বন্দিরা মুক্ত যেসব জেলখানায়

জেলখানা মানেই ছোট ছোট ঘর। দিনের আলো হোক অথবা রাতের অন্ধকার, বন্দিদের পুরো সময় কাটে সেই অন্ধকার ঘরে। জেলখানার সাধারণ চিত্রটা এমন হলেও বিশ্বের কিছু জেলখানা আছে, যেখানে কয়েদিরা জীবন কাটায় নিজেদের মতো করে। এমন কিছু ব্যতিক্রমী জেলখানা নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা 

বাস্টোয়ি দ্বীপের জেলখানা

জেলখানা মানেই কি খুপরির মতো ঘরে দমবন্ধ হয়ে শাস্তি ভোগ করা? শাস্তি মানে কি শুধুই নিঃসঙ্গ অবস্থায় তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়া? নরওয়ের বাস্টোয়ি দ্বীপের জেলখানার কয়েদিদের কাছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ‘না’। শাস্তি পেলে তবেই এই জেলখানায় আসতে হয়, কিন্তু এখানে কয়েদিদের সাধারণ মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। নরওয়ের রাজধানী থেকে ৪৬ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অসলো ফোর্ড উপকূলে এই দ্বীপের অবস্থান। ভাবছেন, দ্বীপের মধ্যে জেলখানা হলে সেটি কেমন হবে? মজার বিষয় হচ্ছে, এই জায়গাটিকে দেখে মোটেও জেলখানা মনে হয় না। কারণ এখানে লোহার গরাদ লাগানো ছোট ছোট বদ্ধ ঘর নেই। পুরোটাই খোলা মাঠের মতো। এখানে খামার আছে। কয়েদিরা সেখানে কাজ করতে পারে। সুযোগ আছে পশু পালনেরও। কয়েদিদের নিজেদের জন্য আছে আলাদা ঘর। সেখানে আছে বিছানা, চেয়ার, টেবিল ও বাথরুম। কয়েদিরা যে ঘরে থাকে তার চাবি তাদের নিজেদের কাছেই থাকে। জেলখানায় সুবিধা আছে টেলিভিশন, কম্পিউটার ব্যবহার করারও। এ কারণে বাইরের দুনিয়া থেকে তাদের একদম আলাদাও থাকতে হয় না। এই জেলখানার সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এখানকার বিচার পদ্ধতি। যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো অপরাধ করেই এখানে কয়েদি হয়ে আসুক না কেন, তার জন্য যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই। নির্দিষ্ট সময় পার করে সবাই ফিরে যেতে পারে নিজ নিজ বাড়িতে। তাহলে তাদের এই জেলখানায় কী করতে হয়? এখানে সবাইকেই কোনো না কোনো কাজ করতে হয়। এই জায়গা থেকে বের হয়ে যেন আবার কোনো অপরাধ না করে, সেজন্য নিয়মিত তাদের নানা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। এখানে জেল হওয়াটা এক ধরনের ছুটি কাটানোর মতো।

এই দ্বীপের কয়েদিদের একসঙ্গে থাকাকে বলা হয় ‘পড’ (রেশমগুটি)। অর্থাৎ এখানে সবাই পড সমাজের অধিবাসী। কয়েদিদের বিশ্বাস করে নানা দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে নিজেদের ভুল শোধরানোর জন্য তারাও উদগ্রীব হয়ে থাকে। মাত্র পাঁচ কোটি জনসংখ্যার নরওয়েতে চার হাজরের মতো কয়েদি আছে। এদের মধ্যে প্রায় সবাই শাস্তি ভোগ করে একসময় না একসময় বাড়ি চলে যায়। জেলখানা অর্থ যদি মানুষকে সঠিক রাস্তায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়, তাহলে বিশ্বের সব দেশেই এমন জেলখানা হওয়া উচিত!

