ইসলামি সভ্যতা মানুষের সুন্দর জীবনযাপন নিশ্চিত করেছে। বর্ণবাদ, শ্রেণিবৈষম্য, ধনী-গরিব পার্থক্যের কলঙ্কিত অধ্যায়কে চিরতরে নিষিদ্ধ করেছে। সাম্য, মানবহিতৈষীমূলক ও কল্যাণমুখর কাজের বহুবিধ উপাদান তৈরি করেছে। আর মুসলিম মনীষীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেছেন আল্লাহর দেওয়া বিধান ও নবী রাসুলদের আদর্শ থেকে।
মুসলিম মনীষীরা মানুষের জীবন সুন্দর ও উপযোগী আবাসস্থল নির্মাণে যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। সভ্যতার আলোকবাতি জ্বালিয়েছেন প্রতিটি জনপদে। এ আলোয় আলোকিত হয়েছে মানুষের মন ও জনজীবন। মানুষের স্বাস্থ্য ও মেধা বিকাশে তারা পরিকল্পিত নগর গড়েছেন। মানুষের বসবাস উপযোগী করে শহরকে ঢেলে সাজিয়েছেন। মানুষের ভবিষ্যৎ ও পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে নির্ধারণ করেছেন শহরের অবকাঠামো। শহর তৈরির প্রারম্ভিক নকশায় এঁকেছেন স্থাপত্যশৈলী, বাসাবাড়ির পরিমাণ, লাইব্রেরি, বইয়ের দোকান, সরকারি শৌচাগার, স্নানাগার, বাগান, মনোরম ঝরনাধারা, তাঁবু ও সরাইখানার চিত্র। এসব ছাড়া তারা নগর-পরিকল্পনা করতেন না। সুন্দর নগর-পরিকল্পনাই ছিল তাদের প্রথম ও প্রধান কাজ।
মুসলিম মনীষীদের গড়া নগর-শহর, স্থাপত্যশিল্পের প্রতি দৃষ্টি দিলে মানুষ সৌন্দর্যে অভিভূত হয়। তাদের পরিকল্পনা-রূপ দেখে অবাক আশ্চর্য না হয়ে পারে না। তাদের সেই স্থাপত্যগুলো আজকের পৃথিবীর বিস্ময়।
মুসলমানরা পৃথিবীর শুরু থেকেই শোভনীয় অবকাঠামো নির্মাণ আর স্থাপত্যকলায় অভূতপূর্ব অবদান রেখে আসছে। প্রথম মানুষ ও আদি পিতা আদম (আ.)-এর হাত ধরে স্থাপত্যশিল্পের বিকাশ ঘটে। আদমের সৃষ্টিগুলো ছিল বৃক্ষ ও লতাপাতায় নির্মিত। কাবাঘরের আবিষ্কার তার মাধ্যমেই ঘটে। পৃথিবীতে আগত আল্লাহপ্রেমী প্রত্যেক নবী-রাসুল সময়ের চাহিদানুপাতে সৃজনশীল সৃষ্টি করেছেন। মানুষের প্রয়োজনে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন।
মুসলমানদের জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.) ও তার ছেলে ইসমাইল (আ.) মিলে আবার তৈরি করেছেন কাবাঘর। আজকের কাবা ইবরাহিম (আ.)-এর নকশা অনুযায়ী নির্মিত। মুসলমানদের প্রথম কিবলা মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন আল্লাহর নবী সুলায়মান (আ.); যা পৃথিবীতে আজও বিস্ময়কর।
ইসলাম আগমনের আগে আরবে কোনো স্থাপত্য নিদর্শন ছিল না। উট ও ভেড়ার লোম দিয়ে তৈরি তাঁবুতে তারা বসবাস করত। ইসলামের আবির্ভাবের পর আরব স্থাপত্যে নতুন যুগের সূচনা হয়। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় প্রথম তিনি মসজিদে কুবা নির্মাণ করেন। কিছুদিন পর নির্মাণ করেন মসজিদে নববি। তিনি ছিলেন পবিত্র ও ধ্রুপদি এক সভ্যতার জনক। মানুষের কল্যাণের প্রতিটি পদে পদে তিনি আলোর মশাল জ্বালিয়েছেন। এঁকেছেন এক নতুন পৃথিবীর মানচিত্র।
