কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে পুলিশ হেফাজতে মোজাফফর হোসেন (৩০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। পেশায় অটোরিকশাচালক মোজাফফর হেফাজতে থাকা অবস্থায় পুলিশের নির্যাতনে মারা গেছেন বলে স্বজনদের দাবি।
তবে পুলিশের ভাষ্য, তিনি শ্বাসকষ্ট ও যক্ষ্মার রোগী ছিলেন। গত রবিবার সন্ধ্যায় ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নের ঝালবাজার এলাকা থেকে মাদকসহ আটকের পর থানায় নেওয়া হলে রাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন মোজাফফর। পরে প্রথমে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সেখান থেকে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে ভোরে মৃত্যু হয় তার।
মোজাফফর শিলখুড়ি ইউনিয়নের উত্তরছাট গোপালপুর গ্রামের আবদুল ওহাবের ছেলে। তার মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে ৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে পুলিশ।
ভূরুঙ্গামারী থানা পুলিশ এবং স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত রবিবার সন্ধ্যায় শিলখুড়ি ইউনিয়নের ঝালবাজার থেকে অটোরিকশাচালক মোজাফফর হোসেনকে আটক করা হয়। তার অটোরিকশায় মাদক কারবারি এক যাত্রী ছিল। পুলিশ ধাওয়া করলে ওই মাদক কারবারি অটোরিকশা থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ ওই মাদক কারবারির গায়ের চাদর, সাড়ে তিন কেজি গাঁজা, অটোরিকশাসহ মোজাফফরকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে অসুস্থ হয়ে সোমবার ভোরের দিকে তার মৃত্যু হয়।
তবে মোজাফফরের বাবা আবদুল ওহাবের ভাষ্য, পুলিশ তার ছেলেকে নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, মোজাফফরের অটোরিকশায় এক মাদক কারবারি যাত্রী হিসেবে ছিল। যেটা তিনি জানতেন না। পুলিশ ধাওয়া করলে ওই মাদক কারবারি অটোরিকশা থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ অটোরিকশাসহ মোজাফফরকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এরপর নির্যাতনের ফলে থানা হেফাজতেই তার মৃত্যু হয়।
মোজাফফরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গতকাল দুপুর ২টার দিকে ঢলডাঙ্গা এলাকায় কয়েক শ অটোরিকশাচালক জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। সেখানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে মোজাফফরের বড় ভাই আবদুর রউফ বলেন, ‘পুলিশের অবহেলায় মোজাফফরকে জীবন দিতে হলো। মোজাফফর শ্বাসকষ্টসহ যক্ষ্মায় আক্রান্ত থাকলেও পুলিশ তা আমলে নেয়নি।’
তবে মোজাফফরকে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি ইমতিয়াজ কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মোজাফফরকে সাড়ে তিন কেজি গাঁজাসহ আটক করা হয়। সে অ্যাজমা ও টিবি রোগী ছিল। আটকের পর শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তাকে রাত ১২টার দিকে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে কুড়িগ্রাম হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।’
এদিকে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের ভর্তি রেজিস্টারে মোজাফফরের ভর্তি সংক্রান্ত ছকের লেখায় কাটাকাটি ও ঘষামাজা দেখা গেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঘটনার সময় জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ মোজাফফর নামে ওই রোগীকে নিয়ে আসে। প্রথমে রোগী দেখে মনে করেছিলাম, মারা গেছে। তাই ডেথ কথাটা রেজিস্টারে লিখেছিলাম। পরে যখন দেখি জীবিত, তখন ডেথ কথা কেটে দিই। এ জন্য রেজিস্টারে কাটাকাটি করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিই।’
কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা রেদওয়ান ফেরদৌস সজীব বলেন, ‘মোজাফফর নামে ওই রোগীকে মৃত অবস্থায় রাত সাড়ে ৪টায় হাসপাতালে নিয়ে আসে ভূরুঙ্গামারী থানা পুলিশ।’
মোজাফফরের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি আছে কি না তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে জানিয়ে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেনহাজুল আলম বলেন, ‘থানায় থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়ে মোজাফফর। তার শ্বাসকষ্ট ও যক্ষ্মা রোগ ছিল। ভূরুঙ্গামারী হাসপাতালে অবস্থার অবনতি হলে তাকে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন হয়েছে।’
অন্যদিকে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাটি আমি জানতে পেরেছি। এ ঘটনায় পুলিশের কোনো দায়বদ্ধতা আছে কি না, তা তদন্তে ৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।’