শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা থামছেই না

শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা চলছেই। কিছুতেই কমছে না শিশু ধর্ষণ-বলাৎকার, যৌন হয়রানি, নির্যাতন ও হত্যা। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে সন্তানকে হত্যা, দেনা শোধ না করতে পেরে কন্যাকে ধর্ষকের হাতে তুলে দেওয়া ও আড়াই বছরের শিশুকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। মানবাধিকার ও আইনি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৭০০ শিশু নিষ্ঠুরতা ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৬ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর সংখ্যা ১৬৩, ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু ৩২৮ ও ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৩৪৫ শিশু রয়েছে। আর গত বছর হত্যাসহ অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হয়েছে মোট ৪৮৮ শিশু। আসকের হিসাবে, গত বছর হত্যা করা হয়েছে ২৮৯ শিশুকে; এর মধ্যে ৯৬ জন শিশুর বয়স ৬ বছরের নিচে। গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১১১ শিশু।

এদিকে শিশু অধিকার ফোরামের হিসাবে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০০৫ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০৮ শিশু। আর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৭ শিশুকে। সংগঠনটির হিসাবে গত বছরে হত্যার শিকার হয়েছে ৪৪৮ শিশু।

একই বছরে ৯৮৬ শিশু ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে আসক। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৮ শিশুকে। এর মধ্যে ৮ জনের বয়স ছয় বছরের নিচে। সংগঠনটির হিসাবে ধর্ষণ, যৌন হয়রানির পর লোকলজ্জায় আত্মহত্যা করেছে ২০ শিশু। অপহরণ ও নিখোঁজের পর হত্যা করা হয়েছে ২৩ শিশুকে। নিখোঁজের পর ১৩ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ১০ জন গৃহকর্মীসহ এক বছরে ৫৭ শিশুর রহস্যজনক মৃত্যুর পাশাপাশি ৬০ শিশুর লাশ পাওয়া গেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়, যাদের বেশিরভাগই হত্যার শিকার বলে ধারণা করা হয়। গত বছর এসিড ছুড়ে ঝলসে দেওয়া হয়েছে ১১ শিশুকে। আসকের হিসাবে ৩৭ ছেলে শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। বলাৎকারের পর মৃত্যু ও হত্যার শিকার হয়েছে ৭ ছেলে শিশু। গত বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২১৬ শিশু। নতুন বছরের শুরু থেকে এসব পরিসংখ্যানের সঙ্গে নতুন আরও ঘটনা যুক্ত হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন নেতারা বলছেন, বিগত এক বছরে শিশুর প্রতি সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতার যে চিত্র তা উদ্বেগজনক। ঘটনার বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, শিশুর প্রতি মানবিক আচরণের ঘাটতি, শিশুকে নির্যাতনের মাধ্যমে বড়দের কর্র্তৃত্ব জাহিরের প্রবণতা, সামাজিক ও মূল্যবোধের অবক্ষয়, প্রযুক্তির

সহজলভ্যতা ও অপব্যবহার, শিশুর যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত না থাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবার ও অভিভাবকদের উদাসীনতায় এ ধরনের ঘটনা বেড়েই চলেছে।

ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার পশ্চিম তারাবুনিয়া গ্রামে গত ২ ফেব্রুয়ারি জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আপন ভাইবোনদের ফাঁসাতে নিজের দুই মাস বয়সী জান্নাতি আক্তারকে ঘরের খাটের পায়া ও দরজার চৌকাঠে আছড়ে হত্যা করে বাবা কালাম সিকদার। গত বছর ৫ জানুয়ারি বিকেলে রাজধানীর গে-ারিয়ার দীননাথ সেন রোডের টিনশেড বস্তির পাশের এলাকায় একটি বাড়িতে প্রতিবেশীর আড়াই বছরের শিশু কন্যা আয়েশা মনিকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে তাকে তিনতলার বারান্দা থেকে ফেলে হত্যা করে নাহিদ (৪৫) নামে এক ব্যক্তি। তদন্ত শেষে তার নামে গত ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পিবিআই। গত বছর ১৩ অক্টোবর সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে পাঁচ বছরের শিশু তুহিনকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে গাছে লাশ ঝুলিয়ে রাখে তার বাবা বাছির ও চাচা নাছির। আদালতে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকায় দিনের পর দিন এক মুরগি ব্যবসায়ীর দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয় ১৩ বছরের শিশু। গত ১১ জানুয়ারি সর্বশেষ ধর্ষণের শিকার হয় শিশুটি। জানা যায়, দেনার টাকা শোধ করতে না পেরে আবুল হোসেন নামে ওই ব্যবসায়ীর হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দিত ওই শিশুর বাবা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট এলিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে কাজ করে এবং গণমাধ্যমের কল্যাণে শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতার যে পরিসংখ্যান পাচ্ছি, তাতে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। মনে হচ্ছে, তলানির শেষদিকে চলে যাচ্ছি আমরা। একটি ভয়াবহ ও বিপর্যস্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিজের কন্যাকেও কেউ ধর্ষকের হাতে তুলে দিচ্ছে, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের শিশু সন্তানকে হত্যা করা হচ্ছে। মানুষের মূল্যবোধ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে! অথচ শিশুদের প্রতি সবচেয়ে নমনীয় থাকার কথা। এ অবস্থার উত্তরণ না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।’ তিনি বলেন, ‘এ ধরনের প্রবণতা রোধ করতে হলে বিচারহীনতা থেকে বেরোতে হবে, সামাজিক ও ব্যক্তি মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করতে হবে। পাশাপাশি শিশুর নিরাপত্তাসহ তাদের প্রতি নমনীয় হতে হবে। মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে রাষ্ট্রকেই।’

শিশু অধিকারকর্মী ইমরানুল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশুরা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি। তাদের প্রতি ভালোবাসা কিংবা নিষ্ঠুরতাই আসলে প্রমাণ করে একটি সমাজ কোথায় যাচ্ছে। এখন যে পরিস্থিতি তাতে রাষ্ট্রকেই শিশুর নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করতে হবে সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি মানুষের মূল্যবোধ বিকাশ করতে হবে। প্রতিটি শিশুর অভিভাবককেও সচেতন হতে হবে।’

অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপরাধীদের প্রচলিত মনোভাব হলো শিশুর প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নেই। যে কারণে তার প্রতি আমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করা যায়।’ তিনি বলেন, ‘শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতার যে চিত্র তা শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো যাবে না। একটি শিশুকে রাষ্ট্র বা সমাজ কতটুকু সামাজিক, আর্থিক ও মানসিক প্রণোদনা দিচ্ছে, ঘটনার বিচার হচ্ছে কি না সে প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এখন যে পরিস্থিতি চলছে তা যদি সহনীয় মনোভাবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে সামনে সামাজিক বিপর্যয় রোধ করা কঠিন হবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষকে শিশুর প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।’২২