কাজুবাদামে বছরে বিলিয়ন ডলার আয়ের আশা

কাজুবাদাম চাষ করে ‘বড় অঙ্কের’ রপ্তানি আয় করতে চায় সরকার। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বৈঠক করেছেন অর্থ, পরিকল্পনা ও কৃষিমন্ত্রী এবং দুই সংসদ সদস্য। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন একজন সচিবও। বৈঠকে বলা হয়, সরকারের পক্ষ থেকে তৈরি পোশাক খাতের মতো সহায়তা দেওয়া হলে কাজুবাদাম রপ্তানি করেই বছরে অন্তত এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে সীমিত আকারে কাজুবাদাম চাষ হচ্ছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা করতে পারলে ২০২৪ সাল নাগাদ রপ্তানি আয়ের এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনামন্ত্রীর দপ্তরে এ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসেন তারা। বৈঠকে কাজুবাদাম নিয়ে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গ্রিনগ্রেইন কেশিউ প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রির প্রতিষ্ঠাতা শাকিল আহমেদ তানভীর। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী কাজুবাদামের ৯ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার রয়েছে। এ বাজার ২০২৪ সাল নাগাদ ১৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। শুধু আমেরিকাতেই এ বাজার ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। তানভীর বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার আরও বড়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ খুব সহজেই নিজেদের পার্বত্য অঞ্চলের পতিত জমিচাষ করে এ বাজারে হিস্যা হতে পারে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন উন্নয়নশীল দেশ থেকে বেশি কাজুবাদাম আমদানি করে। বর্তমান বিশ্বে ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন কাজুবাদাম হয়। এর মধ্যে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে হয় ১ দশমিক ২ মিলিয়ন টন, ভারতে ৭ লাখ ৪৬ হাজার টন ও ভিয়েতনামে ৪ লাখ টন। বাংলাদেশ বর্তমানে দুই হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদন করে মাত্র এক হাজার টন কাজুবাদাম। অথচ দেশে পাঁচ লাখ হেক্টর জমি কাজুবাদাম চাষ উপযোগী। দুই লাখ হেক্টর জমিতে এখনই কাজুবাদাম চাষ শুরু করা যায়। এটি করতে পারলে বাংলাদেশের উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে পাঁচ লাখ টন। এ বাদাম দিয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বছরে অন্তত এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এজন্য কিছু নীতি সহায়তা প্রয়োজন।

সভায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, সরকার কৃষি খাতকে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। কাজুবাদাম অবশ্যই একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা তুলে নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমি আমার ব্যবসার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যেকোনো ব্যবসার জন্য দেশি-বিদেশি দুই বাজারেই চাহিদা সৃষ্টি করতে হয়। এখন রপ্তানি আয় বাড়াতে হলে একই সঙ্গে চাষাবাদ বাড়ানো ও বাজারজাত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারী আনতে হবে, না আনতে পারলে বৈশ্বিক বাজার ধরা কঠিন। এ সময় দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, কৃষিতে সহায়তা করার জন্য বাজেটে থোক বরাদ্দ রয়েছে। এজন্য এ ক্ষেত্রে ভালো বিনিয়োগকারী পেলে টাকার কোনো সমস্যা হবে না।

পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, নিয়ম অনুসারে ১০০টি গবেষণা করলে দুয়েকটা সফল হয়। কিন্তু গবেষণা বন্ধ করলে চলে না। কাজুবাদামের যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, সেটির সফলতা পেতে মাঠপর্যায়ে উৎপাদনে যেতে হবে। এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। সরকার নীতিগত সহায়তা দিতে সবসময় প্রস্তুত রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত কোনো প্রকল্প পাঠানো হলে তা বিবেচনা করা হবে।

সভা শেষে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, আমরা ধান, মাছ, আলু চাষে সফলতা দেখিয়েছি। নিজেদের চাহিদা মিটে এখন উদ্বৃত্ত থাকে। সরকার এখন কৃষি ব্যবস্থাকে বহুমুখীকরণ করতে চায়। এজন্য উচ্চমূল্যের ফসল আবাদে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। উচ্চমূল্যের ফসলের মধ্যে কাজুবাদাম অত্যন্ত পুষ্টিকর ও মজাদার। এটি উৎকৃষ্ট শিশুখাদ্যও বটে, যার চাহিদা সারা বিশ্বে দিনদিন বাড়ছে। আমরা বিদেশ থেকে ছয় হাজার উন্নত কাজুবাদামের চারা এনেছি, বীজও এসেছে। এগুলো চাষাবাদে সাতজন কৃষককে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণও দিয়ে আনা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমরা কৃষিযান্ত্রিকীকরণে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প নিতে যাচ্ছি। তখন বলা যাবে কতভাবে সরকার কৃষকদের সহযোগিতা দেয়। এছাড়া অন্যান্য কর্মকা- সম্পাদনে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আমরা এই ১০০ কোটি খরচ করতে পারলে বরাদ্দ ৪০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।

বৈঠকে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ বলেন, বিদেশে কাজুবাদামের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকলে অবশ্যই কাজে লাগানো উচিত।