সান পেড্রো জেল

বিলভিয়ার লা পেজের ঠিক পাশেই সান পেড্রো জেলখানার অবস্থান। জেলখানাটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পায় ২০০৩ সালে। সে বছর রাস্টি ইয়ং নামে অস্ট্রেলিয়ার আইনের ছাত্র ‘মার্চিং পাউডার : এ ট্রু স্টোরি অব ফ্রেন্ডশিপ, কোকেইন অ্যান্ড সাউথ আমেরিকাস স্ট্রেঞ্জেস্ট জেল’ নামে একটি বই লেখেন। বইটি পাঠকদের মধ্যে বিপুল সাড়া ফেলে। সে বছরই দেশটির সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকায় চলে আসে এ বই। বইয়ের গল্প পড়ে পাঠক বিস্মিত হয়েছিল একটি জেলখানার ভেতর কীভাবে এত দুর্নীতি হয়, তা জেনে।এই জেলখানাটি চলে সম্পূর্ণ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে। এখানে পুলিশ আছে, তবে একদম নামকাওয়াস্তে বলতে যা বোঝায় ঠিক সেভাবেই। কোনো কয়েদি যেন পালিয়ে না যায় শুধু সেটুকুই পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব তাদের।

৬০০ জন কয়েদির জন্য নির্মিত এই কারাগারে থাকে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি কয়েদি। তবে তারা সবাই যে এখানে থাকার জন্য রাষ্ট্র থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত এমন নয়, বরং অনেকে স্বেচ্ছায় থাকছে এই জেলখানায়। কারণ অন্যান্য জায়গার চেয়ে এখানে আয়ের সুবিধা বেশি। সান পেড্রোকে আসলে জেলখানা না বলে শহর বললেই ভালো শোনায়। এখানে আছে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, দোকান, শেফ, সিকিউরিটি গার্ড, রাজনীতিবিদ, এমনকি বাড়ি কেনাবেচা করার দালালও। কয়েক বছর আগে, কেউ বেড়াতে যেতে চাইলে গাইডের মাধ্যমে সেই সুযোগও দেওয়া হতো। এদের অনেকেই রাতে কোকেন নিতে আসত। স্বাধীন বিশ্বের অন্যান্য নাগরিকের মতো, এই জেলে ধনী-গরিব বিভাজন আছে। গরিবদের এক রুমে থাকতে হয় পাঁচজনকে, ধনীদের জন্য আছে বিলাসবহুল থাকার ব্যবস্থা। ধনীদের মধ্যে বেশির ভাগই ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ আর পাচারকারী। তাদের সবার বাড়িতে টেলিভিশন, ওয়াইফাই এমনকি ছোটখাটো সুইমিং পুলও আছে।

এখানে থাকার জন্য জায়গা পাওয়া বিস্ময়করভাবে সহজ। যদি জেলখানার কোনো সেল খালি থাকে, তবে সেগুলো ভাড়া দেওয়ার জন্য লিফলেট দেওয়া হয়। জেলখানার মেয়র অথবা দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করে খুব সহজে সেল নিয়ে নেওয়া যায়। নানা ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ যেমন সিকিউরিটি, ক্লিনিং, নতুন করে তৈরি করা, এমনকি যেকোনো অনুষ্ঠানের জন্য ট্যাক্সও দিতে হয়। দামাদামিতে মিলে গেলে অফিশিয়াল কাগজপত্রে স্বাক্ষরের মাধ্যমে সহজেই সেল পাওয়া যায়। জায়গার ভিত্তিতে দাম হয় ২০ ডলার থেকে ৫ হাজার ডলারের মধ্যে। চাইলে নিজের নামে বরাদ্দ নিয়ে অন্যকেও ভাড়া দিয়ে আয় করা যায়।

