১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর বগুড়া কৃষি অফিসের জন্য জমি অধিগ্রহণ করে তখনকার পাকিস্তান সরকার। নিয়ম অনুযায়ী, জমির মালিকদের নোটিস দেওয়ার পর ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমি অধিগ্রহণ করা হয়। তবে ওই সময় নোটিস ও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগে অধিগ্রহণ করা ২১ দশমিক ৭৫ শতক জমির মালিকানা দাবি করে ১৯৬৫ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন বগুড়ার রমণী মাধব গং। আরও সোয়া ৫ শতক জমির মালিকানা দাবি করে ১৯৭৮ সালে আরেকটি মামলা করেন তারা। আগের মামলাটি দায়েরের ৫২ বছর পর নিম্ন আদালত বাদীর পক্ষে রায় দেয়। তিন বছর আগে রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলেও ওই আপিল মামলা শুনানির জন্য এখনো কজলিস্টে ওঠেনি।
বগুড়া কৃষি অফিসের এ মামলার মতোই সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জমি দখল করে কিংবা জমির মালিকানা দাবি করে চলছে ৪৯টি মামলা। এসব মামলায় জড়িত জমির পরিমাণ ১০৫ একরেরও বেশি। এসব মামলার বেশির ভাগই বিভিন্ন জেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, হর্টিকালচারের জমির মালিকানা দাবি করে বিভিন্ন ব্যক্তির মামলা। বছরের পর বছর এসব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় জমির দখল ও মালিকানা পাচ্ছে না কৃষি মন্ত্রণালয়। পাকিস্তান আমলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জন্য অধিগ্রহণ করা জমি নিয়ে এখনো মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে। এসব জমি উদ্ধারে বৈঠক, চিঠি চালাচালি হলেও তা উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। কৃষি মন্ত্রণালয় একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করলেও নির্ধারিত সময় অন্তর বৈঠক করা ছাড়া টাস্কফোর্সের তেমন কোনো সাফল্যও নেই।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বগুড়া কৃষি অফিসের মামলা হয়েছে পাকিস্তান আমলে। সেই মামলা এত দিনেও নিষ্পত্তি না হওয়ার বড় কারণ হলো, সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের খুব একটা আগ্রহ থাকে না; বরং প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তারা মামলায় উপযুক্ত ভূমিকা রাখা থেকেও বিরত থাকেন। আর মামলা যত দীর্ঘায়িত হবে, তত দিন জমি বাদীপক্ষের ভোগদখলে থাকবে।
বগুড়া কৃষি অফিসের জমি নিয়ে চলা ওই মামলা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে কোনো তথ্যই জানাতে পারেননি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের সভাপতি ও অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও উপকরণ) মো. আরিফুর রহমান অপু।
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে
দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন স্থানের জমি নিয়ে চলমান মামলার কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে এ-সংক্রান্ত তথ্য আছে। আমরা নির্ধারিত সময় পর পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে বিভিন্ন মামলার হালনাগাদ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাই। এর বাইরে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
মামলার বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আবুল কাশেম আযাদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি যোগ দিয়েছি বেশিদিন হয়নি। তাই এ মামলা সম্পর্কে অন্যদের কাছ থেকে না জেনে কিছু বলা সম্ভব নয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের জমি উদ্ধারসংক্রান্ত টাস্কফোর্স গত ৮ জানুয়ারি মামলাগুলো নিয়ে সভা করেছে। ওই সভার কার্যবিবরণী দেশ রূপান্তরের কাছে রয়েছে। এর থেকে জানা গেছে, সাভার হর্টিকালচার সেন্টারের ২ দশমিক ৬৫ একর জমির জাল দলিল হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিশেষ ক্ষমতা আইনে ২০০৮ সালে মামলা দায়ের করে। ওই মামলার সিডি এখনো পায়নি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক শাহাদত হোসেন মৃত্যুবরণ করেছেন। বিষয়টি আদালতকে অবহিত করে সিডি তৈরির ব্যবস্থা এখনো করতে পারেনি মন্ত্রণালয়। মামলার পুনঃতদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যবস্থা নিতে ডিএইর মহাপরিচালক দুদককে চিঠি দেবে বলে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট ৮৩৩ একর জমি অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনকে (বিএডিসি) হস্তান্তর করে, যা দিনাজপুর জেলার নশিপুর ফার্ম নামে পরিচিত। ওই ফার্মের ৫০ একর জমি ব্যক্তিমালিকানায় চলে গেছে। এ অবস্থায় ১৯৬৫ সালের নথিপত্র খুঁজছে বিএডিসি। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাচ্ছে না।
সোবহানবাগ হর্টিকালচার সেন্টারের জমির মালিকানা দাবি করে বজলুল করিম গং ১৯৯১ সালে মামলা করলে নিম্ন আদালতের রায় বাদীপক্ষে যায়। সরকারপক্ষে ২০১২ সালে আপিল করা হলে নিম্ন আদালতে মামলাটি পুনঃশুনানির রায় দেওয়া হয়। এই রায়ের বিপক্ষে বাদীপক্ষ ২০১৫ সালে সিভিল রিভিউ পিটিশন দায়ের করে। এ মামলাও নিম্ন আদালতে পুনঃশুনানির আদেশ দেওয়া হয়। পরে প্রতিপক্ষ দেওয়ানি আপিল করে, যার শুনানি চলমান আছে।
আবার ঢাকা জেলার ডেমরা থানার কায়েতপাড়া মৌজায় দশমিক ২০ একর জমির কিছু অংশ দখল করে নিয়েছে অবৈধ দখলদার। ওই জমি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে ঢাকার জেলা প্রশাসককে একাধিকবার পত্র দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর পত্র দেওয়া হয়েছে, এখনো অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ হয়নি।
পাকিস্তান আমলে অধিগ্রহণ করা জমি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিরোধ চলছে এখনো। নোয়াখালী এয়ারস্ট্রিপ নির্মাণের জন্য ১৯৬৯ সালে কলোনাইজেশন অফিসার প্রথমে ১৫ দশমিক ৬৬ একর, পরে ৩ দশমিক ২৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে ডিএইকে দেয়। বিএস জরিপে ১৫ দশমিক ৬৬ একর জমি জেলা প্রশাসনের নামে ও ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ জমি ডিএইর নামে রেকর্ড হয়। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় অনুরোধ জানালে ভূমি মন্ত্রণালয় পরীক্ষা করে প্রতিবেদন পাঠাতে নোয়াখালীর জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করে। কয়েক বছর আগে অনুরোধ করা হলেও এখনো প্রতিবেদন আসেনি। এ ছাড়া এলএ কেস নং-২৭/৯৭-৯৮ মূলে ২ একর জমি ডিএইর নামে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জমির দখল হস্তান্তরের জন্য দুইবার নোয়াখালীর জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়ার পর কোনো জবাব পায়নি কৃষি মন্ত্রণালয়। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে তাগাদাপত্র দেওয়া হয়েছে।
আবার, খুলনার ডিএই অফিস স্থাপিত হয় ১৯৫৭-৫৮ সালে। ওই জমিটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়ে গেছে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্র মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে ২০১৬ সাল থেকে খুলনার জেলা প্রশাসককে পত্র দেওয়া হলেও বিষয়টির সমাধান এখনো হয়নি।