কোবি ব্রায়ান্টের মৃত্যুর দিনে তার ক্যারিয়ারের কালো অধ্যায় উঠে এলো প্রচারে। ২০০৩ সালে এক ধর্ষণ মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন এই বাস্কেটবল কিংবদন্তি। সেই ঘটনা তুলে রবিবার ব্রায়ান্টের মৃত্যুর খবর প্রকাশের দুই ঘণ্টার মধ্যে টুইট করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টের এক রিপোর্টার। একদিন পর তাকে ওই পোস্টের জন্য বরখাস্ত করে পোস্ট। এর প্রেক্ষিতে ওই রিপোর্টারের সহকর্মী ও বিভিন্ন কলামিস্ট ওয়াশিংটন পোস্টের এমন পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। ব্যাপারটি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, নাম রক্ষা করতে গিয়ে ভর্ৎসনা হজম করতে হচ্ছে ওয়াশিংটন পোস্টকে।
রবিবার পুরো বিশ্ব ব্রায়ান্টের মৃত্যুর খবর জানতে পারে। ভক্তরা হেলিকপ্টার দুর্ঘটনাটি কীভাবে হয়েছিল সেসব জানতে ব্যস্ত। এমন সময় ওয়াশিংটন পোস্টের রাজনীতিবিষয়ক রিপোর্টার ফেলিসিয়া সোনমেজ ২০০৩ সালের একটি সংবাদের লিঙ্ক যুক্ত করে টুইট করেন। লিঙ্কটা ছিলÑ ‘কোবি ব্রায়ান্টের বিরক্তিকর ধর্ষণ কেস : ডিএনএ প্রমাণ, অভিযোগকারীর গল্প এবং অর্ধ-স্বীকারোক্তি’। কিংবদন্তি তারকার অকাল মৃত্যুর দিনে এই পোস্ট মেনে নিতে পারেননি ভক্তরা। কিছু সময়ের মধ্যে ফেলিসিয়াকে মেরে ফেলার হুমকি ঝড়ের বেগে আসতে থাকে। সোনমেজ বিষয়টি তুলে আবারও টুইট করেন এভাবে, ‘বাজে ব্যবহার ও মেরে ফেলার হুমকি। কমপক্ষে ১০ হাজার লোকের কাছ থেকে। যেকোনো নামি ব্যক্তিত্বকে তার সবকিছু মিলিয়েই মনে রাখা উচিত।’ অবশ্য এই টুইটগুলো বেশিক্ষণ স্থায়ী ছিল না। খানিক পর সবগুলো ডিলিট করেন সোনমেজ। সম্ভবত ততক্ষণে নিজের বরখাস্তের নোটিসও পেয়ে যান তিনি।
আমেরিকান অপর নামি সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ওয়াশিংটন পোস্টের নির্বাহী সম্পাদক মার্টিন ব্যারন সোনমেজকে ই-মেইল করে জানান, ‘এমন টুইট করে তুমি বুদ্ধিহীনতার পরিচয় দিয়েছ। দয়া করে থামো। এটা করে তুমি এই প্রতিষ্ঠানকে কলঙ্ক দিচ্ছ।’ এরপর সোমবার ওয়াশিংটন পোস্টের ম্যানেজিং এডিটর ট্রেসি গ্রান্ট জানান, ‘সোনমেজের টুইটগুলো অসময়োপযোগী ছিল এবং এর মধ্যে সে তার সহকর্মীদের কাজকে খাটো করেছে।’
এদিকে সনমেজের বরখাস্তের খবর প্রকাশের পর উল্টো চিত্র। ওয়াশিংটন পোস্টের অনেক কর্মী এবং সংবাদমাধ্যমের লোকরা বিভিন্ন আউটলেট নিয়ে সংবাদমাধ্যমটির এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। পোস্টের মিডিয়া বিশ্লেষক এরিক বিম্পল বলছেন, ‘ভুল বিচার’। নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিনের ওয়াশিংটন প্রতিনিধি ওলিভিয়া নুজ্জি টুইট করে জানান, ‘সংবাদমাধ্যমগুলোর উচিত তাদের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দেওয়া, পাশে থাকা, তাদের দোষী করা নয়। ওয়াশিংটন পোস্ট খুবই বাজে একটি উদাহরণ দিল এবং সাংবাদিকদের জন্য সব কঠিন করে দিল।’
