মুভি মোগল স্মরণে

ঢালিউডের ‘মুভি মোগল’খ্যাত এ কে এম জাহাঙ্গীর খান আর নেই। বার্ধক্যের নানা সমস্যায় ভুগে গত শনিবার তিনি পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। বাংলা চলচ্চিত্রের সমৃদ্ধিতে অনেক অবদান রেখেছেন এই প্রযোজক। ‘নয়নমণি’, ‘শুভদা’, ‘কি যে করি’, ‘সওদাগর’, ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা  পেরিয়ে’, ‘আলিঙ্গন’, ‘তুফান’, ‘রঙ্গীন রূপবান’, ‘আলীবাবা চল্লিশ  চোর’সহ এমন অনেক ব্যবসাসফল সিনেমার প্রযোজক তিনি। ১৯৭৮ সালে ‘চিত্রালী’ সম্পাদক প্রয়াত আহমদ জামান চৌধুরী তাকে ‘মুভি  মোগল’ খেতাব দেন। তখন থেকে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি ঢাকার চলচ্চিত্র জগতে এ নামেই পরিচিত ছিলেন। ১৯৮৬ সালে তার প্রযোজিত ও চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘শুভদা’ ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ১৩টি পদক অর্জন করে রেকর্ড গড়ে। ১৯৭৬ সালে প্রথম তিনি প্রযোজনা করেন ‘নয়নমণি’ ছবিটি। এর আগে ১৯৭৩ সালে তার প্রথম পরিবেশিত ছবি ছিল ‘যাহা বলিব সত্য বলিব’। ৪৩টি ছবির প্রযোজক ও পরিবেশক তিনি। চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার শূন্যতা অপূরণীয়। তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন তারই ছবির খ্যাতিমান শিল্পীরা

ফারুক

জাহাঙ্গীর ভাইকে নিয়ে কী বলব। কত স্মৃতি। আমার অভিনয় ক্যারিয়ারের অভিভাবক। আমাদের ব্যর্থতা যে তার প্রজন্মের পরে আরেকজন এমনভাবে চলচ্চিত্রকে শক্ত হাতে ধরে রাখলেন না। তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

ববিতা

আমাদের অভিভাবক জাহাঙ্গীর ভাই আর নেই খবরটি শুনে খুব মন খারাপ হয়েছে। তার প্রযোজনায় ‘নয়নমণি’সহ অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করেছি। ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক প্রযোজক আছেন। কিন্তু তাকে সহজেই আলাদা করা যায়। জাঁদরেল একজন প্রযোজক ছিলেন। যে জন্য তিনি ‘মুভি মোগল’ উপাধি পেয়েছিলেন। শুধু প্রযোজনা করেই তার দায়িত্ব শেষ করেননিÑ স্ক্রিপ্ট, ছবিতে কে অভিনয় করছেন, কার চরিত্র কী রকমÑ সব বিষয়ে তিনি খোঁজ নিতেন। রীতিমতো সব ছিল তার নখদর্পণে। মনেপ্রাণে তিনি চাইতেন চলচ্চিত্রের উন্নতি। এ কারণে সব সময় তিনি বড় বাজেটের ছবি বানাতেন। তার অসংখ্য ছবি পুরস্কৃত হয়েছে। ব্যক্তিমানুষ হিসেবে ছিলেন অনেক সাদা মনের। সবাইকে আপন করে নিতেন। আমার এখনো মনে পড়ে, যখন ‘নয়নমণি’ ছবির শ্যুটিংয়ে গিয়েছিলাম তখন নিজে এসে আমাদের খোঁজ-খবর নিতেন। সব সময় শিল্পীদের তার পরিবারের লোক বলেই ভাবতেন। শুধু শিল্পীদের প্রতি নয়, চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবার সঙ্গেই অমায়িক ব্যবহার করতেন।

মিশা সওদাগর

আমার, আমাদের স্বপ্নের নায়ক ছিলেন জাহাঙ্গীর ভাই। তিনি ছিলেন তারকাদের তারকা। আমাদের যারা পরিচালক প্রযোজক রয়েছেন আমার মতে তাদের ভাবনা-দর্শন, চলচ্চিত্রের উত্তরণ নিয়ে তার এই কর্মজীবনটা ফলো করা উচিত।

চম্পা

এ কে এম জাহাঙ্গীর খানের মৃত্যু আমাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। এমন শিল্পমনা প্রযোজকের শূন্যতা অপূরণীয়। তার প্রযোজিত ‘প্রেম দিওয়ানা’ ছবিতে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সিনেমা প্রযোজনা করলেও শ্যুটিং সেটে তিনি তেমন একটা নিয়মিত আসতেন না। বাইরে থেকে সবকিছুর  দেখাশোনা করতেন। খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি ছিলেন বিনয়ী। কখনো তাকে উচ্চস্বরে কারও সঙ্গে কথা বলতে শুনিনি। ‘প্রেম দিওয়ানা’ ছবিতে কাজের সময় তার বিনয়ী স্বভাব আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। সাধারণত প্রযোজকরা শ্যুটিং সেটে নায়ক, নায়িকা কিংবা নির্মাতার খোঁজ-খবর নেন। কিন্তু তিনি প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত সবার ভালোমন্দ দেখাশোনা করতেন। আমি বিশ্বাস করি, প্রযোজক শিল্পমনা হলে সেই কাজ অবশ্যই ভালো হয়। এ কে এম জাহাঙ্গীর খানের মধ্যে সেই গুণটি ছিল।

রোজিনা

সৃষ্টির প্রতি একজন মানুষের কতটা ভালোবাসা থাকতে পারে, তার অনেক উদাহরণ রেখে গেছেন এ কে এম জাহাঙ্গীর খান। বিনয়ী এবং নরম মনের মানুষ ছিলেন তিনি। তার প্রতিটি ছবির শিল্পী, নির্মাতা, কলাকুশলীর সব সময় খোঁজখবর রাখতেন। কেমন হচ্ছে ছবির নির্মাণ, তার দেখভালও করতেন শ্যুটিং স্পটে গিয়ে। ‘রঙ্গীন রূপবান’, ‘সম্রাট’, ‘শীষ মহল’, ‘রঙ্গীন কাঞ্চনমালা’সহ বেশ কিছু ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ায় নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে হয়। চলচ্চিত্রে তার যে অবদান, তা কথায় বলে শেষ করা যাবে না। চলচ্চিত্রে তার বিশাল অবদানের কারণেই পেয়েছিলেন ‘মুভি মোগল’ খেতাব। এই খেতাবের তিনিই একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি। এমন একজন চলচ্চিত্র পূজারিকে হারিয়ে আমরা অনেকটা নিঃস্ব হয়ে গেলাম। সৃষ্টিকর্তার কাছে চাওয়া এটাইÑ পরকালে তিনি যেন শান্তিতে থাকেন।