পঞ্চগড়ের মৃতপ্রায় নদীগুলোর প্রাণ ফেরাতে পুনঃখননের উদ্যোগ নিলেও তা ভেস্তে যাচ্ছে। জেলার পাঁচটি নদী ও একটি খাল খননে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও ঠিকাদারের দায়সারা খননে তা কোনো কাজেই আসছে না। নামমাত্র খননে নদীর প্রশস্ততা যেমন কমেছে তেমনি অপরিকল্পিতভাবে খননের পরপরই আবার তা ভরাট হয়ে পড়ছে। আগামী বর্ষায় তুলে রাখা বালু আবার নদীতে পড়ে ভরাট হয়ে যাবে নদী। এতে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ভেস্তে গেলেও পকেট ভরছে ঠিকাদারদের। এ নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয়দের মাঝে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ৬৪ জেলায় অভ্যন্তরে ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় পঞ্চগড়ের পাঁচটি নদী ও একটি খাল পুনঃখননের কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে। ১৬টি প্যাকেজে করতোয়া, চাওয়াই, ভেরসা, পাথরাজ, বুড়িতিস্তা ও বড়সিঙ্গিয়া খালের ১৬৪ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ চলছে। এতে চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছে ১৪৯ কোটি ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। এর মধ্যে বোদা উপজেলার পাথরাজ নদীর শুরুর অংশের ১২ কিলোমিটার পুনঃখনন শুরু হয় গত বছর ১২ ফেব্রুয়ারি। কাজটি পায় ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাজুল ইসলাম। নিজে কাজ না করে ঠিকাদার কাজটির দায়িত্ব দেয় স্থানীয় এক প্রতিষ্ঠানকে। ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু করে তা এক মাসের মধ্যেই শেষ করে তারা। দায়সারাভাবে খনন করায় স্থানীয়দের চাপের মুখে পড়ে আবারও চলতি জানুয়ারিতে খনন করতে বাধ্য হয় তারা। কিন্তু ফের কয়েক দিনেই কাজ করে শেষ করে প্রতিষ্ঠানটি। ৫০ মিটার প্রশস্ত (গড়ে) নদীটি প্রথম দফায় ২০ আর বর্তমান ১০ মিটার প্রশস্ত পুনঃখনন করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকার মধ্যে বেশিরভাগ বিল তুলে নিয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, বোদা উপজেলা সদরের পাথরাজ নদীর প্রামাণিকপাড়া থেকে শুরু করে ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত অংশে দুবারের কাজ শেষ করেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। কাজ শুরুর স্থানে তুলনামূলক বেশি খনন করা হলেও কিছুদূর গিয়ে দেখা মেলে ভিন্ন চিত্রের। শুধু নদীর কিনার বরাবর খনন করা হয়েছে। ৩ মিটার গভীর খননের কথা থাকলেও ১ মিটারের বেশি করা হয়নি। খননের মাটি ও বালু ফেলা হয়েছে নদীতেই। অগোছালোভাবে যেখানে সেখানে খননের মাটি ও বালু ফেলে রাখা হয়েছে। এছাড়া পাড়ের মাটি সমান করে ঘাস ও বৃক্ষরোপণের কথা থাকলেও কোনোটিই নজরে পড়েনি।
স্থানীয়রা জানালেন, তাদের বোকা বানিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো যেভাবে খুশি খনন করেছে। প্রশস্ত নদীকে খনন করে এখন সরু খালে রূপান্তর করা হয়েছে। এ অবস্থা শুধু পাথরাজ নদীর নয়, পুনঃখনন করা অন্য নদীগুলোর অধিকাংশের অবস্থা একই।
১৬টি প্যাকেজের মধ্যে দু-একটি বাদে সব কাজ পেয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেগুলো হলো চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এইচবি-এসএসইসিএল জেভি, এডিএল-আই-এইচ এনটি জেভি, এইচবি-নিয়াজ-নোনা জেভি, মেসার্স শহীদ ব্রাদার্স ও মেসার্স তাজুল ইসলাম। টাঙ্গাইলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স গুডম্যান এন্টারপ্রাইজ ও উন্নয়ন গুডম্যান জেভি। রংপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রূপান্তর ও ঠাকুরগাঁওয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জামাল হোসেন। কিন্তু তারা কেউ নিজে কাজ না করে স্থানীয় প্রভাবশালী ঠিকাদারদের দ্বারা কাজগুলো করে নিচ্ছে। স্থানীয় ঠিকাদাররা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নামমাত্র খনন করেই তুলে নিচ্ছে বিলের টাকা। এতে নদীর খননের পরপরই আবারও ভরে যাচ্ছে বালুতে। খননের পরও নদীতে নেই এক ফুট পানি, নেই মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী।
পাথরাজ নদীপাড়ের বাসিন্দা বোদা উপজেলার প্রামাণিকপাড়া এলাকার আবদুল করিম বলেন, নদীটি এভাবে খননে আমাদের কোনো লাভ হলো না, সরকারেরও লাভ হলো না, লাভ হলো ঠিকাদারের।
পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, নদীর পাশে ব্যক্তিগত জমি থাকায় বেশি দূরে খননের মাটি ও বালু ফেলা যাচ্ছে না। পঞ্চগড়ের অধিকাংশ নদী বালি দিয়ে তৈরি তাই পাড়ের বালু সহজেই আবার নদীতে পড়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ঠিকাদার স্বীকার করেন, ‘শুধু আমার কাজ না, পঞ্চগড়ের যে কয়েকটি নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে সবই একই চিত্র। খননের পরপরই বালু দিয়ে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে।’