বরখাস্ত হওয়ার পর ফেলিসিয়া সনমেজ তার বাড়ি পরিবর্তন করতে বাধ্য হন।
২০০৩ সালে কলোরাডোর এক নারী হোটেল কর্মী ব্রায়ান্টের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ আনে। তবে অভিযোগকারী আদালতে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করেন। জানা যায়, আদালতের বাইরে ২৫ লাখ ডলারে অভিযোগকারীর সঙ্গে মিটমাট হয় ব্রায়ান্টের। পরে ব্রায়ান্ট এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেছিলেন তার সঙ্গে জোর করে কিছু হয়নি, যা হয়েছিল তার সম্মতিতেই হয়েছিল। একই সংবাদ সম্মেলনে ব্রায়ান্টের স্ত্রী ভেনেসা বলেছিলেন, ‘আমার স্বামী একটা ভুল করেছে। বিষয়টা আমরা নিজেরাই সংসারে থেকে মিটিয়ে ফেলব। সে (ব্রায়ান্ট) ক্রিমিনাল নয়।’
চোখের জলে ব্রায়ান্টকে স্মরণ
লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের স্টেপলস সেন্টার। গ্লাস ও স্টিলে নির্মিত রাজপ্রাসাদ বলা চলে এটিকে। বিশালাকায় এই মাল্টিপারপাস স্টেডিয়ামটিতে বাস্কেটবল, রেসলিং, আইস হকি, অ্যারেনা ফুটবল ও কনসার্ট হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি কাজে আসে আমেরিকান বাস্কেটবল দল লস অ্যাঞ্জেলেস লেকার্সের। এ দলটিতেই খেলতেন বাস্কেটবল কিংবদন্তি কোবি ব্রায়ান্ট। লোকমুখে প্রচলিত স্টেডিয়ামটি গড়েছেন ব্রায়ান্ট। ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে নির্মিত হয় স্টেডিয়ামটি। যে মৌসুম থেকেই ব্রায়ান্টেরও লেকার্সের হয়ে ক্যারিয়ারের আসল পর্ব শুরু হয়। তাই বলা হয় ব্রায়ান্টের ক্যারিয়ারের যত অর্জন বা ইতিহাস, তা এই বিশালাকায় প্রাসাদের প্রতিটি কাচ-লোহায় লেগে আছে। রবিবার কোবি ব্রায়ান্টের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর থেকে এই তারকাকে সম্মান জানাতে স্টেডিয়ামটির বাইরে হাজারো ভক্তের ভিড় লেগেই আছে।
সোমবার ব্রায়ান্টের বিদেহী আত্মার প্রতি সম্মান জানাতে অবিরাম আনাগোনা ছিল ভক্তদের। আমেরিকান বাস্কেটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকাকে অনেকেই পরিবারের একজন ভাবতেন। তাই ব্রায়ান্টের কথা চিন্তা ছাড়া একদিনও কাটে না অনেক আমেরিকান পরিবারের। তাই কেউ হয়তো স্কুল থেকে আবার কেউ কাজ থেকে ছুটি নিয়ে স্টেপলস স্টেডিয়ামের সামনে জড়ো হয়েছেন তাদের পরিবারেরই একজনকে শ্রদ্ধ জানাতে। তেমনই একজন ভক্ত লরেন্স পেরেজ। তিনি এসেছিলেন স্ত্রী মওরিন ও ১৫ বছর বয়সী কন্যা ডিসায়ারকে নিয়ে। জানালেন, ‘আমরা তাকে পরিবারের একজন ভাবতাম। পরিবার হিসেবে তিনি আমাদের যে স্মৃতি দিয়ে গেছেন তা এককথায় অসাধারণ। আমরা বাড়িতেই থাকতে পারতাম। কিন্তু সবাই যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে (ব্রায়ান্টকে হারানোয় ব্যথিত হওয়া অর্থে) আমরাও তার সঙ্গে যুক্ত হতে এসেছি।’
