ভেতরে-বাইরে শুধুই আওয়ামী লীগ

ঢাকা সিটি নির্বাচনে বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্রেই বিএনপি বা অন্যান্য দলের প্রার্থীদের এজেন্ট বা কর্মীদের উপস্থিতি না থাকলেও আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের অভাব ছিল না। কেন্দ্রের বাইরে জটলা করা বা ঘোরাফেরার পাশাপাশি অনেক কেন্দ্রের ভোটকক্ষেও ছিল তাদের সরব উপস্থিতি। কার্যত কেন্দ্রগুলোর ভেতরে-

বাইরে সব জায়গা ছিল ক্ষমতাসীন দলটির নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে। গতকাল শনিবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলাকালে বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে এসব চিত্র। 

গতকাল দুই সিটির বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রের আশপাশে ও মহল্লার অলিগলিতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের অবস্থান। ভোটার সহায়তা কেন্দ্র থেকে শুরু করে ভোটকেন্দ্রের গেটেও সরব ছিল তারা। অনেক কেন্দ্রে সহায়তা বুথ থেকে সিøপ দেওয়ার পরে ভোটারদের ভোটকক্ষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে দেখা গেছে তাদের। 

বিপরীতে অল্প কয়েকটি কেন্দ্রের বাইরে বিএনপি প্রার্থীর নামে ভোটার সহায়তা বুথ দেখা গেলেও তার বেশিরভাগই কার্যত খালি পড়ে ছিল। 

গতকাল সকালে ডিএসসিসির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে ভোটার স্লিপ বিতরণ করতে দেখা গেছে আওয়ামী লীগদলীয় প্রার্থীর নেতাকর্মীদের। সেখানে ছিল দলটির কর্মী-সমর্থকদের জটলাও। তবে বিএনপি প্রার্থীর কোনো সহায়তা বুথ চোখে পড়েনি। কেন্দ্রের ভেতরেও ছিল না দলটির প্রার্থীদের কোনো এজেন্ট।

একই চিত্র দেখা গেছে ডিএসসিসির ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে। ওই ওয়ার্ডের কেন্দ্রগুলোতে বিএনপির সহায়তা বুথ থাকলেও কোনো কর্মী-সমর্থকের দেখা মেলেনি। কেন্দ্রের ভেতরে ছিলেন না দলটির কোনো এজেন্টও।

দুপুর ১২টার দিকে ওই ওয়ার্ড বিএনপির এক সিনিয়র সহ-সভাপতি পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, হামলা মামলার ভয়ে অনেকে সরাসরি নির্বাচনী বুথে বসেনি। তবে সবাই গোপনে কাজ করছে।

পুরান ঢাকার সুরিটোলা কেন্দ্রে কথা হয় আওয়ামী লীগের কয়েক নেতাকর্মীর সঙ্গে। তারা জানান, সকাল থেকে ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাবে চলছে। কেন্দ্রের বাইরে বা ভেতরে কেউ যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না করতে পারে তার জন্য রাত থেকেই পাহারা দিচ্ছেন।

সুরিটোলার মতো ইসলামপুর বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বাজার, আহমদ বাওয়ানী এলাকায় কেন্দ্রের সামনেও ছিল আওয়ামী লীগের সরব অবস্থান।

নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার কথা জানান ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিল প্রার্থী জাকির হোসেন রনি। তিনি বলেন, সকাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ ও ভোটার উপস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের চারপাশ ঘিরে ছিল নৌকা প্রতীক সমর্থিত নেতাকর্মীরা। কেন্দ্রের পূর্বপাশে আনারকলি মার্কেটের খোলা জায়গায় অবস্থান নিয়েছিলেন তারা। তাদের গলায় ঝুলছিল দলীয় মেয়রপ্রার্থী ফজলে নূর তাপসের নৌকা প্রতীকের কার্ড। কেন্দ্রের তিন পাশে এ সময় ধানের শীষ বা অন্য কোনো প্রতীকের প্রার্থীর কোনো লোকজনকে দেখা যায়নি। এ সময় এক সাংবাদিক পোস্টার ও ভিড়ের ছবি তুলতে গেলে তাকে ঘিরে ধরেন নৌকা প্রতীকের লোকজন। তারা পরিচয় জানতে চান তার। প্রথমে তিনি ‘ধানের শীষের’ লোক বলাতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা। পরে অবশ্য আসল পরিচয় প্রকাশ করলে তারা সরে পড়েন।

একইভাবে নৌকা প্রতীকের কর্মী-সমর্থকদের ভিড় দেখা গেছে বাংলামোটর খোদেজা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই কেন্দ্রের ভেতর ও বাইরে। এ সময় দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদক কেন্দ্রের দোতলায় গেলে সেখানে নৌকা প্রতীকের কার্ড ঝোলানো লোকজনকে বুথে দেখতে পান। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে দায়িত্বশীল কেউই কথা বলতে রাজি হননি। কর্তব্যরত এক পুলিশ একজনকে ‘প্রিসাইডিং অফিসার’ বলে দেখিয়ে দিলেও ওই ব্যক্তি পরে আরেকজনকে প্রিসাইডিং অফিসার বলে পরিচয় করিয়ে দেন। সুলতান মাহমুদ নামে ওই লোক নিজেকে প্রিসাইডিং অফিসার দাবি করে বলেন, ভোট সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে। তবে ভোটার উপস্থিতি কম।  এ সময় নৌকা প্রতীকের কিছু কর্মী এসে প্রতিবেদককে ঘিরে ধরেন। পরে তারা পত্রিকার পরিচয় জেনে দোতলায় না যেতে অনুরোধ করেন। সে সময় সেখানে ধানের শীষ বা অন্য কোনো প্রতীকের লোকজনকে পাওয়া যায়নি।

ঢাকা উত্তর সিটির উত্তরা হাইস্কুল, রাজউক কলেজ, মাইলস্টোন কলেজ, একেএম রহমতুল্লাহ কলেজের সামনে গিয়ে বিএনপির কোনো বুথ দেখা যায়নি। কেন্দ্রের ভেতরেও ছিল না ধানের শীষের এজেন্ট। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর বলেন, ভোর থেকেই আওয়ামী লীগের লোকজন কেন্দ্রের সামনে ও আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ নেয়। বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মোড়ে তারা অবস্থান নিয়ে আমাদের কর্মীদের কেন্দ্রে আসতে বাধা দেয়। তারা আমাদের এজেন্টদেরও মারধর করে পথ থেকেই ফিরিয়ে দেয়। আমরা প্রশাসনের সহায়তা চাইলেও তারা আমাদের কোনো প্রকার সহায়তা করেনি।

তিনি বলেন, এখন এজেন্ট দিতে গেলে বা কেন্দ্রের সামনে ক্যাম্প স্থাপন করতে হলে একমাত্র উপায় ছিল মারামারি করা। কিন্তু এটাতো আমাদের কাজ না। এটা আওয়ামী লীগের কাজ। তারা আমাদের অনেক এজেন্টকে কেন্দ্র থেকেও মারধর করে ফিরিয়ে দিয়েছে।