জনস্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহি জরুরি

১. সম্প্রতি হাইকোর্ট ডাক্তারদের নিয়ে রুল দিয়েছে। ডাক্তাররা বিজ্ঞাপনে পদবী ব্যবহার করতে পারবেন না বলে। রুলটি তখনই এলো, যখন বাংলাদেশ স্বাস্থ্যসূচকে ভারতকে পেছনে ফেলেছে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এখন ৮৮তম। পাকিস্তান ও ভারত যথাক্রমে ৯৪তম ও ১০২তম। আর স্বাস্থ্যবান দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ৯১তম। ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে ১২০তম ও ১২৪তম। প্রশ্ন জাগে, বাস্তবতা এমন হলে, চিকিৎসা ভিসায় ভারতগামীদের লাইন এত দীর্ঘ কেন? একটিকে সত্য ধরলে আরেকটি মিথ্যা মানতে হয়। কেন এই বৈপরীত্য? নাকি সত্য দুই জায়গাতেই আছে?

বিশাল দেশ ভারত। জনসংখ্যার অনুপাতে যে পরিমাণ জনগণ ভারতে চিকিৎসাসেবার আওতায় আছে, বাংলাদেশে তার চেয়ে বেশি। এখানেই হলো সূচকের মাহাত্ম্য। কিন্তু একজন রোগীর সম্মানের সঙ্গে চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার, আত্মসম্মান ও স্বাধীনতার অধিকার, উপযুক্ত মানসম্পন্ন চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার, ডাক্তারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের অধিকার, চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব তথ্য জানার অধিকার, ভরসা পাওয়ার অধিকার, শিক্ষা ও গবেষণা-সংক্রান্ত অধিকার, অভিযোগ করার অধিকারসহ যে অধিকারগুলো আছে, সেসব অধিকারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভারত এগিয়ে থাকায় রোগীরা ভারতে চিকিৎসা নিতে বেশি আগ্রহী। আর বাংলাদেশে ডাক্তার-রোগীর সম্পর্ক অনেকটা রাজা-প্রজার সম্পর্কের মতো। রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সময় দেওয়ার বেলায়, ইতিহাস নেওয়ার বেলায় সবচেয়ে কম সময় দেন ডাক্তাররা।

‘স্বাস্থ্যব্যবস্থার অসুখ’ গ্রন্থে লেখক ডা. মনিরুল ইসলাম এই পরিস্থিতির কারণ সম্পর্কে বলেছেন, ঔপনিবেশিক কাঠামো এবং চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার অবাধ বাণিজ্যিকীকরণের ফলেই এমনটা হয়েছে। ১৭৬৪ সালে ইন্ডিয়ান মেডিকেল সার্ভিস (আইএমএস) চালু হয়, যা ছিল মূলত এ দেশে অবস্থানরত ইউরোপীয়দের জন্য। ফলে সাদা চামড়ার বিদায়ে তাদের জায়গায় এখানকার টাকাওয়ালারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। কাঠামো ছিল কঠোরভাবে কেন্দ্রনিয়ন্ত্রিত। ব্রিটিশ গেছে কিন্তু কাঠামো চালু থেকেছে। শিক্ষাক্রমের যে ভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রবণতা ছিল, তা আচ্ছন্ন রেখেছে আজও। তা আমাদের চাকরিমুখী করেছে, কর্মমুখী করেনি। এই ধারার শিক্ষিতদের টার্গেট থাকে কম জবাবদিহির সরকারি চাকরি। গ্রামে স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে যাবে কিংবা জনগণের ডাক্তার হওয়া যায় কীভাবে এই শিক্ষা কোনোভাবেই এখানে মেলে না।

হাসপাতালগুলোতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো জরুরি চিকিৎসা। অথচ হাসপাতালে জরুরি বিভাগের জন্য বরাদ্দ স্থান, লোকবল ও উপকরণ সবচেয়ে কম। জরুরি সেবাদানকারী ডাক্তার-নার্সদের সে রকম সুবিধা নেই। তাই এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রি গ্রহণে আগ্রহীও কম। এখানে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পদও সৃষ্টি হয়নি। প্রাইভেট চিকিৎসার লক্ষ্যই হলো চিকিৎসাকে ব্যয়বহুল করা। উন্নত প্রযুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যয়বহুল ওষুধ সবই ব্যবসার উপকরণ। সরকারি হাসপাতালের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে সেখানকার ব্যয়বহুল চিকিৎসা উপকরণ বিক্রির ব্যবসা চলে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আর যেসব ওষুধ হাসপাতালে থাকে না, তা বাণিজ্যিক দামে কিনতে হয় রোগীদের। পণ্যে পরিণত হওয়া এমন চিকিৎসাব্যবস্থা মনে হয় কোনো নীতির ধার ধারে না।

