সাত বছর পর আবারো মাঠে গড়ানোর অপেক্ষায় নারী ফুটবল লিগ। গেল ২৬ জানুয়ারি শেষ হয়েছে লিগের দলবদল। এখন কিক অফের অপেক্ষা। তবে অনেক দিন পর লিগ মাঠে গড়ানোর স্বস্তি থাকলেও অন্য অনেক বিষয়েই থাকছে প্রশ্ন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, জাতীয় দলের অন্যতম মুখ মার্জিয়া আক্তার, শামসুন্নাহার জুনিয়রসহ বয়সভিত্তিক ফুটবলের একঝাঁক পরিচিত মুখের কোনো দলই না পাওয়া।
লিগ মাঠে গড়াবে, কিন্তু বসে থাকবেন আনুচিং মগিনি, আনাই মগিনি, নাজমা আক্তার, ঋতুপর্ণা চাকমা, সাজেদা, রোজিনার মতো প্রতিশ্রুতিশীল তারকারা। শেষ ক’বছরে বয়সভিত্তিক ফুটবলে বাংলাদেশের সাফল্যে যারা নিজেদের চিনিয়েছেন দারুণভাবে। দেশের সিংহভাগ সাফল্যই এসেছে তাদের হাত ধরে।
মার্জিয়া, আনুচিংদের এই দল না পাওয়ার বড় কারণ আগ্রহ দেখিয়েও শেষ মুহূর্তে শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের লিগ থেকে সরে যাওয়া। মার্জিয়া, আনুচিংসহ বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের বেশির ভাগ ফুটবলারদের সঙ্গে কথা প্রায় পাকা করে রাখে দলটি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তারা লিগে অংশ না নেওয়ায় বিপাকে পড়েন মার্জিয়ারা।
অনিশ্চয়তা বুঝতে পেরে বসুন্ধরা কিংসে নাম লেখান শেখ রাসেলে কথা প্রায় চূড়ান্ত করা তিন ফুটবলার। তারা হলেন- দেশের সেরা দুই মিডফিল্ডার মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দা ও গোলরক্ষক রূপনা চাকমা। কিন্তু অন্যরা থেকে যান অন্ধকারে।
সব মিলে জাতীয় দলের ১৯ ফুটবলার নিয়ে বসুন্ধরা কিংস দুর্দান্ত একটা দল। যাদের টেক্কা দেওয়ার কেউ নেই। বলতে গেলে বসুন্ধরা অংশ নিচ্ছে বলেই কিছুটা আগ্রহ থাকছে লিগটি ঘিরে। নইলে এই লিগকে বলা যেত জেলার কোনো এক লিগ।
নারী লিগে অংশ নেওয়া বসুন্ধরা ছাড়া অন্য সাতটি দল হলো- বেগম আনোয়ারা স্পোর্টিং ক্লাব, এফসি উত্তরবঙ্গ, কাচারিপাড়া একাদশ, কুমিল্লা ইউনাইটেড, নাসরিন স্পোর্টিং ক্লাব, স্বপ্নচূড়া আক্কেলপুর এফএ, স্পার্টান এমকে গ্যালাকটিকো সিলেট এফসি।
২০১১ ও ২০১৩ সালের হওয়া দুটি লিগের শিরোপাধারী শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব এবং আবাহনী লিমিটেড এবার অংশই নিচ্ছে না। আগের দুটি লিগেই রানার্সআপ মোহামেডানও নেই। সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব শুরুতে আগ্রহ দেখালেও পরে সরে দাঁড়ায়। অন্য স্বীকৃত দলগুলোও আগ্রহ দেখায়নি এই লিগ নিয়ে।
৩১ জানুয়ারি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কারণে তা দিন কয়েক পেছাচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে অনেক দিন পর লিগ মাঠে গড়ালেও এই লিগকে আবেদনহীন বলছেন কৃতী ক্রীড়াবিদ ও বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামরুন নাহার ডানা।
দেশে নারী ফুটবল শুরুর অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করা ডানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই লিগের কোনো আবেদন নেই। এভাবে দেশের সর্বোচ্চ স্তরের কোনো লিগ হতে পারে না।’
বিষয়টি মেনে নিচ্ছেন বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ইমরুল হাসানও। বললেন, ‘অনেক দিন পর লিগ শুরু হচ্ছে এটা ইতিবাচক দিক। তবে আমার মনে হয় অন্তত প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোর আসা উচিত ছিল। তাহলে হয়তো লিগের আবেদনটা বাড়ত। তারপরও প্রিমিয়ার লিগের যারা বলেছিল খেলবে, তারা শেষ পর্যন্ত খেলল না। এটা অবশ্যই লিগের জৌলুশ কমাবে।’
