সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ে একের পর এক আঘাত হানছে সরকার। দীর্ঘদিনে গড়ে তোলা সঞ্চয় নিরাপদ আমানত হিসেবে রেখে দুর্দিন পাড়ি দেওয়ার যে সুযোগ যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছিল, সরকারের নানামুখী উদ্যোগে গত সাত মাসে তা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেছে। সর্বশেষ গ্রাম-গঞ্জের সঞ্চয়কারী ও ছোট চাকরিজীবীদের ভরসার ক্ষেত্র ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমিয়ে অর্ধেকে নামানো হয়েছে গত বৃহস্পতিবার থেকে। এতে ব্যাংকে, ডাকঘরে টাকা রেখে সঞ্চয়কারীরা এতদিন যে মুনাফা পেতেন, এখন তা পাওয়ার পথ রুদ্ধ হলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের সব মানুষের সঞ্চয়ের টাকা ব্যাংকে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বেশি সুদের স্কিমগুলোর মুনাফার হার কমানো হচ্ছে। এতে হতাশ হয়ে মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা কমে যাবে। আর মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা কমে গেলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতেও। এমনিতেই এখন দেশে জিডিপির ৩৪ শতাংশ বিনিয়োগ চাহিদার বিপরীতে সঞ্চয়ের হার ২৭-২৮ শতাংশে ঘুরপাক খাচ্ছে। সঞ্চয় কমলে বিনিয়োগ সংকটে পড়বে দেশও।
তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সুদ বা মুনাফার হারের সরাসরি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে সাধারণত মুনাফার হার মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে বেশি হয়। কারণ, এসব দেশের সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবীরা তাদের কষ্টে জমানো টাকা ও পেনশনের টাকা সঞ্চয়পত্র ও ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন। সেখান থেকে তারা এতদিন ধরে মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কিছুটা বেশি হারে মুনাফা পেয়ে আসছিলেন। এখন ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়ে মূল্যস্ফীতির সমান বা তার চেয়ে নিচে নামানো হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার না কমালেও তাদের কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করাসহ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ সঞ্চয়কারীদের পক্ষে বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার ওপর আয়করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ব্যাংকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ নিশ্চিত করতে গিয়ে আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামানোর প্রক্রিয়া চলছে। অথচ দেশে গড় মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৫ শতাংশের মতো। অর্থাৎ, এখন যে পণ্যের দাম ১০০ টাকা, এক বছর পর ওই পণ্য কিনতে ১০৫ টাকা ৫০ পয়সা লাগবে। আর ব্যাংকে বা ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে এখন ১০০ টাকা আমানত রাখলে এক বছর পর ১০৫ টাকা থেকে ১০৬ টাকা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, কষ্টের সঞ্চয় ব্যাংক বা ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে কিছু বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকছে না।
ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদহার অর্ধেকে নামিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ গত বৃহস্পতিবার এক প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছে, তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ থেকে কমে হবে ৬ শতাংশ। দুই বছর মেয়াদি সঞ্চয়ে সুদহার ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ কমে সাড়ে ৫ শতাংশ ও এক বছর মেয়াদে সুদহার ১০ দশমিক ২০ থেকে কমে ৫ শতাংশ হবে।
ডাকঘরে টাকা রেখে যারা ৬ মাস পরপর মুনাফা উত্তোলন করেন, তাদের সুদহারও কমিয়ে অর্ধেক করা হয়েছে। এতদিন প্রথম বছরে সুদহার ছিল ৯ শতাংশ, দ্বিতীয় বছরে সাড়ে ৯ শতাংশ ও তৃতীয় বছরে ১০ শতাংশ। এখন প্রথম বছর ৪ শতাংশ, দ্বিতীয় বছর সাড়ে ৪ শতাংশ ও তৃতীয় বছর ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে একক নামে ৩০ লাখ ও যৌথ নামে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার কোটি টাকা। আর তিন বছর মেয়াদি আমানত হিসেবে ডাকঘরে মানুষের সঞ্চয়ের পরিমাণ সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা।
ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর কারণ জানতে গতকাল অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তাই সুদহার কমানোর প্রভাব সাধারণ সঞ্চয়কারীদের ওপর কতটা পড়বে, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।
