ট্রিপলের সুযোগ না পাওয়ায় আক্ষেপ মুশফিকের

ক্রিকেট ছাড়া মুশফিকুর রহিমের প্রিয় কোনো জগৎ নেই। পুরোপুরি ক্রিকেটে বুঁদ হয়ে থাকা ৩২ বছরের অধ্যবসায়ী-মেধাবী ব্যাটসম্যান গতকাল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলেছেন অপরাজিত ২০৩ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস। দল ২৯৫ রানের লিড নেওয়ার পর ২ উইকেট ফেলেও দিয়েছে প্রতিপক্ষের। এমন দিনে মুশফিকের মুড থাকে অন্যরকম। ক্যারিয়ারের তৃতীয় ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে দিনশেষে প্রেস কনফারেন্স হাসিমুখে মাতিয়ে রাখা মুশফিকের অবশ্য ‘ট্রিপল সেঞ্চুরি’র চেষ্টা করতে না পারার আক্ষেপ রয়ে গেছে কিছুটা।

ইনিংস ঘোষণার পর যখন ফিরে আসছেন তখনো কি মনে হচ্ছিল শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে ট্রিপল সেঞ্চুরির চেষ্টা করার মতো অবস্থায় ছিলেন?

মুশফিক : তা তো অবশ্যই। আমার একটা পরিকল্পনা ছিল। সত্যি বলতে, আমি ভাবিনি এই সময়ে ইনিংস ঘোষণা করে দেবে। এখনো দু’দিন সময় আছে। তারচেয়েও বড় কথা আমরা যত ব্যাট করব উইকেট তত ভাঙতেও পারত।

আবার একই সঙ্গে দলই সবসময় আগে আসবে। চা-বিরতির সময় আমাদের এমন কোনো আলোচনা হয়নি। আধ ঘণ্টার একটু আগে জানতে পারি আজ ওদের ৬ থেকে ৮ ওভারের মতো আমরা দেব। এরপর আমরা একটু রানের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। এর আগে পরিকল্পনা ছিল, একপাশে যদি লিটন থাকে আমার জন্য সুবিধা হয়। আমার ভাবনা ছিল, ও যদি একশ করে তাহলে আমারও হয়তো রান তিনশর কাছে চলে যাবে। আজ হতো না, কাল প্রথম সেশনে হয়ে যেতে পারত।

এই ঘোষণা কি আবহাওয়ার কথা ভেবে?

মুশফিক : হতে পারে আবহাওয়ার জন্য। আমি এখনো জিজ্ঞেস করিনি। আমাদের একটা মানসম্পন্ন বোলিং আক্রমণ আছে। আশা করছি, জেতার জন্য আমাদের এই ইনিংসটাই যথেষ্ট হবে।

বেশ অন্যরকম উদযাপন করলেন ডাবলের পর। এর পেছনে কিছু আছে?

মুশফিক : স্বাভাবিকই। আমার ছেলে ডাইনোসরের খুব বড় ভক্ত। সব সময় ডাইনোসর দেখলে অন্যরকম একটা উদযাপন করে। ডাবল সেঞ্চুরি করার পর সেটাই আনার চেষ্টা করছিলাম। আমার ডাবল সেঞ্চুরিটা ওর জন্য।

সেঞ্চুরি উদযাপনের সময় ব্যাট ঘুরানোর ব্যাপার ছিল। ওটা কি কাউকে কিছু বোঝানো?

মুশফিক : না না, এটা কারও উদ্দেশে ছিল না। যতটুকুই ক্যারিয়ার আমার, কখনোই কারও প্রতি প্রতিশোধ বা প্রতিবাদ ধরনের কিছু করিনি। সবসময়ই মনে করি, নিজের লড়াই নিজের সঙ্গে করে যাব, যতদিন খেলি। পূর্বপরিকল্পনা করে কিছু করিনি। শুধু ভেবেছিলাম ডাবল করতে পারলে ছেলের জন্য করব। সেটিই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে লক্ষ্য ছুঁতে।

দেশের পক্ষে সবচেয়ে বেশি তিন ডাবল সেঞ্চুরি আপনার। অন্য দুটোর সঙ্গে এর তুলনা করবেন কীভাবে?

মুশফিক : যদি তুলনার কথা বলেন, এটা সবচেয়ে সহজ উইকেট ছিল। ব্যাটিংয়ের জন্য উইকেটটা খুব ভালো। ওদের দলে যে খুব আহামরি কোনো থ্রেট বোলার ছিল এমন না। খুব সুইং করছে বা স্পিন করছে এমন না বা কোনো মিস্ট্রি বোলার নেই। আমি যে তিনটা সেঞ্চুরি করেছি এর মধ্যে এটাই সবচেয়ে সহজ উইকেটে ছিল।

সুযোগ পেলে নিশ্চয়ই ট্রিপল সেঞ্চুরির টার্গেট করবেন?

মুশফিক : শুধু আমার জন্য না টপ অর্ডারে যারাই ব্যাট করে তাদের সবার জন্যই সম্ভব। শান্ত যদি কাল পুরোটা সময় খেলে আজ চা-বিরতি পর্যন্ত থাকত ওরও হয়ে যেতে পারত বা আড়াইশর কাছে যেত। কারণ, ও ঘরোয়া ক্রিকেটেও করেছে। যদি ভবিষ্যতে সুযোগ আসে তাহলে কেন নয়? আপনি যদি বিশ্ব ক্রিকেটের তাকান অনেকেরই দুইটা-তিনটা করে ট্রিপল সেঞ্চুরি আছে। তারা যদি করতে পারে আমাদের বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা কেন পারবে না?