প্রতিদিন মুসলমানদের আওতাধীন অঞ্চল বাড়তে থাকে। তারা সেসব অঞ্চল বিভিন্ন পদ্ধতিতে সাজাতে থাকে। উমাইয়া শাসনামলে স্থাপত্যশিল্পে উন্নয়ন হয়। আব্বাসীয় যুগ ছিল শিল্পে সমৃদ্ধির যুগ। এ যুগে স্থাপত্যকলার রূপ-শ্রী বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
খলিফা আল-মনসুর ৭৬২ সালে ঐতিহাসিক বাগদাদনগর প্রতিষ্ঠা করেন। নগরটি আবহাওয়া, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ও সামরিক দিক দিয়ে অনুকূল পরিবেশের চিন্তা করে নির্মাণ করেছিলেন। খলিফার বাসভবন, মসজিদ, আবাসিক এলাকা, বিদ্যালয়, হাট-বাজার, পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট সমন্বয়ে এ নগর গঠিত হয়। নগরের স্থাপত্য নিদর্শন অনন্য ও ব্যতিক্রমধর্মী ছিল।
তৃতীয় আবদুর রহমান ক্ষমতায় আসেন ৯৬১-৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে। কর্ডোভা শহরের নির্মাণ তার হাত ধরে পূর্ণতা লাভ করে। তার সময়কার কর্ডোভা শহরের পরিধি ছিল সাড়ে সাত মাইল এবং প্রশস্ততা দুই মাইল; মোট পাঁচ অংশে বিভক্ত। মধ্যস্থলে ছিল প্রাচীর বেষ্টিত দুটি প্রাসাদ ও ২১টি শহরতলি। ঐতিহাসিক শাকুদ্দীর তথ্য মতে, কর্ডোভা শহর, শহরতলি এবং মদিনাতুজ জাহারার সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ছিল দশ মাইল। গৌরবোজ্জ্বল সেসব দিনে এখানে পাঁচ লাখ লোকের বসবাস ছিল। বিভিন্ন ধরনের গৃহের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার। এ ছাড়া তিন হাজার মসজিদ, ৩০০ সাধারণ গোসলখানা, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, অন্যান্য ইমারতসহ প্রায় ৬০ হাজার ইমারত ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। রাতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নির্মিত আলোকসজ্জায় অধিবাসীরা দশ মাইল পথ অতিক্রম করতে পারত।
১২৩৮ সালে মুহাম্মদ ইবনে নাসর গ্রানাডা জয় করেন। তিনি গ্রানাডা শহরের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের আস-সাবিকা পাহাড়ের ওপরে তার আবাসন ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে আল-হামরা প্রাসাদ নির্মাণ করেন। ১৯৮৪ সালে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান আল-হামরাকে মানবতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।
মুসলিম সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলমানরা শাসন করা প্রতিটি নগরে ঐশ^র্যময় স্থাপত্যকলা নির্মাণ করেন। প্রতিটি সাম্রাজ্যে নির্মাণ হয় স্থাপত্যশিল্পের ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়। ১৬৩১ সালে সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত তাজমহল আজও পৃথিবীর ইতিহাসে অবাক বিস্ময়। তাদের প্রতিটি স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন ছিল ধনুক, ধনুকাকৃতির ছাদ, গম্বুজ, প্যাঁচানো টাওয়ার বা মিনার। স্পেনের কর্ডোভা মসজিদের অনন্য স্থাপত্যশিল্পের ধনুক, ধনুকাকৃতির ছাদ, বায়তুল মুকাদ্দাস ও মদিনার মসজিদের গম্বুজ, তাজমহলের প্রধান গম্বুজ, বাংলাদেশের ষাট গম্বুজ মসজিদের নির্মাণশৈলী ইতিহাসের ব্যতিক্রমী নজির।