স্টেপলস অ্যারেনার অপর স্বাগতিক দল লস অ্যাঞ্জেলেস ক্লিপার্স। লেকার্সের চেয়ে কম শক্তির এই দলটির বিপক্ষে মঙ্গলবার ম্যাচ লেকার্সের। কিন্তু লেকার্সের প্রিয় ‘ব্লাক মাম্মা’ (ব্রায়ান্টের ছদ্মনাম, অর্থÑ বিষাক্ত সাপ) মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তাই ব্রায়ান্টের সম্মানে ম্যাচটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার ভক্তরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছিল, কাঁদছিল; এসবে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। পাশাপাশি ব্রায়ান্টের দেওয়া সুখস্মৃতি রোমন্থনের কষ্টহাসি কখনো কখনো পরিবেশ শান্তও করে তুলছিল। লরেন্স পেরেজ যেমন ব্রায়ান্টের অটোগ্রাফ পাওয়ার দিনটির কথা স্মরণ করলেন, ‘আমার জীবনের সেরা মুহূর্তটি হলো ব্রায়ান্টের অটোগ্রাফ পাওয়া। তখন সে খুব ছোট ছিল, আমি ওকে দেখেই বুঝেছিলাম ওর মধ্যে বিশাল কিছু লুকিয়ে আছে। কাছে আসতেই ওর কাছে আমি অটোগ্রাফ চাই। সে মৃদু হেসে আমার সঙ্গে হাত মেলাল এবং অটোগ্রাফ দিল। আমি ওকে বলেছিলাম, শিগগিরই তোমাকে লেকার্সের শুরুর লাইনআপে দেখব। কিন্তু এমন কিছু আর হবে না।’
এ বছর শেষদিকে আমেরিকান বাস্কেটবল হল অব ফেমে নাম ওঠার কথা ছিল ব্রায়ান্টের। পেরেজ ভেবেছিলেন প্রথম যে বলে অটোগ্রাফ নিয়েছিলেন সেই বলটাই নিয়ে দ্বিতীয়বার অটোগ্রাফের আবদার করবেন সেদিন। কিন্তু তা আর হচ্ছে না।
ব্রায়ান্টের স্মরণে ফুল, বেলুন, মোমবাতি (কতগুলো ব্রায়ান্টের ছবিসহ), টুপি, জার্সি, ছবি বা পেইন্টিং যে যা পেরেছে তাই নিয়ে হাজির হয়েছে স্টেপলস সেন্টারের সামনে। কেউ কেউ ব্রায়ান্ট ও তার মেয়ের ছবি কোনো পরীর পাখায় ধরা আছে এমন ছবিও এনেছেন। অনেকেই ইংরেজি, স্প্যানিশ, চাইনিজে লেখা ব্যক্তিগত বিদায়ী নোট দিয়ে গেছেন।
লস অ্যাঞ্জেলেস নিবাসী লুই গেরেরো নামক ভক্ত তার দুই বছরের ছোট্ট মেয়ে লেক্সিকে নিয়ে এসেছেন। লেক্সির পরনে লেকার্সের ছোট টি-শার্ট। জানান, ‘আমি আমার প্রিয় শু-টা রেখেছি। লেকার্সের অফিশিয়াল স্টোর থেকে কিনেছিলাম।’ মিশেল রদ্রিগেজ নামক আরেক ভক্ত ওভারনাইট কাজ করে এসেছেন শেষ শুভেচ্ছা জানাতে। তার গায়েও ছিল লেকার্সের জার্সি। জানালেন, ‘আমরা সবাই বলব লেকার্সকে ভালোবাসি। কিন্তু দলে ব্রায়ান্ট থাকা মানে বিশেষ কিছু। সে শুধু বাস্কেটবল নয়, এই শহরের জন্য যা করেছেন তা অতুলনীয়। সে এই শহরের নায়ক।’