জেলখানায় সুগঠিত একটি সিস্টেম আছে। বাড়িঘর, সিকিউরিটি, শাস্তি ও স্যানিটেশন-জাতীয় প্রতিটি বিভাগ দেখাশোনা করার জন্য আছে আলাদা জনবল। তাদের বেতন দেওয়া হয় বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা ফি আর ট্যাক্স থেকে। জেলখানার মেয়র নির্বাচিত হন সব বাসিন্দার ভোটের মাধ্যমে।

পুলিশের কম অনুপস্থিতির কারণে এই জেলখানায় কোকেনের অবাধ আনাগোনা আছে। তবে এই আনাগোনা শুধু জেলখানা কমপ্লেক্সের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। এখানে যারা থাকে সবাই কমবেশি কোকেনে আসক্ত।

যদি কোনো কয়েদি একা থাকতে না চায়, তবে স্ত্রী ও সন্তানদেরও এখানে নিয়ে আসার অনুমতি রয়েছে। শিশুদের সপ্তাহে এক দিন বাইরে গিয়ে স্কুলে ক্লাস করার অনুমতি মেলে। নারী নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে এখানে। বলিভিয়ার সরকার অনেক দিন ধরেই জেলখানাটি নিয়ে ভাবছে। জেলের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা পদক্ষেপ নিয়েছে তারা।

সান আন্তোনিও জেল

সান আন্তোনিও জেলের অবস্থান ভেনেজুয়েলার মার্গারিটা দ্বীপে। এই জেলখানায় কয়েদিদের রয়েছে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ। তারা নিজেদের খাবার নিজেরাই রান্না করে, টেলিভিশন দেখার অনুমতি আছে। গতানুগতিক জেলখানার বাইরে সান আন্তোনিও জেলখানায় আছে নিজের পছন্দমতো কাজ বাছাই করে নেওয়ার সুযোগ। অনেকেই জুতো সেলাই করে, কেউবা করে মাদক চোরাচালানের কাজ। জেলখানার কয়েদিদের মধ্যে বাজি ধরে মোরগ লড়াই হয়। এ খেলা তদারকের জন্যও দল বাছাই করা থাকে। এ জেলখানায় ভেনেজুয়েলার স্থানীয় এবং বিদেশি অপরাধী মিলে প্রায় দুই হাজারের বেশি কয়েদি আছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাদক চোরাচালানের জন্য আটক কয়েদিদের এখানে নিয়ে আসা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও আশপাশের দ্বীপে মাদক পাচারের জন্য মার্গারিটা দ্বীপকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। মাদক পাচার করে যারা আটক হয়, তাদের সবাইকে আগে সান আন্তোনিও জেলখানায় নিয়ে আসা হয়।

নারী ও পুরুষ কয়েদিদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন জায়গা আছে। জেলখানায় মোট চারটি সুইমিং পুল আছে। সুইমিং পুলে সবাই সময় কাটাতে পারে। কয়েদিরা অর্থের বিনিময়ে যেভাবে চায় নিজেদের সেলকে সাজাতে পারে। অনেকেরই নিজস্ব টেলিভিশন, এসি আছে। অনেক কয়েদির কাছে অস্ত্রও আছে। ভেনেজুয়েলার এই জেলখানায় পুলিশি নজরদারি কিছুটা কম থাকায় বাইরে থেকে অপরাধী আটক হয়ে এখানে এলে নতুন করে অপরাধে জড়িয়ে যায়। এমনিতে মার্গারিটা দ্বীপ নিরিবিলি হলেও ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন স্থানে অপরাধ সংগঠনের জন্য এই জেলখানাকে দায়ী করা হয়।