বাংলাদেশের মেয়েরা শেষ কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক আঙিনায় বয়সভিত্তিক পর্যায়ে দাপট দেখালেও ঘরোয়া কাঠামো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। দেশে নারী ফুটবলার তৈরির একমাত্র উৎস বঙ্গমাতা আন্তঃপ্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল প্রতিযোগিতা। সেখান থেকে উঠে আসা মেয়েরাই কয়েকটা ধাপ পেরিয়ে বাফুফের ক্যাম্পে সুযোগ পান। দীর্ঘ মেয়াদে যে ক্যাম্প করে সুফল বাফুফে পেয়েছে। পেয়েছে দেশ।
কিন্তু লিগ না থাকায় ক্যাম্পের মেয়েদের হাহাকার ছিল- প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলতে না পারার। লিগ হলে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার মাধ্যমে নারী ফুটবল দল আরো শক্তিশালী হবে, ফুটবলাররাও লাভবান হবেন আর্থিকভাবে। স্বয়ং ফুটবলারদেরই দাবি ছিল এটি।
কিন্তু বাফুফের ক্যাম্পে নিয়মিত যে ৪০-৫০ জন ফুটবলার রয়েছেন, তাদের মধ্যে বসুন্ধরায় সুযোগ পাওয়া ১৯ জন বাদে অধিকাংশই নামে মাত্র পারিশ্রমিকে খেলতে যাচ্ছেন অখ্যাত ক্লাবগুলোতে। মার্জিয়া, আনুচিংরা সেসব ক্লাবে খেলার তাদিগও অনুভব করেননি।
এখন লিগ হলেও অবস্থা এমন এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনো ঝাঁঝ নেই। তাহলে আখেরে লাভটাই বা কী হচ্ছে?
বাফুফের নারী কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ অবশ্য তৃপ্ত শেষ পর্যন্ত লিগ মাঠে গড়াচ্ছে বলে, ‘লিগ অবশেষে গড়াচ্ছে সেটাই বড় কথা। অনেক দিন পর লিগ হচ্ছে, শুরুটা যে মসৃণ হবে এটা আমরা আশা করতে পারি না। এভাবে শুরু হলেও ডে বাই ডে অবশ্যই ঠিক হবে।’
কিন্তু জাতীয় দলের খেলোয়াড়রাই যে বসে থাকবেন লিগে। এই প্রশ্নে মেয়েদের অভিভাবকের জবাব, ‘মেয়েরা দল পায়নি এটা তো কোনো কথা না। ক্লাব যাদের নেবে তারাই খেলবে। ক্লাব না নিলে তো কোনো কিছু করতে পারেন না।’
কিন্তু কামরুন নাহার ডানা এখানে বাফুফের পরিকল্পনাকে দায়ী করছেন। তার মতে, ‘গড়পড়তার ধরলে আমাদের হয়তো ২০০ ফুটবলার আছে। ভালো মানের ধরলে সংখ্যাটা ৩০। এখানে পুল করে দিলেও সব দল ভালো খেলোয়াড় পেত। তাতে টিম গড়ার জন্য আগ্রহী হতো দলগুলো। এতগুলো মেয়েকে এভাবে বসে থাকতে হতো না।’
এখানে বাফুফের নারী কমিটির প্রধান কিরণের ব্যাখ্যা, ‘পুল কখনো ফুটবলের জন্য ভালো কিছু না। এটা করলে ফুটবলের ক্ষতিই হয়। লাভ হয় না।’
কিন্তু বাফুফে ক্লাবগুলোকে লিগে অংশ নিতে বাধ্য করতে পারল না কেন। জানতে চাইলে কিরণ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘আমাদের দিক থেকে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করিনি। এখন যদি ক্লাব না আসে তাহলে কী করার। আপনারা আমাকে যে প্রশ্নগুলো করছেন, সেই প্রশ্নগুলো ক্লাবগুলোকে করেন না কেন? প্রশ্নটা তাদের করেন কেন তারা ছেলেদের ফুটবল খেললেও মেয়েদের ফুটবল খেলছে না।’
বসুন্ধরা কিংস সভাপতি ইমরুল হাসান এ ক্ষেত্রে বলছেন, ‘আমার সুপারিশ বা মতামত যেটাই বলেন আমি বলব, বাফুফের উচিত এটা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া। যে প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোকে খেলতেই হবে।’
এবারের লিগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি যোগ করেন, ‘শেষ মুহূর্তে দুয়েকটি ক্লাব নাম প্রত্যাহার করায় অনেকে দল পায়নি। জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা দল পায়নি এটা দুঃখজনক ঘটনা। এটা দলগুলোর উদাসীনতা বলব। আর বাফুফেরও এখানে কঠোর হওয়া উচিত ছিল। অন্তত যারা শুরুতে হ্যাঁ বলে সরে দাঁড়িয়েছে তাদের ক্ষেত্রে কঠোর হতে পারত বাফুফে।’
অনেক দূর এগিয়েও শেখ রাসেল কেন শেষ মুহূর্তে সড়ে দাঁড়ায়?
