পাঁচ শতাধিক পরিবারের মানবেতর জীবন

রাজধানী বনানীর টিঅ্যান্ডটি কলোনির গোডাউন ও বাইদা (বেদে) বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০০ পরিবার গত শনিবার থেকে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। আগুনে পোড়া ঘরের স্থান পরিষ্কার করে পলিথিন টানিয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে বাস করছে তারা। বস্তির কয়েকশ শিক্ষার্থীর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। নতুন করে ঘর তোলার বিষয়ে সিটি করপোরেশন, ইউএনডিপি, ব্র্যাক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। তবে ঘর তোলার প্রতিবন্ধকতা রয়েছে উল্লেখ করে তারা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে সাড়ে চারশই ভাড়া থাকে। বাকি  পরিবার সরকারি এ জায়গায় ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছিল। প্রতি মাসে অনেকেই লাখ টাকা ভাড়া তুলেছে। সে ক্ষেত্রে নতুন ঘর তোলা হলে ভাড়াটিয়াদের দেওয়া হবে। এদিকে বস্তির ঘরমালিকরা বলছেন, তারা প্রতিটি ঘর ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় কিনেছেন। এখন যদি সেই ঘর না পান তাহলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হবে।

গত শুক্রবার গভীর রাতে গোডাউন ও বাইদা (বেদে) বস্তিতে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ২২টি ইউনিট সাড়ে তিন ঘণ্টার চেষ্টায় শনিবার সকাল ৭টায় আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। আগুনে পাঁচ শতাধিক ঘর পুড়ে যায়। গত মঙ্গল ও গতকাল বুধবার সরেজমিন দেখা গেছে, দুই বস্তির বাসিন্দারা পোড়া ঘরের স্থান পরিষ্কার করে পলিথিন টানিয়ে বসবাস করছেন। তাদের জন্য বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থাও করেছে স্থানীয় প্রশাসন। তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন এনজিওকর্মীরা। তবে ক্ষতিগ্রস্তরা চান দ্রুত তাদের ঘর তুলে দেওয়া হোক।

বাইদা বস্তির বাসিন্দা মো. মোহরম আলীকে দেখা যায় তিন সন্তানকে নিয়ে পলিথিন টানিয়ে বসে আছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাইভেট কার চালান তিনি। আগুনে ঘর পোড়ার পর থেকে আর সেখানে যেতে পারেননি। গত মাসের বেতনও পাননি। ১০০ টাকা দিয়ে একটি পলিথিন কিনে পোড়া ঘরের স্থানে টানিয়েছেন। সেখানে স্ত্রী, তিন সন্তান সামিয়া (৯), সুমাইয়া (৪) ও সাইমনকে (২) নিয়ে গত শনিবার থেকেই বাস করছেন। সামিয়া বনানী মডেল স্কুলের পঞ্চম শ্রেণি আর সুমাইয়া ব্র্যাকের কেজি ওয়ানের শিক্ষার্থী। আগুনে বই-খাতা ও স্কুলপোশাক পুড়ে যাওয়ায় তাদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন মানুষের সহায়তার খাবার খেয়ে দিন পার করছেন বলে জানান তিনি। এখন পর্যন্ত ৭ হাজার টাকা, ৩০ কেজি চাল ও একটি কম্বল সহায়তা পেয়েছেন। তিনি আরও জানান, তার নিজের দুটি ঘর ছিল। ২০০৯ সালে ৫০ হাজার টাকা দরে ঘর দুটি কিনেছিলেন। একটিতে নিজে থাকতেন, অন্যটি ভাড়া দিয়েছিলেন।

মো. জাহাঙ্গীর নামে আরেক বাসিন্দা জানান, শনিবার থেকে পরিবার নিয়ে তাঁবু টানিয়ে আছেন। সহায়তার খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। গোডাউন বস্তির বাসিন্দা কাউছার মিয়া জানান, পলিথিন টানিয়ে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন। ২৫০০ টাকা ভাড়া দিয়ে থাকতেন একটি ঘরে। মহল্লায় মহল্লায় মাছ বিক্রি করেন তিনি। আগুনে ঘরের সব আসবাবপত্রসহ ৫০ হাজার টাকা পুড়ে গেছে তার। খাদিজা বেগম নামে আরেক বাসিন্দা জানান, চার মাসের বাচ্চা মাহিরকে নিয়ে পাঁচ দিন ধরে তাঁবু টানিয়ে আছেন। ছেলের ঠা-া লেগে গেছে। ঘরের মালিক কবে নতুন করে ঘর তুলে দেবে সেই আশায় আছেন তিনি।

ঢাকা উত্তর সিটির ১৯ ও ২০ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় অবস্থিত বনানীর দুই বস্তিবাসীর জন্য স্থানীয় নেতারা ঘর তোলার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মফিজুর রহমান গতকাল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের হিসাবে আগুনে প্রায় ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের কারও কাছে ১০ হাজার, কারও কাছে ৫ হাজার আবার কারও কাছে ৫০০ নগদ টাকা ছিল। তারা নিঃস্ব হয়ে গেছে। আমরা এর আগে মেয়র আনিসুল হক থাকা অবস্থায় কড়াইল বস্তিতে আগুনের পর ইউএনডিপি ও ব্র্যাকের সাহায্য নিয়ে ঘর-দরজা করে ক্ষতিগ্রস্তদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করেছিলাম। এখনো আমরা সেই পরিকল্পনাতেই আছি। ইউএনডিপি এবং ব্র্যাকের সঙ্গে আজ (গতকাল বুধবার) প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। সেখানে মেয়র আতিকুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। ঘর তোলার বিষয়ে আমরা তাদের সহায়তা চেয়েছি। তবে তারা শর্ত দিয়েছে নতুন করে ঘর তোলা হলে সেখানে কোনো ভাড়াটিয়া থাকবে না। এখন যারা ভাড়া থাকে তারাই ওই ঘরের মালিক হবে।’

তিনি বলেন, ‘ঘর তুলে দেওয়া, আসলে ইট ইজ ভেরি ডিফিকাল্ট (খুবই কঠিন)। আমাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি জায়গাতে গড়ে ওঠা এই বস্তির ঘর যারা ব্যবহার করেন তারা ভাড়াটিয়া। এখানে জমিদারি প্রথা চালু রয়েছে। একজনের ২০টি ঘরও আছে। সে মাসে এক লাখ টাকা ভাড়া তুলছে। অথচ এখন অপেক্ষায় আছে আমরা ঘর করে দেব আর তারা ভাড়া উঠিয়ে খাবে। আমরা এটা এখন করব না।’

মফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘এখানকার ৪৫০ পরিবারই ভাড়া থাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহায্য নিয়ে যদি আমাদের ঘর করতে হয়, তাহলে যারা সত্যিকার গরিব অসহায় ভাড়াটিয়া তাদের দেওয়া হবে। সরকারি জায়গায় এখানে ভাড়াটিয়ারাই ঘরের মালিক হবে, তারা আর ভাড়াটিয়া থাকবে না। সুবিধাভোগীদের ঘর দেওয়া হবে না। গরিব আশ্রয়হীন, বস্ত্রহীনরা এখানে থাকে। এদের অনেকেই সারা দিন গুলশান-বনানীতে ভিক্ষা করে রাতে বস্তিতে এসে ঘুমায়। এর জন্য তাদের ভাড়া দিতে হয়। এটা তো ঠিক না।’