তবে ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সুধাংশু শেখর ভদ্র জানান, ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত সঞ্চয়কারীদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। অবসরপ্রাপ্তদের অনেকেই এখানে টাকা রেখে পাওয়া মুনাফা দিয়ে সংসার চালান, তাদের আয় অনেক কমে যাবে।
মুদ্রাবাজার বিশ্লেষকরা জানান, বাংলাদেশে সঞ্চয়ের অর্থ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিনিয়োগের সুযোগ খুবই কম। সঞ্চয়পত্র, ডাকঘর সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক, শেয়ারবাজারের বাইরে বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বিনিয়োগ করে সঞ্চয়কারীরা বিভিন্ন সময় প্রতারিত হয়েছে। ফলে একই সঙ্গে ব্যাংক ও ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে আমানতের সুদহার কমে যাওয়ায় বিনিয়োগের দুটি ক্ষেত্র বাকি থাকছে। এর একটি সঞ্চয়পত্র, অন্যটি শেয়ারবাজার। এখন ১ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গ্রামের সাধারণ সঞ্চয়কারী, মৃত সরকারি কর্মকর্তার বিধবা স্ত্রীসহ অনেকেই টিআইএন না থাকায় সঞ্চয়পত্র কিনতে পারছেন না। ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি অনেক কমে গেছে। আর দেশের শেয়ারবাজারও স্থিতিশীল নয়, সেখানে বিনিয়োগ করে বারবার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সহায়-সম্বল হারাতে হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানো মোটেই ঠিক হয়নি। এতে সাধারণ সঞ্চয়কারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, একসময় মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে ডাকঘর সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, এর মধ্য দিয়ে মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা বাড়ানো ও সাধারণ সঞ্চয়কারীদের বাড়তি মুনাফা দেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করে এসব সঞ্চয় স্কিম চালু করা হয়েছিল। এখন আর তা থাকছে না।
তিনি আরও বলেন, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভাবলে হবে না, জনকল্যাণের কথাও ভাবতে হবে। সরকার যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে, তার প্রভাবে মানুষের সঞ্চয়ের অভ্যাস কমে গেলে চূড়ান্ত বিচারে তা দেশের বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আগামী ১ এপ্রিল থেকে ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকর করতে যাচ্ছে সরকার। তখন আমানতের সুদহার হবে ৬ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকমালিকরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে, সঞ্চয়পত্র ও ডাকঘর সঞ্চয়পত্র এবং সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার না কমালে মানুষ ৬ শতাংশ সুদে ব্যাংকে টাকা রাখবেন না। আর চড়া সুদে আমানত নিয়ে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া সম্ভব হবে না। তাই এসব ক্ষেত্রে সুদের হার কমানোর বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ দেন ব্যাংকাররা।
দু’বছর আগে এক অঙ্কের সুদহার আলোচনায় আসার শুরু থেকেই অর্থ মন্ত্রণালয় সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমাতে বারবার উদ্যোগ নিলেও সংসদের ভেতরে ও বাইরে নানামুখী চাপে তা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় কোনোরকম আগাম ঘোষণা বা আলোচনা ছাড়াই ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানো হলো। তবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার এখনো কমানো হয়নি। বর্তমানে ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদহার ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। আর ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের সুদহার ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে ট্রেজারি বিলের সুদহার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বেড়েছে।
দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে সরকার গড়ে ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ হারে সুদ দিচ্ছে। আর ৫ ও ১০ বছর মেয়াদি বন্ডে গড় সুদহার যথাক্রমে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ ও ৯ দশমিক ১৫ শতাংশ।
এ বিষয়ে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারের রাজস্ব আয় কমে গেছে। ফলে সরকারকে ঋণ নিতে হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রে সুদহার বেশি হওয়ায় সরকার সেখান থেকে আর ঋণ নিতে চাচ্ছে না বলেই সুদহার কমাচ্ছে। এখন ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে বেশি আগ্রহী। আর ব্যাংকগুলোও সাধারণ মানুষকে ঋণ দেওয়ার বদলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারকে ঋণ দিতে মুখিয়ে থাকছে। ট্রেজারি বিল-বন্ডে সুদহার না কমালে ব্যাংকের লাভ, সাধারণ সঞ্চয়কারীদের নয়।