ক্লাবটির পরিচালক সালেহ জামান সেলিম বলেন, ‘আসলে আমাদের ক্লাবের এক নম্বর চেয়ারম্যান দেশের বাইরে ছিলেন। আর আমি তাপস সাহেবের (শেখ ফজলে নূর তাপস) নির্বাচন নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত। সূত্রাপুর থানায় আমি তাপস সাহেবের নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়কারী। একদিকে নির্বাচন আর চেয়ারম্যান সাহেব বাইরে যাওয়ায় ক্লাবের অন্য কর্মকর্তারা যোগাযোগটা সেভাবে রাখতে পারেনি। যখন আমি জানতে পারছি তখন বেশির ভাগ খেলোয়াড় বসুন্ধরায় চলে গেছে। শেখ রাসেল তো যা তা টিম করে আসতে পারে না। আল্লাহ যদি চায়, সামনে একটা ভালো টিম করবে শেখ রাসেল।’
নিজেরা এবার দল গড়েননি। তবে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোকে নারী দল গঠন বাধ্যতামূলক করার দাবি জানালেন সালেহ জামান সেলিমও, ‘নারী ফুটবল নিয়ে আগ্রহ কম দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। সামনে থেকে এটা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হোক, আমি এটাই বলব। যারা আসছে কিংসের সাথে (এবারের লিগের ক্লাবগুলো)। এখানে তো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হবে না। ওদের সাথে ৮টা, ১০টা ২০টা করে গোল খাবে। যারা খেলতে আসছে তারা শৌখিন। এদের দিয়ে হবে না। শুধু প্রিমিয়ার লিগ না, চ্যাম্পিয়নশিপের দলগুলোকেও নারী দল করতে হবে এটাই বলব।’
অনেক প্রশ্ন রেখে লিগ মাঠে গড়াবে। তবে আবেদনহীন লিগের আগেও কামরুন নাহার ডানার প্রশ্ন এত দিন কেন লিগ হলো না, ‘আমার প্রথম কথা ২০১১ সালে প্রথম লিগ হয়েছে। এক বছর বিরতি দিয়ে ২০১৩ তে হয়েছে। তারপর ছয় বছরের বিরতি কেন।’
‘এই ছয় বছর যে লিগ হয়নি মেয়েরা কোনো আর্থিক বেনিফিট পায়নি। এই যে মেয়েদের ছয়টা বছর জীবন থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে এর সমস্ত দায় ফেডারেশনকেই নিতে হবে। তারা ব্যর্থ হয়েছে।’
এদিকে নারী ফুটবল লিগ মাঠে না গড়ানো নিয়ে বাফুফে ও ক্লাবগুলোর যখন একে-অপরকে দায় চাপায় তখন ডানা বলেন, ‘আগে তো মোহামেডান, আবাহনী, শেখ জামাল টিম করেছে। এটা কি কারো মামা বাড়ি যে যখন ইচ্ছা, তখন আমি প্রোগ্রাম দিলাম...। অনেকে বলতে পারে কেন মোহামেডান, আবাহনী বা শেখ জামাল খেলেনি। ওদের (বাফুফে) ইচ্ছেমতো তো আসলে ক্লাব চলবে না। সবকিছু একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে।’
ছয় বছর লিগ না করে বাফুফে নির্বাচনের দুই মাস আগে লিগ কেন এই প্রশ্নও রাখেন ডানা।