সাংবাদিকদের ইসি মাহবুব

ইসির অভ্যন্তরেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অভ্যন্তরেই কোনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই বলে মনে করেন আলোচিত নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মাহবুব তালুকদার। গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নিজ দপ্তরে লিখিত বক্তব্যে এ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের যেভাবে দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন, তা হচ্ছে না। ওই নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার পর থেকে আজ পর্যন্ত যে তিনটি কমিশন সভা হয়েছে, তার কোনোটিতে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আচরণবিধি, অনিয়ম বা প্রার্থীদের অভিযোগ সম্পর্কে কোনো আলোচনা হয়নি এবং কোনো কমিশন সভায় এসব বিষয় এজেন্ডাভুক্ত হয়নি।’

তার এসব বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইসি রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিষয়টি প্রতিপক্ষের মধ্যে নিশ্চিত করা বা থাকা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশন তো একক সত্তা। এর মধ্যে তিনি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কেন খুঁজছেন?’

ইসি মাহবুব তার লিখিত বক্তব্যে আরও বলেন, ‘আগামী ২৮ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে যে নির্বাচন কমিশন সভা হতে যাচ্ছে, তাতেও ঢাকা সিটি করপোরেশন সম্পর্কে কোনো বিষয় এজেন্ডাভুক্ত নয়। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে আমি বিগত ৯, ১৩, ১৬ ও ২০ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে যে ৪টি ইউ ও নোট প্রদান করেছি, তা রীতিমতো উপেক্ষা করা হয়েছে এবং আমলে নেওয়া হয়নি। এসবের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোনো আলোচনা হয়নি বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও গৃহীত হয়নি। যদি আমার বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য  হয়, তাহলেও আমাকে তা জানানো উচিত ছিল।’ 

তিনি বলেন, ‘বিগত ১৬ জানুয়ারি প্রদত্ত ইউ ও নোটের মাধ্যমে কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই রিটার্নিং অফিসারের কাছে আমি প্রার্থীদের বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে তথ্যাদি জানাতে বলেছিলাম। এসব অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে ২০ জানুয়ারি ২০২০ তারিখের মধ্যে আমার কাছে পেশ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার সেই নির্দেশ উপেক্ষিত হয়েছে এবং কোনো তথ্যই আমাকে সরবরাহ করা হয়নি।’ এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইসি মাহবুব নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এমন বক্তব্য দিচ্ছেন অভিযোগ করে ইসি রফিকুল বলেন, ‘দুই রিটার্নিং কর্মকর্তার নিয়োগের বিষয়ে তার সম্মতি ছিল। কিন্তু একজন রিটার্নিং কর্মকর্তার বিষয়ে একজন কমিশনারের ভিন্নমত থাকার পরও তার (ইসি মাহবুব) প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।’ এর মানে কী দাঁড়ায় প্রশ্ন রেখে এই কমিশনার বলেন, ‘তাহলে কি সেই কমিশনার বলবে তার প্রস্তাব আমলে নেওয়া হয়নি। আমি জানি না তিনি কেন এই প্রশ্ন তুলেছেন।’ এ প্রসঙ্গে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আলমগীর তার দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘রিটার্নিং কর্মকর্তাকে কোনো তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে পাঁচজন নির্বাচন কমিশনারকেই দিতে হবে। তিনি শুধু একজন কমিশনারকে তথ্য দিতে বাধ্য নন।’

আচরণবিধির প্রসঙ্গ টেনে ইসি মাহবুব বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর পক্ষ থেকে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে যেসব অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বা অভিযোপত্র প্রেরিত হয়েছে, তা নিয়ে কমিশনে কোনো প্রকার আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এসব অভিযোগের পেছনে যে অসন্তোষ আছে, তা বিস্ফোরিত হলে সিটি করপোরেশন নির্বাচন যথোপযুক্তভাবে অনুষ্ঠিত হবে না, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর দায়ভার নির্বাচন কমিশনকে বহন করতে হবে।’ এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেনের নির্বাচনী প্রচারের সময় নৌকা ও বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে টিকাটুলীতে সংঘর্ষের ঘটনায় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ঢাকা উত্তরে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথের ওপর হামলার তদন্ত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদনে বলেছে দুই গ্রুপ পুলিশকে না জানিয়ে সেখানে গিয়েছে। দুই গ্রুপ মুখোমুখি হওয়ায় ধাক্কাধাক্কি হয়েছে, তাদের জানালে এমনটা হতো না। আমি বলেছি কমিশনকে দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে দেওয়ার জন্য।’

লিখিত বক্তব্যে ইসি মাহবুব আরও বলেন, ‘আমার ধারণা কমিশন সভায় আমার বক্তব্য প্রদানের স্থান সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরেই কোনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। আমরা নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করতে চাই। আমাদের কর্মকা-ে তা দৃশ্যমান হওয়া বাঞ্ছনীয়।’ তবে ইসি রফিকুল কমিশনকে একক সত্তা অভিহিত করে বলেন, ‘অনেকের কাছেই মনে হতে পারে আমি যেভাবে চাইছি কমিশন সেভাবে চলছে না। প্রশ্ন হচ্ছে কমিশন তো কারও একক সিদ্ধান্তে চলতে পারে না।’

লিখিত বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইসি মাহবুব বলেন, ‘যে মুহূর্ত থেকে আমি এই চেয়ারে বসেছি সেই মুহূর্ত থেকে আমি কোনো দলের নই। আমি আমার বিবেক দ্বারা পরিচালিত।’ সরকারি দল সবসময় একটা কথা বলে আপনি বিএনপির পারপাস সার্ভ করার জন্য বসেছেন, আপনার পদত্যাগ করা উচিত এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যে কেউ যেকোনো কিছু বলতে পারে, যে কোনো তকমা আমার পেছনে লাগানো যেতে পারে, কিন্তু আমার অতীত ইতিহাস যারা জানেন তারা কখনো বলবেন না যে আমি কোনো নির্দিষ্ট দলের। কোনো দলের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। কারও সঙ্গে কোনো মতবাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। আমি আমার বিবেক দ্বারা পরিচালিত। এটা তাদের রাজনৈতিক বিষয় হতে পারে। কিন্তু আমি সেগুলো অতিক্রম করে যেতে চাই।’ প্রচারে আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে, আপনারা চুপ কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি তো চুপ না। আমি স্পষ্টভাবে আচরণবিধি সম্পর্কে অভিমত দিয়েছি। সুতরাং এই প্রশ্নের আলাদা জবাব হয় না। আমার চোখের সামনে কেবল ঢাকাবাসী নয়, আমি এ দেশের নীরব জনগোষ্ঠীর ভাষা যেটা অশ্রুত, সেই অশ্রুত ভাষা শোনার জন্য চেষ্টা করি, তাদের কি ভাষ্য।’

নিজেদের (কমিশন) মধ্যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকলে ভোটের মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কীভাবে থাকবে এমন প্রশ্নে ইসি মাহবুব তিনি বলেন, ‘আমরা তো এক মেশিনে তৈরি না। আমাদের পাঁচজনের পাঁচ রকম মত হতেই পারে। অনেক বিষয় রয়েছে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। সেটাই স্বাভাবিক। কোনো কোনো বিষয়ে ভিন্নমত থাকে। সেটা কারও ওপর চাপিয়ে দিতে পারি না। গণতান্ত্রিক দেশে ভিন্নমত থাকতেই পারে। কমিশনের সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেখানে সংখ্যালঘিষ্ঠ হিসেবে আমার প্রস্তাব হয়ত গৃহীত হয় না।’