কথা রাখেননি ব্যবসায়ীরা বাগে আসেনি বাজার

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। পণ্যের দাম যাতে না বাড়ে সেজন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে সরকার। সেখানে ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্যের দাম আর বাড়ানো হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া দাম নিয়ন্ত্রণে গত অক্টোবর থেকে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করে আসছে সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। খোলাবাজারে চাল ও আটা বিক্রি করছে খাদ্য অধিদপ্তর। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে। এরপরও বেড়েছে চাল, আটা, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম। এজন্য সরবরাহ সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে নাভিশ্বাস উঠেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের। এ প্রেক্ষাপটে ভোজ্যতেল ও চিনির ওপর আরোপিত ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আবারও বৈঠকে বসতে চাইছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

টিসিবি তথ্য অনুযায়ী

সপ্তাহের ব্যবধানে মিনিকেট চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫ টাকা ও মোটা চালে বেড়েছে ৩ টাকা। এ নিয়ে গত চার মাসে মিনিকেট চাল কেজিতে বেড়েছে ১২ টাকা। তবে রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে পণ্যটির দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৭ টাকা। আর গত চার মাসে বেড়েছে ১৫ টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ময়দা ১০-১২ টাকা, আটা ৩ টাকা, চিনি ২০-২৫ টাকা, মসুর ডাল ১৫-২০ টাকা, গুঁড়ো দুধ ২০-৩০ টাকা, সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২২ টাকা, পাম অয়েল প্রকারভেদে ১৮-২০ টাকা বেড়েছে। দেশি পেঁয়াজ এখনো কেজিপ্রতি ১৩০-১৪০ টাকা, ফুলকপি-বাঁধাকপি প্রতিটি ৪০ টাকা। তেলাপিয়া ও পাঙ্গাশ ছাড়া ২০০ টাকার নিচে কোনো মাছই পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া মসলা ও অন্যান্য ডালের দামও বেড়েই চলেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, ময়দা ও ডালের দাম বাড়ার পরপরই এসব পণ্যের দাম বাড়াতে শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। তেল ও চিনির দাম বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে লিখিত আবেদনও করেন। এরপর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে দাম না বাড়ানোর শর্তে এসব পণ্যের ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয় সরকার। ব্যবসায়ীরাও সরকারকে কোনো পণ্যের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। এর পরপরই খোলা ভোজ্যতেলের পাইকারি পর্যায়ে দাম কমতে থাকে। কিন্তু বড় বিপণন কোম্পানিগুলো তাদের বোতলজাত সয়াবিনের দাম না কমানোয় খুচরা বাজারে কোনোটির দামই কমেনি। উল্টো ওইসব কোম্পানি দাম বাড়াতে থাকে।

গত বছরের শেষদিকে দুই দফায় চালের দাম বাড়ান মিলমালিকরা। বোরোর বাম্পার উৎপাদনের পরও মৌসুমের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় সরবরাহ সংকট দেখিয়ে কেজিতে ৩-৪ টাকা দাম বাড়ানো হয়। এরপর আবারও চালের দাম বাড়ালে মিলমালিকদের সঙ্গে বৈঠক বসে সরকার। তখন মিলাররা দাম আর না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিও দুই মাসের বেশি টেকেনি। চাহিদা বাড়ার পরও সরকার চিকন চালের উৎপাদন বাড়াচ্ছে নাÑ এমন তথ্যে এক জোট হয়ে ধানের দাম কেজিতে দেড় থেকে ২ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে ধানের মজুদদাররা। মিলাররাও চালের দাম কেজিতে ১ টাকা বাড়িয়েছেন। আর এসব চাল খুচরা বাজারে কেজিতে ৫-৬ টাকা বেড়ে গেছে।

গত সপ্তাহে রশিদের মিনিকেটের মিল পর্যায়ে দাম ছিল বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ২৩৫০ টাকা, যা আগের সপ্তাহ থেকে ৫০ টাকা বেশি। এক মাস আগেও এসব চালের বস্তা ছিল ২১৫০ টাকা। বিরি-২৮ চাল ৫০ টাকা বেড়ে ১৫৫০ টাকা, স্বর্ণা ও গুটির দাম ৫০ টাকা বেড়ে ১৪৫০ ও ১৩৫০ টাকা পাইকারিতে বিক্রি হয়। আর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মিনিকেট ৫৩-৫৪ টাকা ও বিরি-২৮ চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৩-৩৪ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়তদাররা কেজিপ্রতি চালের দাম ২ থেকে আড়াই টাকা বাড়িয়েছেন। আর আড়তদাররা দাম বাড়ার জন্য দুষছেন মিলারদের। অন্যদিকে মিলারদের দাবি, ধানের দাম কেজিতে ২ টাকা বেড়েছে। এখানে বড় একটি চক্র কাজ করছে। বাধ্য হয়ে তারা চালের দাম কেজিতে ১ টাকা বাড়িয়েছেন।

রশিদ অটোর মহাব্যবস্থাপক আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা কেজিপ্রতি চালের দাম বাড়িয়েছি ১ টাকা। অথচ সেই চাল খুচরা বাজারে ৪-৫ টাকা বাড়ছে। এখানে আমাদের কী করার আছে? সরকার কোনো কিছু হলেই মিলারদের ধরে। কিন্তু যারা ধানের দাম বাড়াল এবং ১ টাকার চাল খুচরায় ৫ টাকা বাড়াল তাদের নিয়ে কেউ কথা বলে না। ধানের বাজারে এখন বড় একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। এদের চিহ্নিত করতে পারলে চালের দাম কমবে। অন্যথায় এ মাসে আরও বাড়বে।’

ভোগ্যপণ্যের চড়া দামের কারণে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ক্রেতারা। এজন্য প্রশাসনের ব্যর্থতা ও বাজারচক্রের অব্যবস্থাপনাকে দুষছেন তারা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সোহেল রানা বলেন, ‘বেতন বাড়েনি কিন্তু বছরের শুরুতে বাসা ভাড়া থেকে শুরু করে সব ধরনের খরচ বেড়েছে। ভোগ্যপণ্যের দাম তো বাড়ছেই। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের প্রত্যেকে বলে আসছেন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। এজন্য দেখলাম বোরো মৌসুমে কৃষক দামও পেল না। তারপরও চালের দাম বাড়বে কেন?’

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দামবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ভোজ্যতেল ও চিনিসহ আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহারে অর্থ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে কথাও বলেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। অর্থমন্ত্রীও এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ব্যবসায়ীরা প্রতিশ্রুতি দিয়েও চাল, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানোয় হতাশ হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। মাত্র কয়েকটি কোম্পানির কাছে এ সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ থাকায় সরকার জোর দিয়েও কিছু বলতে পারছে না। তাই বিকল্প উপায় খুঁজছে সরকার। ইতিমধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে টিসিবি ও খাদ্য অধিদপ্তরকে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটিও কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছে। কোনোভাবেই যদি ব্যবসায়ী জোটকে নিয়ন্ত্রণে না আনা যায় তাহলে এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগাবে সরকার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা এবি আজিজুল ইসলাম বলেন, দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ে দুই কারণে। প্রথমত সরবরাহ সংকট ও দ্বিতীয়ত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। এখন চালের দাম যে বাড়ল এর কারণ কী সেটা সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত। আসলেই কি বাজারে চালের সংকট আছে? এমন প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। চিনিসহ অন্যান্য আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বিশ্ববাজারে বাড়লেও দেশের বাজারে সে অনুযায়ী বাড়ছে নাকি বেশি বেড়েছেÑ সেটা দেখার দায়িত্ব কিন্তু সরকারের। সরকারের প্রতিযোগিতা ও ভোক্তা আইন আছে। সরকার এ আইনগুলোর সঠিক প্রয়োগ করলে সমস্যা অনেকটাই লাঘব হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে। এজন্য অভ্যন্তরীণ বাজারেও বেড়েছে। কিন্তু ভোগ্যপণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে সেটা নিয়ে মন্ত্রণালয়ও চিন্তিত। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। আগেও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। আবারও তাদের সঙ্গে বসব। দেখি কী করা যায়। কোনোভাবেই ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে টিসিবির মাধ্যমেই আমরা বড় আকারে ট্রেডিং করব। ভোক্তা অধিকারের টিমও মাঠে কাজ করবে।’