ইতিহাসের কথা শুরু হয় স্থান-কাল-পাত্রের আলোচনা দিয়ে। কখনো কখনো কোনো একটা স্থান ইতিহাসের অনন্য সব সাক্ষ্য বহন করে হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক। বাংলাদেশের ভূগোলে ইতিহাসের এমনই এক অনন্য স্থান রাজধানী ঢাকার এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা সাবেক রেসকোর্স ময়দান। কয়েকশ বছরের পরিক্রমায় এই ময়দান এবং তৎসংলগ্ন এলাকা বাঙালি জাতির জীবনের মহত্তম বহু ঘটনার আধার হয়ে আছে। যার কিছু আমাদের চোখের সামনে থাকলেও কিছু চাপা পড়ে থাকে ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু দুনিয়ার ইতিহাসে এমন ময়দান আর কোথায়, যেখানে একটি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের এতসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাতই মার্চের অবিস্মরণীয় ভাষণ দিয়েছিলেন এই রেসকোর্স ময়দানে। সাতই মার্চের এই মহাকাব্য কেবল বাঙালি জাতিরই নয়, দুনিয়ার মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অনন্য ঘটনা হিসেবে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ বা বিশ্ব ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক দলিলের স্বীকৃতি পেয়েছে ইউনেস্কোর কাছ থেকে। নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দিনে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিলও স্বাক্ষরিত হয়েছিল এই রেসকোর্স ময়দানেই। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি কারামুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে বঙ্গবন্ধু আবারও জনতার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, অশ্রুসিক্ত নয়নে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন এই রেসকোর্স ময়দানেই। মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও সমাপ্তির দুই শীর্ষ বিন্দু সাতই মার্চ আর দশই জানুয়ারিতে জাতির ঐতিহাসিক মহাসম্মিলনই নয়, স্বাধীনতার আগে আরও দুই ঐতিহাসিক ঘটনাও ঘটেছে রেসকোর্স ময়দানেই। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাগার থেকে মুক্তির পর ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত লাখো জনতার সংবর্ধনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল এই রেসকোর্স ময়দানেই। সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্যরা প্রকাশ্য জনসভায় শপথ গ্রহণ করেছিলেন এই রেসকোর্স ময়দানেই।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে রেসকোর্স ময়দানের এমন নিবিড় সংশ্লিষ্টতার কথা সবারই জানা। কিন্তু বস্তুতপক্ষে কয়েক শত বছরের প্রাচীন মহানগর ঢাকার এই ময়দান আর সংলগ্ন এলাকা বাঙালি জাতির রাজনীতি ও সংস্কৃতির আরও সুদূর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পলাশীর প্রান্তরে ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে লড়াইয়ে পরাস্ত হওয়ার পরপর যে ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল ঢাকা। ১৭৬০ সালে শুরু হওয়া ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে কেবল বাংলা নয় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে বিবেচনা করেন ইতিহাসবিদদের অনেকেই। রেসকোর্স ময়দান সংলগ্ন বর্তমান কালী মন্দিরের স্থলে সেকালের আখড়ার সন্ন্যাসীরা ঢাকায় কোম্পানির কুঠি ও ট্রেজারি লুট করেছিল বলে সাক্ষ্য পাওয়া যায়। পরিণতিতে ওই আখড়া উচ্ছেদ করেছিল কোম্পানির সেনারা।
ঢাকার ঐতিহাসিক এই ভূগোলে রেসকোর্স বা ঘোড়দৌড় ময়দানটি বানানো হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮২৫ সালে। সেটা ঢাকার ইতিহাসের এক বিয়োগান্ত অধ্যায়। পলাশীর যুদ্ধের পর কোম্পানির লুটপাট ও অত্যাচারে ঢাকা প্রায় পরিত্যক্ত ও জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়েছিল। এরপর এই এলাকায় সেকালের বহু প্রাচীন সমাধি ও অন্যান্য স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে জঙ্গল সাফ করে রেসকোর্সসহ সেনানিবাস স্থাপন করে ব্রিটিশরা। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকার পরিকল্পিত রাজধানী কমপ্লেক্স বা নগরকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয় এই ভূগোলেই। এর আগে ১৮৭৫ সালে ঢাকার জমিদারপুত্র খাজা আব্দুল গণি ঢাকার নবাব হওয়ার পর তিনিও শাহবাগে বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন। ১৯০৬ সালে ওই বাগানবাড়িতে এক সম্মেলনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ। এদিকে, ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায়। আর পরিত্যক্ত এই রাজধানী কমপ্লেক্সের সব স্থাপনা নিয়েই ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পাদপীঠও ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা এই এলাকা।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামানুসারে রমনা রেসকোর্স ময়দানের নাম রাখা হয় ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান’। ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের মিত্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ঢাকায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল এই ময়দানেই। ১৯৯৬ সলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পূর্তির উৎসবে আমন্ত্রিত অতিথি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ও ফিলিস্তিন মুক্তিসংগ্রামের নেতা ইয়াসির আরাফাতও বক্তব্য রেখেছেন এই ঐতিহাসিক ময়দানেই। ১৯৯৯ সালে এখানে স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মারক হিসেবে ‘শিখা চিরন্তন’ স্থাপন করা হয় এবং স্বাধীনতা জাদুঘর ও স্বাধীনতা স্তম্ভের কাজ শুরু হয়। ইতিহাসের পরিক্রমায় আমরা আজ আরেকটি সাতই মার্চে উপনীত হয়েছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর প্রাক্কালে এবারের সাতই মার্চে দাঁড়িয়ে তাই বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক ময়দান, বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ময়দানের স্মৃতিকথায় বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাসের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।