তদবিরে নেতা হয় বলেই আওয়ামী লীগসহ এর সহযোগী সব সংগঠনে পাপিয়াদের দৌরাত্ম্য দেখা দিয়েছে। তদবিরের সুযোগে নেতা হয়ে ডজন ডজন পাপিয়া, ক্যাসিনো নেতা আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় বসবাস করছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয়, সহযোগী সংগঠনে নেতাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরের কাছে এমন দাবি করেছেন। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১০ বছর দল ক্ষমতায় থাকায় আর্থিক লেনদেন করে পাপিয়ারা পদ বাগিয়ে নিয়েছে। এ পদ ব্যবহার করে হেন কোনো কাজ নেই যা পাপিয়ারা করছে না। তারা আরও বলেন, একজন পাপিয়া প্রকাশ্যে এলে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা হাঁকডাক করেন, কদিন গেলে আবার যেই লাউ সেই কদু। ফলে পাপিয়ামুক্ত হতে পারে না আওয়ামী লীগ। দায়ভার বর্তায় আওয়ামী লীগের কাঁধে।
ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা বানানোর তদবির তো থাকেই, থাকে জেলার নেতা বানানোর তদবিরও। এসব তদবির আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারাই করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা বলেন, তদবির না শুনলে হুমকি-ধমকি শুনতে হয়। কিন্তু যেই পাপিয়াদের মতো নেতারা প্রকাশ্যে আসে তদবির করা ওই নেতারাই পাপিয়াদের বিরুদ্ধে কথা বলে মাঠ গরম করে। দল ভারী করতে এসব তদবির আসে। যোগ্যতা বিবেচনা করে কাউকে নেতা বানানোর তদবির একজন নেতাও করেন না।
যুবলীগের সাবেক এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যাসিনোকান্ডে যুবলীগের যে সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে তার দায়ভার কিন্তু যুবলীগকেই নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, অথচ যারা এই কান্ডে বিতর্কিত হয়েছে তারা সবাই মোটামুটি তদবিরে যুবলীগের নেতা হয়েছেন। শুধু তাই নয়, নেতা হওয়ার পর যেসব দানব তৈরি হয়েছে ওই দানবদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা সুসম্পর্ক বজায়ে রাখেন এবং বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করেন।
যুবলীগের ওই নেতা বলেন, যখনই পাপিয়া হয়ে ধরা পড়েন তখনই লম্বা লম্বা কথা বলেন। অথচ যারা এসব কথা বলেন তারাই অমুক-তমুককে নেতা বানানোর জোর তদবির করেন। এ তদবির বন্ধ হলেই রাজনৈতিক পদ ব্যবহার করে দানব হয়ে ওঠা বা পাপিয়া হয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। যুব মহিলা লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নেতা বানানোর তদবির অনেক ওপর থেকে আসে। যা না শুনলে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে। নিরুপায় হয়ে তদবির শুনতে হয়। নেতা বানাতে হয়।
স্বেচ্ছাসেবক লীগের বর্তমান কমিটির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কমিটি হবে আওয়াজ উঠলেই অতিষ্ঠ হতে হয় তদবিরে। এমন বলে এ আমার লোক তাকে নেতা বানাতে হবে। অনুরোধ না রাখলে পরোক্ষ হুমকিও কপালে জোটে। এমন পরিস্থিতিতে খোঁজখবর নেওয়ারও সুযোগ হয় না। পাল্টা শুনতে হয় ও আমার লোক তুমি তার সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছ। তিনি বলেন, এটা বেয়াদবি হিসেবেও ধরা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বেচ্ছাসেবক লীগের ওই নেতা আরও বলেন, তদবির রাখতে গিয়ে প্রকৃতপক্ষে মাঠের নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন আমরা করতে পারি না। এর ফলে ধীরে ধীরে সাংগঠনিক দুর্বলতার সৃষ্টি হয়। আর দানব বনে যাওয়া নেতারা সমালোচনায় এলে দলকে নিতে হয় ওই দায়িত্ব।
অনেক ক্ষেত্রে তদবিরে নেতা বানাতে হয় কথাটি স্বীকার করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কমিটি হলে বিভিন্ন মহল নিজেদের লোককে নেতা বানানোর একটি তদবির করে। কিছু তদবির শুনতে হয়, কিন্তু তদবিরে নেতা হওয়া সবাই তো পাপিয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগসহ সব সহযোগী সংগঠনে এখনো রাজনৈতিক ত্যাগ মূল্যায়ন করে পদ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, এটাও ঠিক আমাদের কোনো কোনো নেতার বিশেষ অনুরোধ গিলতে গিয়ে আওয়ামী লীগে ‘হাইব্রিড’ শব্দটি এসেছে। তিনি বলেন, আমাদের আদর্শ-চিন্তাচেতনা ধারণ করে না এমন কিছু লোক আওয়ামী লীগে ঢোকার সুযোগ পেয়েছে। ফারুক খান বলেন, আগামীতে এ বিষয়গুলো আমরা খেয়াল রাখব।
পাপিয়াকে নিয়ে নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম হিরু গণমাধ্যমে বলেন, পাপিয়াকে নেতা না বানাতে যুব মহিলা লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু তারা শোনেনি। তার এ বক্তব্যের জবাবে যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক পাল্টা গণমাধ্যমে জানান, সাবেক এক মন্ত্রী যিনি আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ছিলেন তার অনুরোধে পাপিয়াকে নেতা বানানো হয়েছে।
টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্রাইটিরিয়া অনুযায়ী নেতা বানানো হলে প্রকৃত রাজনীতিকরাই পদ পাবেন এবং রাজনীতি করবেন। এছাড়া তদবিরবাজি করে যারা নেতা হন বা হয় তারা দলের জন্য কিছু করে না বরং দলকে এর দায় নিতে হয়। তিনি বলেন, সহযোগী সংগঠনের নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় নিয়ম অনুসরণ করলে এ ধরনের বিতর্কিত কেউ নেতা হওয়ার সুযোগ পাবেন না।