উইকেট কিপিং ছেড়ে শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলায় কি চাপ থেকে ফ্রি হয়েছেন?

মুশফিক : (হাসি) কোথায় ফ্রি? এখন তো চাপ আরও বেড়ে গেল। তখন তো দুইটা ছিল। একটা খারাপ করলে অন্তত আরেকটায় সহায়তা পাওয়া যেত। আমি তো বোলিংও পারি না (হাসি)। আমার মনে হয়, বাস্তবতা অবশ্যই মানতে হবে। আমার যে বয়স হচ্ছে এটাও মানতে হবে। এটাই সঠিক সময় অন্য দিকে একটু মনোযোগ দেওয়ার। কারণ, ফিল্ডিংয়ের সময় আমি একটু রিলাক্সড থাকতে পারি। এতে ব্যাটিংয়ে আমার মনোযোগটা আরও বেশি থাকতে পারে।

এটা কি ক্যারিয়ারের সেরা সময়?

মুশফিক : শেষ ৫-৭ বছর খুব একটা খারাপ সময় যায়নি। চেষ্টা করছি, এটা ধরে রাখার। ব্যাটসম্যানের জন্য খারাপ সময় আসতে সময় লাগে না। ভালো সময়টা তাই যত বড় করা যায়, সেটা চেষ্টা করি। যেটা সাকিব, তামিম বা রিয়াদ ভাই, সবাই আমরা এটা আলোচনা করি। আমরা যাদেরই ভালো সময় যায়, সেটা যেন বড় করতে পারি।

অধিনায়ক মুমিনুল হক তো খুব চাপের মধ্যে থেকে সেঞ্চুরি করলেন।

মুশফিক : আমার মতে, টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান মুমিনুল। হয়তো দেশে ও দেশের বাইরে তার পারফরম্যান্সে কিছু পার্থক্য আছে। তাকে সময় দিতে হবে। দলকে লিড দেওয়ার জন্য সেই সঠিক মানুষ টেস্টে। ও কিন্তু অনেক চাপে ছিল, ওখান থেকে এসে এমন ইনিংস খেলাৃ। ওর সঙ্গে ব্যাট করাটা উপভোগ করি। শেষ ডাবলও ওর সঙ্গে ছিল, অনেকক্ষণ ব্যাটিং করেছি। গল-এ যে ডাবল সেঞ্চুরি ছিল সেখানেও ওর প্রথম ফিফটি ছিল। সে চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়। আর চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়রা তখনই বেশি ভালো করে যখন তারা চাপে থাকে।

আজ তো তামিম ইকবালকে টেস্ট রানে ছাড়িয়ে গেলেন।

মুশফিক : আমি সব সময়ই বলে এসেছি তামিম আমার সব থেকে প্রিয় ব্যাটসম্যান। ওর সঙ্গে সব সময় আমার অন্যরকম একটা প্রতিযোগিতা থাকে। সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকে। আমি ওকে অনেক অনুপ্রাণিত করি, ও আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করে। জানি আমার সাফল্যে ও অনেক খুশি হয় এবং ওর সাফল্যে আমিও অনেক খুশি হই। এরকম স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা দলের জন্য ভালো। মনেপ্রাণে চাই ও যেন সর্বোচ্চ রান করে এবং এটাও চাই ওর থেকে যেন ১ রান আমি বেশি করি। (হাসি)।

অনেকে মনে করেন আপনি বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান।

মুশফিক : এর উত্তর দেওয়া কঠিন। কখনো নিজেকে সর্বকালের সেরা মনে করি না। আপনারা অনেক সময়ই বলেছেন যে আমার টেকনিক, ধৈর্য বা অনেক কিছু সেরা। হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে কখনো মনে হয় না। আমার ব্যাটিংয়ের হাইলাইটস যখন দেখি তখন অতটা ভালো লাগে না। মনে হয় তামিমের মতো ওই ড্রাইভটা যদি করতে পারতাম বা সাকিবের মতো ওই কাট বা অন ড্রাইভ করতে পারতাম। সব মিলে আমাকে আল্লাহ একটা জিনিস দিয়েছেন- আমার মাথাটা অন্যদের থেকে একটু হলেও ভালো। যেটা আমি সব সময় ব্যবহার করার চেষ্টা করি। আমি সীমাবদ্ধতা জানি এবং কখন কী করার চেষ্টা করতে হয় সেটা জানি। সেগুলো থেকে আমি শিখতে পারি এবং সেগুলো করার চেষ্টা করি।

 এই টেস্টে দল এখন কী অবস্থায় আছে?

 মুশফিক : এটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট। শেষ কয়েকটি ম্যাচে সম্ভাবনা অনুযায়ী খেলতে পারিনি। এ টেস্টের আগে আমরা চাপে ছিলাম। ভালো করতে মুখিয়ে ছিলাম সবাই। আবার এ ধরনের উইকেটে ব্যাটসম্যান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব বড় ইনিংস খেলা। আমি দুইশ করেছি, মুমিনুল একশ করেছে। দল ভালো অবস্থানে আছে। ওদের দুইটা উইকেট ফেলে দিতে পেরেছি। বাকিগুলো আমাদের দ্রুত তুলতে হবে।