথা দেওয়া এবং কথা না রাখার বিষয়টি। যদিও এর কারণ আছে। আমাদের দেশের মানুষের চাহিদা ও দাবি-দাওয়ার কোনো শেষ নেই। কেবলই দাও দাও। রাজনীতিবিদরা যখন সাধারণ মানুষের সমর্থন পেতে চান, তখন তাকে নানা প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। কারণ, রাজনীতিবিদদের কাছে সাধারণ মানুষ অনেক ধরনের দাবি-দাওয়া নিয়ে হাজির হন। প্রতিশ্রুতি বা কথা না দিয়ে রাজনীতিবিদদের কোনো উপায় থাকে না। তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ। আর প্রতিশ্রুতি পালনের বাধ্যবাধকতা আমাদের দেশের রাজনীতিতে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
কিছু লোক অঙ্গীকার করে অঙ্গীকার ভাঙার জন্য। প্রতিশ্রুতি দেয় প্রবঞ্চিত করার জন্য। এ ব্যাপারে জগদ্বিখ্যাত নেপোলিয়ান বোনাপার্টের কথা উল্লেখ করা যায়। নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য হেন কোনো কুকর্ম নেই, যা তিনি করেননি। ফরাসিদের কাছে বীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অনেক রাজাকে মেরে রাজ্য দখল করেছেন, অন্য লোকের সম্পত্তি ও স্ত্রীকেও নিজের ভোগের জন্য ব্যবহার করেছেন। ইতিহাসে তিনি বীর হিসেবেই খ্যাত। এই বীরের একটা চমৎকার উক্তি আছে প্রতিশ্রুতি বিষয়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘যদি ওপরে উঠতে চাও, তবে অনেক বেশি প্রতিশ্রুতি দেবে, কিন্তু কোনোটাই বাস্তবায়ন করবে না।’
আমাদের রাজনীতিকরা আসলে নেপোলিয়ানের ভক্ত বেশি। তারা সবাই মনে মনে নিজেদের নেপোলিয়ানের চেয়ে বড় নেতা বা বীর মনে করেন। সে কারণে পদে পদে তারা প্রতিশ্রুতি দিতে থাকেন এবং ততোধিক কার্যকারিতার সঙ্গে এসব প্রতিশ্রুতি পরবর্তী সময়ে অবলীলায় অবজ্ঞা করতে থাকেন। এখন যেমন ঢাকা সিটি নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন, যা তাদের পক্ষে করা সম্ভব, তা যেমন বলছেন, তাদের পক্ষে যা করা সম্ভব নয়, তাও নির্দ্বিধায় বলছেন।
নির্বাচনে প্রার্থীরা যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, আইনগতভাবেই এগুলোর ৯৫ শতাংশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। মেয়র যদি সত্যি সত্যি জনকল্যাণে অতি-উৎসাহী হন, একটু তড়িৎকর্মা হন, উচ্চতর মহলের খাস লোক হন, তাহলে বর্তমান ৫ শতাংশের বদলে বড়জোর আরও ১০-১৫ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারবেন, এর বেশি নয়। এর বাইরে কোনো কিছু করার ক্ষমতা আসলেই তার নেই। কারণ ঢাকা সিটি মেয়রের ক্ষমতা খুবই সীমিত। ভৌগোলিকভাবে তাকে একটি নির্দিষ্ট এলাকার (উত্তর বা দক্ষিণ) ‘প্রধান’ বলা হলেও আসলে তিনি অনেকটাই খর্ব ক্ষমতার। কারণ সাতটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কমপক্ষে ৫৪টি বিভিন্ন ধরনের এজেন্সি ঢাকা শহরে কাজ করে। শহরবাসীকে যাবতীয় সেবা-পরিষেবা দেওয়ার দায়িত্ব মূলত এদেরই হাতে। মেয়রকে এসব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করতে হয়। কিন্তু তারা কেউ-ই মেয়রের আদেশ-নির্দেশ পালনে বাধ্য নন। কারণ এরা কেউই সিটি করপোরেশনের কর্মচারী নন। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর-পরিদপ্তরের-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার লোক। এদের জবাবদিহি মেয়রের কাছে নয়, তাদের স্ব-স্ব বিভাগীয় প্রধানের কাছে।
এমনক মশা মারার দায়িত্ব পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের একার হাতে নেই। বাস্তবে মশা মারার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে আরেকটা সংস্থা আছে, যার নাম ‘ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তর।’ সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ আর এই মশক নিবারণী দপ্তরের মধ্যে আছে বিস্তর রশি টানাটানি! ডেঙ্গুর মৌসুমে মাঝে মাঝে এই রেষারেষির খবর গণমাধ্যমে দেখা যায়। তারপরও ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী মেয়র ও কমিশনার প্রার্থীরা অকাতরে সব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ভোটারদের মানুষের মন পেতে তারা পারলে আকাশ থেকে চাঁদ-সূর্যকেও খুলে আনার প্রতিশ্রুতি দেন! প্রার্থীদের অনেকে তাদের প্রচারের সময় যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সেগুলো হচ্ছেÑ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ডিজিটাল পরিবহন ব্যবস্থা, নিরাপদ শহর গড়ে তোলা, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, নগর-পরিকল্পনা ঢেলে সাজানো, ঢাকাকে জলজট, যানজট, মাদকমুক্ত করা, ৩০ বছরমেয়াদি মহাপরিকল্পনা করে উন্নত ঢাকা গড়ে তোলা, প্রত্যেকটি রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পয়োনিষ্কাশন, সব নাগরিকের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা, রাস্তায় বাতি লাগিয়ে ঢাকা শহরকে আলোকিত করা, খেলার মাঠ দখলমুক্ত করা, নারী ও শিশুবান্ধব ঢাকা, মানবিক ঢাকা গড়ে তোলা ইত্যাদি। যদিও কীভাবে মানবিক ঢাকা গড়ে তোলা হবে, কীভাবে মশা নিয়ন্ত্রণে আসবে, নারী ও শিশুবান্ধব ঢাকা কীভাবে করা যায়, সেই পরিকল্পনাও চোখে পড়েনি। আর বেশির ভাগ প্রতিশ্রুতি পালনের ক্ষমতা মেয়র বা কমিশনারদের নেই। এর জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
