বিভক্তির নতুন যুগে ব্রিটেন

ব্রেক্সিট কার্যকরের মাধ্যমে গত শুক্রবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে যুক্তরাজ্যের প্রায় অর্ধশতাব্দীর সম্পর্ক শেষ হলো। ১ হাজার ৩১৬ দিনের রাজনৈতিক ডামাডোল শেষে ব্রিটেন একাকী অনিশ্চিত পথে যাত্রা করল। সিএনএন বলছে, ব্রেক্সিট দুজন প্রধানমন্ত্রীর বিদায় ও দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক প্রশ্ন সামনে এনেছে। স্বাধীনতার জন্য স্কটল্যান্ডের তোড়জোড় তারা উপেক্ষা করতে পারছে না। উত্তর আয়ারল্যান্ডও ঐক্যবদ্ধ আইরিশের প্রত্যাশা করছে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম ব্রিটেনের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও বিশ্বে তাদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিল।

ব্রেক্সিট কার্যকরের ঘণ্টাখানেক পর জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ব্রিটেনে বিভক্তির কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘অনেকের কাছে মুহূর্তটি বিস্ময়কর! ব্রেক্সিট হবে তারা কখনো ভাবেননি। আবার অনেকে এটি কার্যকরে উদ্বিগ্ন ও হতাশ। আমি প্রত্যেকের অনুভূতি বুঝতে পেরেছি। সরকার জনগণের জন্য। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার কাজ হবে সবপক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে যাওয়া।’

খরচ করার মতো যথেষ্ট রাজনৈতিক সঞ্চয় জনসনের রয়েছে। গত বছর নির্বাচনে তার দলের ভূমিধস জয় বলে দেয়, ব্যক্তি ইমেজে তিনি যুক্তরাজ্যের পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান ফিরিয়ে আনবেন। সীমানার বাইরে ব্রিটেনের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়াবেন। নতুন যুগের পথচলায় ব্রিটেন কি ইউরোপীয় প্রতিবেশী ও তাদের বহুপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গিতে চলবে নাকি আটলান্টিক ও আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির বিপরীত ধারা তৈরি করবেÑ এর সবই অন্তর্বর্তী ১১ মাসের (৩১ ডিসেম্বর ২০২০) মধ্যে দৃশ্যমান হবে। ব্রেক্সিটের চূড়ান্ত মুহূর্ত মধ্যরাতে লন্ডন পার্লামেন্ট স্কয়ারের সামনে হাজারো মানুষ জড়ো হয়ে পতাকা হাতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। সমবেত জনতার উদ্দেশে ব্রেক্সিট পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজ ঘোষণা করেন, ‘আমরা পেরেছি।’

বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, ইইউর পতাকা ত্যাগের এ উদযাপন বৃহৎ অর্থে ভালো। কিন্তু এটি ব্রিটিশ সমাজে বিভক্তি এঁকে দিয়েছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে ৪৭ বছরের বন্ধনের বিচ্ছেদে অনেকের মনে ভয় ও শঙ্কা ভর করেছে। বিশেষ করে প্রায় ৩৬ লাখ ইইউ নাগরিক, যারা তাদের জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে ব্রিটেনের সঙ্গে জড়িয়েছেন, তাদের কাছে উদযাপনটি বড্ড বিষাদের। বৈশ্বিকভাবে একক পরিচয়ে দীর্ঘদিন চলা প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষকে ব্রেক্সিট আত্মোপলব্ধির সামনে দাঁড় করিয়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের পরিচালক মার্ক লিওনার্ড বলেন, ‘ব্রেক্সিট জনসনের সামনে বড় ধরনের কৌশলগত সুযোগ এনে দিয়েছে। দশকের পর দশক চলা দুই ভিতে দাঁড়ানো ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতি তিনি পুনর্গঠন করতে পারবেন। কারণ এতদিন ইইউর প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে ব্রিটেন যেমন ভূমিকা রেখেছে তেমনি তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোকে নিয়ে ট্রান্সআটলান্টিক অ্যালায়েন্সের অন্যতম অংশীদার।’

ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনকে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে নতুনভাবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়তে হবে। পাশাপাশি কূটনৈতিক সম্পর্কও জোরদার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তন, ইরান ও চীনের সঙ্গে নানা ইস্যুতে সম্পৃক্ত। ফলে জনসনকে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করে পা ফেলতে হবে। ইতিমধ্যে ইউরোপে চীনের আধিপত্যে তিনি ভাগ বসাতে কাজ শুরু করেছেন।

জনসন ব্রেক্সিটকে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের’ নতুন অধ্যায় আখ্যায়িত করেছেন। জাতির উদ্দেশে টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন, ‘আজ রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্পর্কের শেষ নয়, নতুন শুরু হলো।’ আর জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল বলেন, ‘ব্রিটেনের বিচ্ছেদ ইউরোপে বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করল।’