ফোরটেজ্জা মেডিচা জেল

ইতালির তুসকানিতে ভোলটেরা নামক এলাকায় ফোরটেজ্জা মেডিচা জেলটি অবস্থিত। এই জেলে বর্তমানে কয়েদি সংখ্যা প্রায় ১৫০ জন। মধ্যযুগে নির্মিত এই জেলে যে কয়েদিরা বাস করে তারা ভয়ংকর আসামি। অপরাধের সাজা ভোগ করতে তারা এই জেলখানায় আসে ঠিকই, তবে অন্যান্য জেলখানার কয়েদির চেয়ে তাদের চিন্তাধারা একদম ভিন্ন। কারণ তাদের সবাইকে সব সময় কী খাবার রান্না হবে, কীভাবে হবে, তার স্বাদ কেমন হবে এসব নিয়ে ভাবতে হয়। কয়েদি হলেও তাদের ওপর বেশ বড় একটি দায়িত্ব ন্যস্ত করা আছে। সেটি হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম বিশেষ একটি রেস্টুরেন্ট ফোরটেজ্জা মেডিচাতে আসা অতিথিদের জন্য খাবার তৈরি করা। সেই রেস্টুরেন্টের খাবার রান্না থেকে পরিবেশনের সব কাজ করে জেলখানার কয়েদিরাই। এই কয়েদিদের মধ্যে বিভিন্ন অপরাধ করা সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে খুনি পর্যন্ত আছে।

যে কেউ চাইলে রেস্টুরেন্টটি ঘুরে আসতে পারেন। অপরাধীরা আক্রমণ করে বসবে এই ভয়ে যদি সেখানে না যেতে চান, তবে ভয় কাটিয়ে সেখানে যেতে পারেন নিশ্চিন্তে। কারণ কয়েদিরা যেন নিজেদের ভেতর কোনো ধরনের সমস্যা তৈরি করতে না পারে অথবা আগত কোনো অতিথিকে আঘাত করতে না পারে, সেজন্য তাদের ওপর কড়া নজর রাখা হয়। এ ছাড়া রেস্টুরেন্টে কাচের কোনো জিনিস খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেখানে পরিবেশিত প্রতিটি জিনিসই প্লাস্টিকের। কাচের চেয়ে প্লাস্টিকের আঘাত নিশ্চয়ই কম!

সেবু প্রভিন্সিয়াল ডিটেনশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার

২০০৭ সাল। ফিলিপাইনের সেবু সিটির একটি জেলখানায় একসঙ্গে ১৫০০ কয়েদি মিলে নেচেছিল মাইকেল জ্যাকসনের ‘থ্রিলার’ গানের সঙ্গে। নাচের এই গল্পটি সেবু প্রভিন্সিয়াল ডিটেনশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের। যেখানে কয়েদিদের জীবন কাটে এক ধরনের নির্বাসনে, সেখানে সেবু রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারটি একদম আলাদা। সেই নাচের ভিডিওটি বিপুল সাড়া ফেলে দর্শকের মধ্যে। ভিডিওটি এখন পর্যন্ত দেখা হয়েছে পাঁচ কোটিবারেরও বেশি। সে সময় এই ভিডিওটিকে জায়গা করে নেয় সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হওয়া ভিডিওর তালিকায়। কয়েদিরা সবাই মিলে শরীর চর্চার বদলে নাচের চর্চা করে। এই জেলের কয়েদিদের কাছে নাচ ও গান দারুণ ভালো লাগার একটি বিষয়। তাদের নাচের প্রতি এই ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে ২০১০ সালে জ্যাকসনের দীর্ঘদিনের নাচের দুজন কোরিওগ্রাফার এবং বিশ্বস্ত নাচের সঙ্গী সেবুতে কয়েদিদের সঙ্গে দেখা করতে চলে যান। সেখানে হাজারেরও বেশি কয়েদিকে শেখান ‘দিস ইজ ইট’ গানের সঙ্গে নাচতে। কয়েদিদের সঙ্গে বেশ ভালো সময় কাটান তারা। জেলখানার পরিচিত গল্পের সঙ্গে এমন গল্পের কোনো মিলই নেই। এখানে কয়েদিরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বা মারামারি না করে একত্র হয়ে নাচ শেখে। এটি ব্যতিক্রমী একটি ঘটনাই বটে।