যানজটের কথাই ধরা যাক। যানজট দূর করার সাধ্য কি সিটি করপোরেশনের আছে? সিটি করপোরেশন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে তফসিল রয়েছে, সেটির ১৯ দশমিক ১ ধারায় বলা হয়েছে, জনগণ যাতে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে, সে জন্য সিটি করপোরেশন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু সিটি করপোরেশন যে ধরনের যানবাহনের লাইসেন্স দেয় কিংবা নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলো হচ্ছে অযান্ত্রিক বাহন। কিন্তু বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেলÑ এসব বাহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ ও পুলিশের। তবে সরকারের অনুমতি নিয়ে যানবাহনের ভাড়া নির্ধারণ করতে পারবে সিটি করপোরেশন। কিন্তু অতীতে কখনোই সিটি করপোরেশন এটি নিয়ে মাথা ঘামায়নি। ভাড়া নির্ধারণ করার বিষয়টি সব সময় এসেছে পাবলিক বাসের ক্ষেত্রে। বিআরটিএ মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে এ কাজ করেছে সব সময়। এখানে সিটি করপোরেশনের কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। তা ছাড়া সরকার নির্ধারিত ভাড়া বাসমালিকরা কখনোই মানেননি এবং এজন্য কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।
নিরাপদ পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের এখতিয়ার আছে। কিন্তু পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের কোনো অবকাঠামো নেই। ঢাকা শহরের পানি সরবরাহের কাজটি করে ঢাকা ওয়াসা। এমনকি নিরাপদ নগরী গড়ে তোলার ক্ষমতাও সিটি মেয়র-কমিশনারদের নেই। আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশনকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে পুলিশ। তারা সিটি করপোরেশনের অধীনে নয়। নগর-পরিকল্পনায়ও সিটি করপোরেশনের তেমন ভূমিকা নেই। ঢাকা শহরের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ বা রাজউক। যেকোনো ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউকের অনুমোদন নিতে হয়। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। সিটি করপোরেশনের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে রাস্তা মেরামত করা। আইন অনুযায়ী রাস্তার ওপর তাদের সম্পূর্ণ কর্র্তৃত্ব রয়েছে। এ ছাড়া ফুটপাত সিটি করপোরেশনের সম্পদ। এর বাইরে রয়েছে বাজার বসানো বা ওঠানোর ক্ষমতা।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রার্থীরা যা করতে পারবেন, সে ব্যাপারে তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না, যা তারা করতে পারবেন না, সে ব্যাপারেই তারা আগ্রহ দেখাচ্ছেন বেশি। মশা মারার ব্যাপারে তাদের তেমন শক্ত প্রতিশ্রুতি দেখা যাচ্ছে না। গত বছর ব্যাপক মাত্রায় এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগ ছড়িয়েছিল। অনেক মানুষের মৃত্যুও হয়েছিল। এই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের প্রার্থীরা কতটুকু কী করবেন, কীভাবে করবেন, সে ব্যাপারে বিস্তারিত পরিকল্পনা এখনো কেউ তুলে ধরেননি।
যতই নির্বাচন নিয়ে বাজার গরম হচ্ছে, ততই প্রার্থীরা উদ্ভট উদ্ভট প্রতিশ্রুতি নিয়ে মানুষের সামনে হাজির হচ্ছেন। এই প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করা কতটা বাস্তব, কতটা নৈতিক বা কতটা আইনসম্মত হবে, তা নিয়ে অবশ্য কেউই মাথা ঘামাচ্ছেন না। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রত্যেক প্রার্থীরই দায়বদ্ধতা থাকা উচিত।
প্রতিশ্রুতি পালনের ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা থাকা দরকার। উল্লেখ্য, গত বছর অক্টোবরে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চলের এক মেয়রকে তার কার্যালয় থেকে বের করে এনে একটি পিকআপ ট্রাকের সঙ্গে দড়ি বেঁধে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর এ কাজ করেছেন তারই এলাকার স্থানীয় কৃষকরা। মেয়র বলেছিলেন, রাস্তা ঠিক করে দেবেন। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও তা করেননি তিনি। ফলে ক্ষুব্ধ জনগণ মেয়রকে এই সাজা দেন। আমাদের দেশে ভোটাররা যদি সচেতন হতেন, যদি প্রতিশ্রুতি আদায়ে সোচ্চার হতেন, তাহলে কোনো প্রার্থীই বাহুল্য প্রতিশ্রুতি দিতেন না। প্রতিনিয়ত মাইকের আওয়াজ, পলিথিন মোড়ানো পোস্টারে ঢাকা শহরকে দূষিত করে দূষণমুক্ত সুন্দর ঢাকা নগরী গড়ে তোলার স্ববিরোধী প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ‘দুঃসাহস’ দেখাতে পারতেন না!
লেখক
লেখক ও কলামনিস্ট
chiros234@gmail.com