নিজ পায়ে কুড়াল ইইউর

প্রায় চার বছরের টানাপোড়েন শেষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে গত ৩১ জানুয়ারি আলাদা (ব্রেক্সিট) হয়েছে যুক্তরাজ্য। ব্রেক্সিট ইইউকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এ অঞ্চলের সংস্কার, সক্রিয় ও পুনর্মিলনের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ আলোচনা শেষে সংস্থাটি গঠন করা হয়। কিন্তু কতিপয় নেতা (ইউরোস্কেপটিক) সমালোচনার মাধ্যমে জনপ্রিয় হলেও, ব্রেক্সিটের পর তারা ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছেন। সিএনএন বলছে, ইউরোস্কেপটিকরা ভেতর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষতি করছেন। তাদের শুরুটা যেমন তেমন দৃশ্যমান হয়নি। ব্রেক্সিটের পর তারা থেমে গেছেন এমনটিও নয়। ইইউ সত্যিকার অর্থে ডানপন্থি এসব নেতার পেছনে মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে নিজের ক্ষতি ডেকে আনছে। আর ইউনিয়নের নিজস্ব আমলাতন্ত্র ইইউবিরোধী কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইউরোস্কেপটিকদের জন্য উত্তম পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে।

ব্রেক্সিট পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজ ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের সদস্যপদ চূড়ান্তভাবে প্রত্যাহারের দিন বলেন, পরিতাপের বিষয় হলো ইইউ পার্লামেন্টের আইনজীবীদের ছাড়া কখনো ব্রেক্সিট কার্যকর সম্ভব ছিল না। এটা স্বীকার করতে হবে, ব্রেক্সিট কার্যকরের পক্ষে রাজনৈতিক আন্দোলন জোরদারে যত তৎপরতা দরকার ছিল, সেজন্য ইইউ পার্লামেন্টকে আমরা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পেরেছি। কীভাবে পার্লামেন্টকে ব্যবহার করেছেন ফারাজ তা না বললেও এটা স্পষ্ট, নির্বাচনের আগে ডানপন্থিদের টোপ গেলানো হয়। যেভাবে ইইউ সদস্যদের (এমইপি) মধ্যে গ্রুপিং তৈরি করা হয়েছে। আপনি যদি স্পেনের সমাজতন্ত্রী হন, তাহলে সুইডেন অথবা ফ্রান্সের সমাজতন্ত্রীর পক্ষ নেবেন এবং ওই অঞ্চলের হয়েই কাজ করবেন।

এ অবস্থা পরে পার্লামেন্টের বাইরে বহুজাতিক রাজনৈতিক দল ও সংস্থার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এসব সংগঠনের সবাই ঘরে বসে বছরের পর বছর ব্রাসেলসের বেতন-ভাতা পেয়েছেন। ইইউ বাজেট থেকে তাদের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের যাবতীয় খরচ বহন করা হয়। ব্রাসেলসের উদ্দেশ্য ছিল, এমইপিরা গবেষণার মাধ্যমে দক্ষ হয়ে একসঙ্গে কাজ করলে ইউনিয়ন আরও শক্তিশালী হবে। যদিও ইইউর এই তহবিল অস্বচ্ছ ও অপব্যবহারের জন্য যথেষ্ট উন্মুক্ত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৭০৫ এমইপির সাধারণ ব্যয়নির্বাহে মাসে ৪ হাজার ৮৯৭ ডলার ভাতা দেওয়া হয়। এগুলো পার্লামেন্টের সদস্যদের অফিস ভাড়া ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ব্যয় হিসেবে দেওয়া হলেও, এজন্য কোনো রশিদ জমার বাধ্যবাধকতা নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ইউরোপ শাখার উপপরিচালক নিকোলাস আইওসা বলেন, ‘প্রত্যেক বছর এভাবে জনগণের প্রায় ৪০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করার নজির কোনো সরকারি-বেসরকারি খাতে নেই।’

ন্যাশনাল ক্যাম্পেইনের নামে ডানপন্থি মেরিন লি পেনের মালিকানাধীন দি ফ্রান্স ন্যাশনাল ফ্রন্ট জালিয়াতির মাধ্যমে লাখ লাখ ডলার ব্যয় দেখায়, যা ২০১৭ সালে তদন্তে বেরিয়ে আসে। যদিও দি ন্যাশনাল ফ্রন্ট এ অভিযোগ অস্বীকার করে। একই অভিযোগে ২০১৯ সালে ফারাজের সাবেক দল ইউকেআইপি আড়াই লাখ ডলার ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিল। এভাবেই ইউরোস্কেপটিক পার্টি ইইউতে পরিবর্তন আনলেও সবসময় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

জার্মানি থেকে ইইউর গ্রিন এমইপি ড্যানিয়েল ফ্রউন্ড বলেন, ‘নিজের পায়ে কুড়াল মারার জন্য ইইউ পার্লামেন্ট এ ধরনের অসংখ্য আন্দোলনের প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে।’ আর হংকংয়ের চাইনিজ ইউনিভার্সিটির গবেষক জেমস এফ. ডাউনেস বলেন, ‘ডানপন্থিদের শক্তিশালী অবস্থানের চেয়েও ইইউর জন্য হুমকি ইইউপন্থিদের ইউরোস্কেপটিক হয়ে ওঠা। ইউনিয়নের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের অভাবে ইউরোস্কেপটিক বাড়ছে, গভীর সংকটে পড়ছে ইইউ।’