২. জ্ঞানচর্চার বহুত্ববাদকে উপনিবেশ অস্বীকার করে। ভারতে যে জ্ঞান স্বাধীন ও সমাজকেন্দ্রিক ছিল, তা ঔপনিবেশিক কারণে অতিমাত্রায় প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোবদ্ধ হলো। ব্রিটিশদের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত চিকিৎসার জের স্বাধীন বাংলাদেশে টানছি। স্থানীয় সহজলভ্য, সুলভ ও জীবনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ চিকিৎসা উন্নত করা যেত। ব্রিটিশরা নিজ দেশে ১৯৪০-এর দশকে স্বাস্থ্যসেবাকে সম্পূর্ণ অবাণিজ্যিক করে তোলে। আর ভারতের বেলায় তারা তা চিন্তাও করেনি।

টাকা ঢাললেই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা মিলবে, এ কথার সত্যতা নেই। উন্নত স্বাস্থ্যসেবার দুই ধরনের মডেল আমাদের সামনে। একটি কিউবার মডেল, আরেকটি ইউরোপীয়। আবার মার্কিন মডেলও আছে। যেখানে জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্যের বদলে হাসপাতালের মালিক, ওষুধ ও ইনস্যুরেন্স কোম্পানিসহ বৃহৎ পুঁজিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ক্লিভ্যান্ড ক্লিনিকের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. স্টিভেন নিসেনের ভাষায়, ‘আমাদের পূর্বসূরিরা মূলত রোগীর কথাই ভাবতেন, সারিয়ে তোলাই ছিল তাদের নেশা। কিন্তু যখন থেকে চিকিৎসা ব্যবসায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে, আমরা আমাদের নৈতিক নির্দেশনা হারিয়েছি।... নানা ধরনের বিকৃত আর্থিক প্রলোভনের দ্বারা চালিত হয়ে উচ্চপ্রযুক্তির চিকিৎসা প্রয়োগ করি, যা তাদের জন্য প্রয়োজনীয় নয়।’ একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, হোয়াইট হাউজে সবচেয়ে বেশি লবিস্ট নিয়োগ দিয়েছে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধ ও ইনস্যুরেন্স কোম্পানি। এসব বর্ণনা আমাদের দেশের সঙ্গে দারুণভাবে মিলে যায়। অন্যদিকে কিউবা মডেল সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা বিনামূল্যে নিশ্চিত করে থাকে। ইউরোপীয় মডেলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পূর্ণমাত্রায় চালু। কিন্তু চিকিৎসাকে বাণিজ্যিকীকরণ করতে দেয়নি। সবার জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছে।

বাংলাদেশের বিবেচনায় আসা যাক। সরকারি স্বাস্থ্য খাতে ১৯৯৭ সালে ব্যয় ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ। তা ২০১৫ সালে কমে হয়েছে শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ। চিকিৎসকদের ৮০ ভাগই একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে কাজ করে। আর বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের খরচের ৬৭ ভাগই আসে ব্যক্তির কাছ থেকে। বাকি ২৩ ভাগ রাষ্ট্র, ৭ ভাগ ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান ও ৩ ভাগ গোষ্ঠীর স্বাস্থ্যবীমাসহ অন্যান্য খাত থেকে।

৩. আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার বড় একটা সমস্যা হচ্ছে জবাবদিহিহীনতা। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ডাক্তারদের জবাবদিহির একটি প্রতিষ্ঠান। তার কাজ দুটি। চিকিৎসা করার অনুমতি দেওয়া, আরেকটি চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে পেশাগত গাফিলতি ও অসদাচরণের তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া। তারা ডাক্তারদের ১০টি বিষয় তদারকি করেন। ভুয়া সার্টিফিকেট দেওয়া, কমিশন খাওয়া, রোগীর প্রতি অসদাচরণ, পেশাগত জ্ঞান ও অবস্থানকে অবৈধ কাজে ব্যবহার এবং প্রচার করা রোধ করার কথা তাদের। কিন্তু বিএমডিসি এ পর্যন্ত কতজন ডাক্তারকে এসব কারণে শাস্তি দিয়েছে? জবাবদিহি না থাকলে পেশার সততা ও মান বজায় থাকে না। ফলে লাখ লাখ রোগীর বিদেশযাত্রা কীভাবে ঠেকাব?

লেখক : রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি