চীন ও সিঙ্গাপুর থেকে এলেই আইসোলেশনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই

কেউ চীন ও সিঙ্গাপুর থেকে এলেই তাকে নিয়ে আতঙ্কিত হতে মানা করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, চীন ও সিঙ্গাপুর থেকে ফেরা বাংলাদেশিদের নিয়ে মানুষের ভেতরে কিছু ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। আমরা একটা বিষয় দেখতে পাচ্ছি, ইদানীং সিঙ্গাপুর বা চীন থেকে এলেই তাকে আইসোলেশন করার একটা প্রেশার আসে মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের কাছ থেকে। কিন্তু চীন বা সিঙ্গাপুর থেকে এলেই তো তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত না।

পরিচালক আরও বলেন, সিঙ্গাপুর থেকে বা চীন থেকে এলেই তাকে হাসপাতালের আইসোলেশনে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে, স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করেই তার মধ্যে লক্ষণ উপসর্গ আছে কি না, তা দেখেই আমরা তাকে আইসোলেশনে নেব। তাকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানোর প্রয়োজন হলে সেই পরামর্শও স্বাস্থ্য বিভাগ দেবে।

ডা. ফ্লোরা বলেন, বাংলাদেশে এই পর্যন্ত ৬৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে কারও শরীরে নভেল করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তার মানে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো রোগী নেই। কারও মধ্যে এর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

কডিভ-১৯ (নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট রোগ) ছড়িয়ে পড়ার পর গত ১ ফেব্রুয়ারি চীন থেকে ৩১২ বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হয়। ঢাকার আশকোনার হজ ক্যাম্পের কোয়ারেন্টাইনে ১৪ দিন অবস্থানের পর গত শনিবার তাদের ছাড়পত্র দেয় আইইডিসিআর। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে এখন পর্যন্ত চীন ফেরত কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে নমুনা পরীক্ষা করে কারও শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি মেলেনি।

চীন নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর দেশটি থেকে আসা বাংলাদেশিদের বিভিন্ন জেলায় হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলনে আইইডিসিআর একথা জানায়।

আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, চীন ও সিঙ্গাপুর থেকে প্রতিদিন অনেক যাত্রী বাংলাদেশে আসছেন। চীনের সব প্রদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। চীনের যে সব অঞ্চলে প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, চীন সরকার সে সব অঞ্চলে গণ-কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা জারি করেছে ও সব ধরনের যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে উপদ্রুত এলাকা থেকে কারও বাংলাদেশে আসার সুযোগ নেই। অনুরূপভাবে গোটা সিঙ্গাপুর শহর আক্রান্ত নয়। যেসব প্রতিষ্ঠানে ও বাসাবাড়িতে করোনাভাইরাস নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে সেসব অঞ্চল ও প্রতিষ্ঠানকে সিঙ্গাপুর সরকার শহরের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রোগীদের আইসোলেশন ও তাদের সংস্পর্শে আসা সবাইকে কোয়ারেন্টাইন করেছে। ফলে সিঙ্গাপুরের উপদ্রুত অঞ্চল থেকেও কোনো যাত্রীর বাংলাদেশে আসার সুযোগ নেই।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, সতর্কতার অংশ হিসেবে আমরা বাংলাদেশে আসা চীন ও সিঙ্গাপুর ফেরত যাত্রীদের মধ্যে যারা জ্বর-হাঁচি-কাশিতে ভুগছেন, তাদের আইসোলেশন করে চিকিৎসার ব্যবস্থা ও নমুনা পরীক্ষা করছি। বাকিদের যার যার বাসাতে স্বেচ্ছা-কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সবার কাছে আবেদন রেখে আইইডিসিআর বলেন, কেভিড-১৯ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ সব দায়িত্ব পালন করছে এবং বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের তথ্য আমাদের কাছে আছে। প্রশাসনের কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে বিদেশ থেকে আগত যাত্রীদের বাড়ি যাচ্ছেন। এ ধরনের তৎপরতা গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের অনুরোধ, সিভিল সার্জন বা স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্র্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ছাড়া নিজ উদ্যোগে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

চীনের উহান ফেরত ৩১২ যাত্রীর সবাই সুস্থ : ৩১২ জন উহান ফেরত যাত্রীকে কোয়ারেন্টাইন পরবর্তী আরও ১০ দিন সীমিত চলাচল ও নিজেদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অবহিত করতে বলেছে আইইডিসিআর। সে তথ্য অনুযায়ী গতকাল পর্যন্ত এসব যাত্রীর সবাই সুস্থ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআর পরিচালক। তিনি বলেন, তাদের কেউ কেউ হটলাইনে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। তারা সবাই সুস্থ আছেন।

সিঙ্গাপুর পরিস্থিতি : আইইডিসিআর জানায়, সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মোট ৫ জন বাংলাদেশের নাগরিক করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে সিঙ্গাপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে একজন আইসিইউতে ও বাকি চারজন কোয়ারেন্টাইনে আছেন।

চীন ফেরত দুই শিক্ষার্থীর নমুনা সংগ্রহ: আমাদের হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, করোনাভাইরাস সন্দেহে চীন ফেরত একজন মেডিকেল কলেজ ছাত্রকে হবিগঞ্জ জেলা সদর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গত রবিবার রাতে তাকে হাসপাতালের নতুন ভবনের ৫ম তলায় নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। ওই শিক্ষার্থী চীনের একটি মেডিকেল কলেজে লেখাপড়া করেছেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি চীন থেকে দেশে ফেরেন। এরপর ঢাকায় আশকোনা হজ ক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইনে থাকার পর ছাড়পত্র পেয়ে বাড়ি ফেরেন।

হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চীনফেরত ওই শিক্ষার্থী গত তিন দিন ধরে সর্দি-কাশি ও ঘাড় ব্যথায় ভুগছেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এলে তাকে প্রাথমিকভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে ভর্তি নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে তার রক্তের নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। রক্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর বোঝা যাবে তিনি আক্রান্ত কি-না।

অন্যদিকে, আমাদের বরগুনা প্রতিনিধি জানান, বরগুনা জেলা সদর হাসপাতালে করোনাভাইরাস সন্দেহে চিকিৎসাধীন চীন ফেরত এক শিক্ষার্থীর নমুনা (রক্ত, নাক ও গলা থেকে সোয়াপ) সংগ্রহ করেছে আইইডিসিআরের ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। তবে এ ঘটনায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. হুমায়ূন শাহিন খান। তিনি বলেন, বরগুনায় চারজন চীন থেকে দেশে ফিরেছেন। সবাই সুস্থ আছেন। এদের মধ্যে এক শিক্ষার্থীর শরীরে সামান্য জ্বর দেখা দিলে তার রক্ত, নাক ও গলা থেকে সোয়াপ সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে আইইডিসিআর।