ভারতের ‘আত্মা’ রক্ষার লড়াই

জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি), সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) ও জাতীয় আদমশুমারি (এনপিআর) নিয়ে বিতর্কের মধ্যে গত রবিবার ৭১তম প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করেছে ভারত। রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজনের কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু দিবসটি ভিন্নভাবে উদযাপন করেছেন বিতর্কিত ইস্যুগুলো নিয়ে আন্দোলনকারীরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী ভারতীয়রা ওয়াশিটন, নিউ ইয়র্ক, শিকাগো, হাস্টন, আটলান্টাসহ অন্তত ৩০টি শহরে বিক্ষোভের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করেছেন। তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করে সিএএ বাতিলের দাবি জানান।

রাজধানী দিল্লিতে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। এর মধ্যে শাহিনবাগে নারীরা তেরঙা জাতীয় পতাকা হাতে সিএএবিরোধী সেøাগান দেন, জাতীয় সংগীতে গলা চড়ান। প্রজাতন্ত্র দিবসে একই বিক্ষোভ হয়েছে কলকাতা, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, মুম্বাই, লক্ষ্মৌসহ অন্যান্য শহরে। কেরালায় ৬২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মানববন্ধন হয়েছে।

আলজাজিরা বলছে, শাহীনবাগের ঠিক ৯ মাইল দূরে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারোকে (আমন্ত্রিত প্রধান বক্তা) নিয়ে প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করেন। অতিথিদের নিয়ে তিনি সেনাবাহিনীর প্যারেড এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির প্রদর্শনী উপভোগ করেন। এতে বিক্ষোভকারীদের চোখে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র বাস্তবায়নের হোতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও অংশ নেন।

গত বছর ১১ ডিসেম্বর পার্লামেন্টে সিএএ পাস হয়। এ আইনে ২০১৫ সালের আগে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা মুসলিম বাদে সবাই ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন। এরপর থেকে টানা ৪২ দিন দিল্লির শাহিনবাগে বিক্ষোভ করছেন নারীরা। ২৯ জানুয়ারি তাদের আহ্বানে ভারতে বন্ধ পালিত হবে।

সমালোচকরা বলছেন, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান লঙ্ঘন করে গত ১০ জানুয়ারি বিজেপি সরকার সিএএ কার্যকর করে। এতে মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ প্রায় ২০ কোটি মুসলিম কোণঠাসা হয়ে পড়বে। তাদের আশঙ্কা, সিএএ, এনআরসি ও এনপিআর উদ্যোগে জাতীয়তার প্রমাণ দিতে না পারলে, বিতাড়ন করা হবে। সরকার এ আশঙ্কা নাকচ করার সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ‘বিভ্রান্ত’ উল্লেখ করেছে। এরপরও ভারতে প্রত্যেক দিন বিক্ষোভ বাড়ছে।

১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান রচিত হয়। এরপর থেকে এই সংবিধানের আলোকে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত হয়েছে। রবিবার মধ্যরাতে শাহিনবাগের বিক্ষোভে সেই সংবিধানই পড়ে শোনান ৭৫ বছর বয়সী সারওয়ারি। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘এটি আমার জন্য অনেক গৌরবের। আজকের আগে কখনো আমি পতাকা হাতে প্রতিনিধিত্ব করিনি।’ সারওয়ারির আশপাশে অসংখ্য নারী-পুরুষ সেøাগান দিতে থাকেন, হাতে পতাকা। বোরকাপরা অনেকে মুখে পতাকা আদলে তেরঙা এঁকেছেন। শিশুরাও পতাকা ওড়াচ্ছে। শাহিনবাগের বাসিন্দা আবিদ আহমেদ বলেন, ‘আগতদের জন্য আজ ঐতিহাসিক দিন। আমরা আমাদের সংবিধান বোঝার জন্য সরকারকে চাপ দিচ্ছি। বিতর্কিত আইন বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। কারণ আইনটি আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’

ডিসেম্বর থেকে শাহিনবাগে আন্দোলন করছেন ১৬ বছর বয়সী ইনসা হুসাইন। তিনি বলেন, ‘সংবিধান ভারতের আত্মা। ৭০ বছর আগে এই দিনে আমরা সংবিধান পাই। সেটি এখন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আমরা আত্মার জন্য লড়াইয়ে নেমেছি, যেকোনো মূল্যে রক্ষা করব। স্বাধীনতার ৭৩ বছর পরে এসে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকদের মধ্যে বিভেদ দুঃখজনক। এসব না করে সরকারের জনগণের কর্মসংস্থানে মনোযোগ দেওয়া উচিত।’