ঢাকার মেয়র-কাউন্সিলরদের শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

মশা যেন ভোট খেয়ে না ফেলে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ডেঙ্গু রোগ সৃষ্টিকারী এডিস মশা নির্মূলে আগাম কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণের নবনির্বাচিত মেয়র এবং কাউন্সিলরদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু একটি সমস্যা আকারেই দেখা দিয়েছে। কাজেই এখন থেকেই নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’ বাসস।

শেখ হাসিনা গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তার তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। তিনি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ওষুধের কার্যকর প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘মশা আপনার ভোট যেন খেয়ে না ফেলে সেটা নিশ্চয়ই আপনাকে দেখতে হবে। মশা ক্ষুদ্র হলেও অনেক শক্তিশালী। এটা মাথায় রাখতে হবে।’

শেখ হাসিনা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, ‘দেশের সার্বিক উন্নয়ন করতে হলে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। যেকোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির জীবনে সবচেয়ে প্রয়োজন জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা। কাজেই সেই আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেই স্ব-স্ব দায়িত্ব আপনারা পালন করবেন, সেটাই আমরা চাই।’ শেখ হাসিনা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য জনপ্রতিনিধিদের মনিটরিং জোরদার করার পাশাপাশি সরকারও এটি পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেবে বলে জানান।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কার্যালয়ের শাপলা হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলামকে শপথবাক্য পাঠ করান। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম একই স্থানে দুই সিটি করপোরেশনের সাধারণ ওয়ার্ড ও সংরক্ষিত আসনের নির্বাচিত ১৭২ কাউন্সিলরকে শপথবাক্য পাঠ করান।

১ ফেব্রুয়ারি ডিএসসিসি ও ডিএনসিসির নির্বাচন হয়। নির্বাচনে নগরবাসী পাঁচ বছরের জন্য আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে ডিএসসিসির ও আতিকুল ইসলামকে ডিএনসিসির মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করেছে। পাশাপাশি ডিএসসিসির ১শ’ কাউন্সিলরের মধ্যে ৭৫ জন সাধারণ এবং সংরক্ষিত আসন থেকে ২৫ জন মহিলা কাউন্সিলর এবং ডিএনসিসিতে ৭২ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ৫৪ জন সাধারণ ও সংরক্ষিত আসন থেকে ১৮ জন মহিলা কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। তবে নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মে মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, বর্তমান মেয়র ও কাউন্সিলরদের মেয়াদ ডিএসসিসিতে ১৭ মে এবং ডিএনসিসিতে ১৩ মে শেষ হবে।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম এবং নবনিযুক্ত দুই মেয়র এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দিনরাত পরিশ্রম করে দেশের উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন করি এবং এর জন্য বাজেট দিই। এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না সেটা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি। সেটা নিবিড়ভাবে আমরা পর্যবেক্ষণ করব।’ শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আপনারা যারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রয়েছেন তাদের কাছে আমার এই অনুরোধটাই থাকবেÑএকটা কথা মনে রাখবেন যে, জনগণ আপনাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। জনগণের কাছে আপনারা অঙ্গীকারবদ্ধ।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা যে শপথ নিয়েছেন সেই শপথের কথা মনে রেখে আপনাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে যারা আপনাকে ভোট দিয়েছে এবং যারা দেয়নি অর্থাৎ এলাকাবাসী, সবার সুযোগ-সুবিধা আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে।’

বহুদলীয় গণতন্ত্রে জনগণের ইচ্ছেমতো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থাকায় জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিলেও যিনি নির্বাচিত হবেন তিনি সবার জন্যই নির্বাচিত। এটা মনে রাখতে হবে এবং সার্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে। এটাই রাজনীতির নিয়ম বলেও তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, তার সরকার অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। অনেক প্রকল্প গ্রহণ করেছে। কাজেই সেগুলোর যেন যথাযথ বাস্তবায়ন হয় সেদিকে আপনারা দৃষ্টি দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী ভাষণে করোনাভাইরাস প্রসঙ্গে তার সরকারের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার তথ্য জানিয়ে এর সংক্রমণ রোধে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপেরও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস থেকে বাংলাদেশকে কীভাবে মুক্ত রাখা যায় সেজন্য যথাযথ পদক্ষেপ আমরা নিচ্ছি। একটি হাসপাতাল আমরা আলাদাভাবে করে দিচ্ছি এবং সেখানে ডাক্তার, নার্সসহ যারা সেবা দেবে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, পোশাক ঠিক করা এবং তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও করছি।’ পাশাপাশি সরকারের তরফ থেকে যে নির্দেশনা যাচ্ছে সেসব নির্দেশনাও তিনি সবাইকে মেনে চলার আহ্বান জানান। এ সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা পুনরায় কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘আমি চাই যেন কোনো ধরনের দুর্নীতি না হয়। কোনোরকম অনিয়ম না হয়।’ তিনি দৃঢতার সঙ্গে বলেন, ‘যদিও অনিয়ম-দুর্নীতি হয়, সে যেই হোক না কেন আমি তাকে ছাড়ব না, কাউকে ছাড়া হবে না।’ শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত এবং সেই স্বল্পতম সময়ের মধ্যে যেসব কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা সম্পন্ন করতে চান।

তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘কেউ যদি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে বা কোনোরকম দুর্নীতি করে বা নয়ছয় করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পুনরুল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। সমাজের এই ক্ষতগুলো থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হবে। এর প্রভাবে আপনাদেরই সন্তান, ছেলেপুলে বা বংশধররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘তরুণ ও যুব সমাজকে এই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে তাদের মেধা, মনন এবং যোগ্যতাকে আমরা দেশের কাজে লাগাতে চাই।’

প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের একটানা দেশ পরিচালনায় দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশের উন্নয়নে সার্বিক গতি এসেছে। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের উন্নয়ন এখন বিস্ময় এবং আমি বিদেশে গেলে বিভিন্ন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের একটাই প্রশ্ন থাকে যে, এত দ্রুত উন্নয়নটা কী করে করলেন?’

বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব চলতে থাকার সময় দেশের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করলেও এর প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে তার সরকার পড়তে দেয়নি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশকে আর আগের মতো কারও কাছে হাত পেতে চলতে হয় না। উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখায় ইতিমধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা যে স্বীকৃতি পেয়েছি তা বলবৎ থাকবে।