সওজের জমি দখল করে আ.লীগ নেতার মার্কেট

খুলনা নগরীর ফুলবাড়ি গেটে ইজারা না নিয়েই সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) জমি দখল করে মার্কেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে এক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে। খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. ইউসুফ আলী খলিফা ‘বঙ্গবন্ধু চত্বর’ গড়তে ওই জমি দখলে নিলেও সেখানে বেশ কিছু দোকান নির্মাণ করে ভাড়া তুলছেন বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ভাষ্য। আওয়ামী লীগ নেতা ইউসুফ আলী সওজের ওই জমি ইজারা নিতে করা আবেদনপত্রে ‘জনস্বার্থে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণের কথা উল্লেখ করলেও বাস্তবে সেখানে এ ধরনের কোনো স্থাপনাই তৈরি করেননি।

এদিকে বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে সরকারি জমি দখলকারী এই আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বেশ কিছুদিন ধরে নিজ সংগঠনেরই বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা দাবি জানাচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগ নেতা ইউসুফ আলী খলিফার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না সওজ বা সংগঠন কেউই।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও এলাকার বাসিন্দারা জানান, নগরীর খানজাহান আলী থানার ফুলবাড়ি গেটের খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) সড়কে প্রায় দুই বিঘা জমি রয়েছে সওজের। বছর চারেক আগে আওয়ামী লীগ নেতা ইউসুফ আলী সওজের ওই জমির প্রায় ১৫ শতাংশ ‘বঙ্গবন্ধু চত্বর’ গড়ে তোলার নামে দখলে নেন। পরে সেখানে তিনি পর্যায়ক্রমে ৮টি দোকান নির্মাণ করেন। ওই দোকানগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যে ৫টি দোকান ভাড়া দিয়ে টাকা তুলছেন ইউসুফ আলী। আর একটি দোকান ‘বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন’-এর নামে ব্যবহার করছেন তিনি। বাকি দুটি দোকানের নির্মাণকাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ফুলবাড়ি স্ট্যান্ড থেকে পশ্চিমে কুয়েট সড়ক ধরে মাত্র ২৫ গজ এগোলেই উত্তরে তিন দিকে ইটের সীমানাপ্রাচীর আর সামনের দিকে লোহার পাত দিয়ে ঘেরা ‘বঙ্গবন্ধু চত্বর’-এর সাইনবোর্ড ঝুলছে। মূল ফটকের সামনে দাঁড়ানো বেশ কিছু ইজিবাইক ও রিকশা। ভেতরে ঢুকেই হাতের ডানপাশে রয়েছে এম হোসেন স্পোর্টস জোন এবং এস এ এফ ট্রেড লিংক নামে দুটি দোকান। আর হাতের বাম পাশে রয়েছে চটপটির একটি ভ্রাম্যমাণ দোকান ও কিছু চেয়ার। একটু সামনে এগিয়ে দেখা যায়, নাদিয়া ফ্যাশন, রুমানা বোর্ডিং ও চিত্র আর্ট নামে তিনটি দোকান এবং ‘বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন’-এর কার্যালয়। অন্যদিকে বাম পাশে রয়েছে নির্মাণাধীন দুটি দোকান।

সওজের জায়গায় গড়ে ওঠা দোকানের ভাড়া কাকে দেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে চিত্র আর্টের মালিক মনোরঞ্জন সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউসুফ সাহেবকে ৫০ হাজার টাকার মতো অগ্রিম দিয়ে এই দোকান নিয়েছি। তেমন আয় হয় না, তাই বলেকয়ে মাসে ২ হাজার টাকা ভাড়া দিই।’

রুমানা বোর্ডিংয়ের মালিক খোকন ভূঁইয়া বলেন, ‘দোকানভেদে ভাড়া আদায় করা হয়। বড় দোকান হলে এক রকম, আর ছোট দোকান হলে অন্য রকম। আমার দোকানটি ছোট বলে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা ভাড়া দিই।’

খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি বেগ লিয়াকত আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু চত্বরের নামে সরকারি জমি দখল করে মার্কেট করেছেন ইউসুফ। যে বঙ্গবন্ধুর নামে সারা বিশ্ব কাঁপে তাকে ব্যবহার করে তিনি ব্যবসায় নেমেছেন; যা অত্যন্ত অন্যায়। এখানে একটি সরকারি পুকুর ছিল তা তিনি ভরাট করেছেন। ভরাটের জন্য লাখ লাখ টাকা বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে নিয়েছেন। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আবদুল খালেক তার কাছে জানতে চেয়েছেন, কে এই কাজ করতে বলেছে। তিনি (ইউসুফ) তার উত্তর দিতে পারেননি।’

খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নগর বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক শেখ কামাল আহমেদ বলেন, ‘ইউসুফ ও আমিসহ অনেকে সওজ থেকে এই জায়গা ইজারা নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু সওজ আজও ওই জমি ইজারা দেয়নি। ইউসুফের বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের কোনো অনুমতি নেই। তিনি ইচ্ছামতো এটি করেছেন। এ নিয়ে আমরা বিভিন্ন সভায় কথা বলেছি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।’

আওয়ামী লীগ নেতা ইউসুফ আলীর দখল করা সওজের ১৫ শতাংশ জমির বর্তমান বাজারদর প্রতি শতাংশ ২৫-৩০ লাখ টাকা হিসাবে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বলেও জানান শেখ কামাল আহমেদ।  

খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও যোগীপোল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখ আনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু চত্বরে থাকবে খোলামেলা স্থান। এখানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভ থাকার কথা। থাকবে একটি লাইব্রেরি। দলের বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও জাতীয় দিনগুলোতে নানা রকম অনুষ্ঠান হবে এখানে। কিন্তু সভাপতি (ইউসুফ) ইচ্ছামতো মার্কেট নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে সেই টাকা আত্মসাৎ করছেন। প্রতিটি দোকান থেকে ১ থেকে দেড় লাখ পর্যন্ত অগ্রিম নিয়েছেন। এমনকি চটপটির দোকান থেকেও ৪০ হাজার টাকা নিয়েছেন। প্রতি মাসে এখান থেকে ২০ হাজার টাকার মতো আয় করেন তিনি। আমরা বিভিন্ন সভায় এ নিয়ে কথা বলেছি, কিন্তু তিনি কর্ণপাত করেন না।’

সওজের জমি দখল করে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউসুফ আলী খলিফা ক্ষুব্ধ হয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কি টাকায় কামড়ায় যে অনুমোদন না নিয়ে মার্কেট করব।’

তখন ইজারার কাগজ দেখতে চাইলে সওজ খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর করা একটি আবেদনপত্র দেখান ইউসুফ আলী। যে আবেদনপত্রে ‘জনস্বার্থে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভ’ করতে সওজের জায়গা ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছেন তিনি। তবে ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সওজ থেকে দেওয়া কোনো অনুমোদনপত্র দেখাতে পারেননি ইউসুফ আলী।

বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ নেতার সরকারি জায়গা দখলের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কেসিসির মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক গত মঙ্গলবার দুপুরে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলীয় লোকদের সরকারি জায়গা দখল করার কোনো সুযোগ নেই। আমি এখনই সওজের প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে উচ্ছদের ব্যবস্থা করছি।’

অন্যদিকে খুলনা সওজে সদ্য যোগদানকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনিসুজ্জামান মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কোনো জমি কাউকে ইজারা দিতে পারি না। এটি মন্ত্রণালয় থেকে নিয়ে আসতে হয়।’