ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব

মানুষ জন্মের পর থেকে যে ভাষায় কথা বলে, বড় হয়ে ওঠে, সেটাই তার মাতৃভাষা। এই ভাষায় কথা বলার অধিকার তার জন্মগত অধিকার, এটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এর সঙ্গে সে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হয়ে যায়। তাই ইসলাম মানুষের ভাষাকে বিভিন্নভাবে মর্যাদা ও গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা মানুষের মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে তার প্রেরিত প্রত্যেক নবী-রাসুলকে স্বজাতির ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন এবং এ ভাষাতেই কিতাবাদি নাজিল করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক রাসুলকে তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ -সুরা ইবরাহিম: ৪

ইসলাম মাতৃভাষা নিয়ে গর্ব করাকে অন্যায়, অন্যায্য ও অবৈধ কিছু মনে করে না। বরং হাদিসে বর্ণিত আছে, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মায়ের ভাষা আরবিতে কথা বলতে গর্ববোধ করতেন। তার মাতৃভাষা ছিল আরবি। এ কারণেই শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর শেষ কিতাব কোরআনে কারিম নাজিল হয়েছে আরবি ভাষায়। তিনি বলতেন, ‘আরবদের মধ্যে আমার ভাষা সর্বাধিক সুফলিত। তোমাদের চাইতেও আমার ভাষা অধিকতর মার্জিত ও সুফলিত।’ -আল মুজাম: ৫/৩৫৫

এর কারণ নবী করিম (সা.) নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘আরবের সবচেয়ে মার্জিত ভাষার অধিকারী সাদিয়া গোত্রে আমি মানুষ হয়েছি। তাদেরই কোলে আমার মুখ ফুটেছে। তাই আমি সর্বাধিক সুফলিত ভাষা ব্যক্ত করেছি। কাজেই মাতৃভাষা নিয়ে গর্ব করা যায়। আমরা জানি, কোরআনে কারিম মূলত ভাষা ও উচ্চারণ রীতিকে প্রাধান্য দিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু ইসলাম ভাষাগত আঞ্চলিকতা তথা মাতৃভাষার প্রতি এত গুরুত্ব দিয়েছে যে, কোরআন আরবের বিভিন্ন পঠনরীতিতে পাঠ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ জন্য কোরআন পাঠ সাত কিরাত (পঠনরীতি) প্রচলিত আছে। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুল (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই কোরআন সাত হরফে বা উপভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব, এসব ভাষার মধ্যে যে ভাষাটি (তোমাদের কাছে) সহজ হয়, সে ভাষাতেই তোমরা তা পাঠ করো।’ -সহিহ বোখারি: ৪৭৫৪

জগতের সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ, মাতৃভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়। বস্তুত ভাষার ব্যবহার মুখে বলা বা কলমে লেখা দু’ভাবে হয়ে থাকে। মাতৃভাষা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে এক অসাধারণ নিয়ামত। মানবজাতি দু’ভাবেই ভাষা প্রয়োগের ক্ষমতা পেয়েছে। তাই মাতৃভাষার গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম। আর এ ক্ষমতাই মানুষকে অন্যসব প্রাণী থেকে পৃথক ও বৈশিষ্ট্যম-িত করেছে। আল্লাহতায়ালার সব নিয়ামতের সঙ্গে মাতৃভাষার কদর করার কথা বলেছেন। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, ‘দয়াময় আল্লাহ, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন, তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিক্ষা দিয়েছেন ‘বয়ান’ বা ভাব প্রকাশের ক্ষমতা তথা প্রত্যেকের মাতৃভাষা।’ -সুরা আর রাহমান: ১-৪পৃথিবীর বৈচিত্র্য আল্লাহতায়ালার অসীম কুদরতের নিদর্শন। পৃথিবীর মানুষ, প্রকৃতি ও অন্য সব সৃষ্টির বৈচিত্র্যের মতো মানুষের ভাষার বৈচিত্র্য অন্যতম নিদর্শন। ভাষা বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে প্রায় ছয় হাজারের অধিক ভাষা রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে প্রচুর আঞ্চলিক কথ্য ভাষা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তার নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশম-লী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।’ -সুরা রুম: ২২

এ আয়াতের আলোকে বলা চলে, পৃথিবীর সব মানুষ যেমন আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি; তেমনি ভাষাও আল্লাহর সৃষ্টি। নবী করিম (সা.) ছিলেন আরবের সবচেয়ে সুন্দর ও শুদ্ধভাষী। তিনি কোনোদিন একটি অশুদ্ধ শব্দ ও বাক্য উচ্চারণ করেননি। নবী করিম (সা.) ভাষার বিকৃতি কিংবা কারও নামের বিকৃতি নিষেধ করেছেন। ইসলাম ভাষার বিকৃতিকে সমর্থন করে না। ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্চারণ বিকৃতি বা ব্যঙ্গ মারাত্মক অন্যায়। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। তাই নবী করিম (সা.)-এর আদর্শ অনুসারে আমাদেরও উচিত মাতৃভাষা চর্চায় মনোযোগী হওয়া। আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে মানুষের হেদায়েতে যেসব নবী-রাসুল দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন, তাদের প্রত্যেককে স্ব-জাতির ভাষায় পাঠিয়েছেন। তাই ইসলাম মনে করে, ইসলামের মূলনীতির ভিত্তিতে বিশ্বের সবদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী তার মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদা ও গুরত্ব দেবে। মাতৃভাষায় অন্যসব জ্ঞানের মতো ইসলামি জ্ঞানের চর্চা করবে এবং মাতৃভাষায় ইসলামি সাহিত্যকর্ম সমৃদ্ধ করবে। ভাষার স্বকীয়তা রক্ষার পাশাপাশি ভাষার উৎকর্ষ সাধনে আত্মনিয়োগ করবে। মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে নিজ নিজ ভাষার ব্যবহার দ্বারা ইসলাম প্রচার ও ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতন হবে। মনে রাখতে হবে,

মাতৃভাষা একটি দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে অনেকাংশে জড়িত। এটা আল্লাহর দান বিশেষ। ইসলামে এর মর্যাদা তুলনাহীন। সেভাবেই ভাষা রক্ষা করতে হবে, নিজ নিজ ভাষা কীভাবে উন্নত ও সমৃদ্ধ হয় সেভাবে কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে।

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক