পালিয়ে যাওয়া স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই ব্রিটিশ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন দুবাইয়ের শাসক ও আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম। পরে তার বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ আনেন স্ত্রী। গত ৫ মার্চ এক রায়ে শেখ মোহাম্মদের বিরুদ্ধে নিজ কন্যাদের অপহরণ, জোরজবরদস্তি এবং স্ত্রীকে প্রাণে মেরে ফেলার লাগাতার হুমকিসহ বিভিন্ন অভিযোগ সত্য বলে অভিহিত করেছে ব্রিটিশ হাইকোর্ট। লিখেছেন পরাগ মাঝি
যেভাবে ব্রিটিশ আদালতে গড়াল
আট মাস আগে ব্রিটিশ হাইকোর্টে এই ‘হাইপ্রোফাইল’ মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। সে সময় দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদের স্ত্রী প্রিন্সেস হায়া বিনতে আল হুসেন রাজপ্রাসাদ থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন দুই সন্তানকে। সে সময় জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
পালিয়ে যাওয়া স্ত্রীকে আবার প্রাসাদে ফিরিয়ে নিতেই ব্রিটিশ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন দুবাই শাসক। পরে তার বিরুদ্ধে নিপীড়ন ও দুই সন্তানের অভিভাবকত্বের আদেশ চেয়ে লন্ডনের একটি আদালতে আবেদন করেন প্রিন্সেস হায়া।
শেখ মোহাম্মদের সঙ্গে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা প্রিন্সেস হায়ার বিয়ে হয়েছিল ২০০৪ সালে। তিনি জর্দানের বাদশাহ আবদুল্লাহর সৎবোন এবং শেখ মোহাম্মদের ষষ্ঠ ও কনিষ্ঠ স্ত্রী। ১৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টেনে প্রাসাদ ছেড়ে তার পালিয়ে যাওয়ার খবরটি প্রথম দিকে ধোঁয়াশার মতো ছিল। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই জনসম্মুখে দেখা যাচ্ছিল না তাকে। তবে এ ধোঁয়াশা কেটে যায় দুবাই শাসকের একটি কবিতার সূত্র ধরে। নিজের ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচ- ক্ষোভ মেশানো কবিতাটি পোস্ট করেন শেখ মোহাম্মদ। কবিতাটির শিরোনাম ছিল ‘তুমি মরো কিংবা বাঁচো’। কবিতার শুরুর লাইন দুটিতে তিনি লেখেন, ‘কিছু কিছু ভুল, বিশ্বাসঘাতকতার শামিল/ তুমি এই সীমা লঙ্ঘন করে বিশ্বাসঘাতকতাই করেছ।’ অন্য আরেকটি লাইনে লেখেন, ‘বহুমূল্যের বিশ্বাসের সঙ্গে তুমি প্রতারণা করেছ/ তুমি তোমার খেলা আর নিজের চরিত্র দেখিয়েছ।’ সরাসরি নিজের স্ত্রীকে নির্দেশ না করলেও এটা বোঝা যাচ্ছিল যে, তিনি কোনো নারীকে উদ্দেশ্য করে কবিতাটি লিখেছেন। পরে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রিন্সেস হায়ার পালিয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।
সে সময় প্রিন্সেস হায়ার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দাবি করে, তিনি তার স্বামীর এক কন্যা শেখ লতিফার দুবাই থেকে পালিয়ে আবার রহস্যজনকভাবে ফিরে আসার পেছনের গোপন কিছু বিষয় জেনে গিয়েছিলেন। বিস্তৃত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও শুনানি শেষে ব্রিটিশ আদালত জানায়, তারা শেখ মোহাম্মদের বিরুদ্ধে দুই মেয়েকে অপহরণ ও জোর করে দুবাই ফিরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে।
কী হয়েছিল প্রিন্সেস লতিফার
দাবি করা হয়, প্রিন্সেস হায়ার পালিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল তার আগে দুবাইয়ের প্রাসাদ ছেড়ে প্রিন্সেস লতিফার পালিয়ে যাওয়া ও ফিরে আসার ঘটনাটি। লতিফা তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ও ফিনল্যান্ডের নাগরিক টিনা জুহাইনেনের সঙ্গে আরব আমিরাত ছেড়ে পালিয়েছিলেন। পালানোর সময় টিনার গাড়িতে বসে তিনি একটি সেলফি তোলেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা হয়। দুবাই থেকে পালিয়ে এ সময় ওমানের দিকে যাচ্ছিলেন তারা।
পরিকল্পনা ছিল, ওমানে গিয়ে এক ফরাসি গুপ্তচরের সঙ্গে তার ইয়টে চড়ে ভারতে যাবেন লতিফা। পরে সেখান থেকে প্লেনে চড়ে আমেরিকা গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করবেন। দুই বান্ধবী ভারতের খুব কাছাকাছি চলে গেলেও শেষ পর্যন্ত তাদের অভিযান সফল হয়নি। যাত্রাপথেই হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যান তারা।
শেখ মোহাম্মদ মাকতুমের ছয় স্ত্রীর মধ্যে আলজেরিয়ান নাগরিক হুরিয়া আহমেদ লামারার গর্ভে ১৯৮৫ সালে জন্ম নিয়েছিলেন লতিফা। মাকতুমের ২৩ সন্তানের মধ্যে হুরিয়ার ঘরে মোট চার সন্তান জন্মগ্রহণ করে, যাদের মধ্যে লতিফা তৃতীয়। তিনি দুবাইয়ের রাজকীয় প্রাসাদে বাস করতেন। প্রাসাদের ভেতরে ছিল সুইমিং পুল, স্পা, অ্যাথলেটিক কম্পাউন্ডসহ ভোগবিলাসের বিপুল আয়োজন। কিন্তু এসব রেখে কেন পালালেন লতিফা?
জানা যায়, ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা লতিফা ছিলেন একজন দক্ষ স্কাই ডাইভার। তাকে প্রায়ই দেখা যেত আরব আমিরাতের জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে প্লেন থেকে প্যারাশুট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার আগে রেকর্ড করে যাওয়া এক ভিডিওতে লতিফা দাবি করেন, এসবই ছিল লোক দেখানো স্টান্টবাজি। তিনি প্রায় ১৮ বছর ধরে কার্যত বন্দি হয়ে ছিলেন। তার এই বন্দিজীবন শুরু হয় তার বড় বোন শামসা ইংল্যান্ডের প্রাসাদ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে। শামসাকে ফিরিয়ে আনার দুই বছর পর ১৬ বছর বয়সে লতিফা প্রথমবারের মতো প্রাসাদ ছেড়ে পালানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। এরপর প্রায় তিন বছর তিনি সম্পূর্ণ বন্দি অবস্থায় ছিলেন। ২০১১ সালে লতিফা আবারও পালানোর পরিকল্পনা শুরু করেন। এ পরিকল্পনাকে সফল করতে আটঘাট বেঁধে নামেন তিনি। এজন্য প্রথমেই তিনি যোগাযোগ করেন ফরাসি নৌ কর্মকর্তা হার্ভে জুঁবের সঙ্গে। তিনি একসময় আরব আমিরাতে ব্যবসায়ী পরিচয়ে বসবাস করতেন। কিন্তু কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে আরব আমিরাত থেকে পালিয়ে যান। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় লতিফা জুঁবেকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হন যে, তিনি সত্যিই পালাতে চান। পরে জুঁবের পরামর্শে লতিফা পালানোর প্রস্তুতি হিসেবে প্রায় ৪ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ জোগাড় করেন।
২০১৪ সালে লতিফার পালানোর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হন ফিনল্যান্ডের নাগরিক টিনা জুহাইনেন। দুবাইয়ে মার্শাল আর্ট শেখাতে এসে তিনি হয়ে ওঠেন লতিফার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। টিনাই লতিফাকে সাঁতার, স্কুবা ডাইভিং, জেট স্কি চালনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন। অবশেষে ২০১৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঘনিয়ে আসে লতিফার পালিয়ে যাওয়া চূড়ান্ত মুহূর্ত। সেদিন টিনার সঙ্গে সকালের নাশতা করার জন্য পোশাক পরিবর্তন করে একটি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন দুজন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ওমানের বর্ডার পেরিয়ে জুঁবের ইয়টে গিয়ে ওঠেন। ইয়াট ছুটে চলছিল ভারতের দিকে। কিন্তু আরব আমিরাতের একটি হ্যাকার বাহিনী ফোন ট্র্যাক করে তাদের অবস্থান জেনে যায়। ৪ মার্চ ভারতের গোয়া সমুদ্রবন্দর থেকে ৩০ মাইল দূরে থাকা অবস্থায় ভারতীয় কোস্টগার্ড তাদের ঘিরে ফেলে এবং ইয়টকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই হেলিকপ্টারে করে সেখানে পৌঁছে বেশ কয়েকজন আমিরাতি সৈন্য। পরে ভারতীয় কোস্টগার্ডের সহায়তায় লতিফা, টিনা, জুঁবে এবং অন্য ক্রুদের ইয়টে করেই আমিরাতের ন্যাভাল বেইজ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাটি এতটাই গোপন ছিল যে, পাঁচ দিন পর ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মেইল তাদের অপহরণের সংবাদটি প্রকাশ করে।
বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম এ প্রসঙ্গে ধারাবাহিক অনুসন্ধান ও প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু করলে আরব আমিরাত কর্র্তৃপক্ষ একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রিন্সেস লতিফা এবং প্রিন্সেস শামসা দুজনই তাদের পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করছেন এবং তারা ভালো আছেন। আরও দাবি করা হয়, ফরাসি গোয়েন্দা হার্ভে জুঁবে এবং তার সহযোগীরা চক্রান্ত করে লতিফাকে অপহরণ করে ১০০ মিলিয়ন ডলার মুক্তিপণ দাবি করেছিল।
পরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য লতিফার সৎমা প্রিন্সেস হায়ার আমন্ত্রণে আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার সাবেক হাইকমিশনার ম্যারি রবিনসন দুবাই সফর করেন। সফর থেকে ফিরে রবিনসন দাবি করেন, প্রিন্সেস লতিফা মূলত মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। কিন্তু এখন তিনি নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠছেন। সে সময় আরব আমিরাত কর্র্তৃপক্ষ তিনটি ছবি প্রকাশ করে, যেখানে প্রিন্সেস লতিফাকে ম্যারি রবিনসনের পাশে ডাইনিং টেবিলে বসে থাকতে দেখা যায়। টেবিলে লতিফার মলিন মুখ গণমাধ্যমের নজর এড়ায়নি।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করে, লতিফাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অপহরণ করা হয়েছে। ওই ঘটনায় দুবাইয়ের ভাবমূর্তি রক্ষায় প্রিন্সেস হায়া তখন আইরিশ প্রেসিডেন্ট ম্যারি রবিনসনের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। এরপর প্রিন্সেস হায়া কিছু বিষয় সম্পর্কে জানতে পারেন। এ নিয়ে তার স্বামীর পরিবার থেকে চাপ আসতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেন।
শামসার ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল
দুই দশক আগের কথা। ২০০০ সালে প্রিন্সেস শামসা ছিলেন ১৯ বছরের তরুণী। সে বছরের আগস্টে যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ শহরের একটি রাস্তা থেকে নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ানের বরাত দিয়ে জানা গেছে, নিখোঁজ হওয়ার দিন দুই বন্ধুর সঙ্গে একটি বারে গিয়েছিলেন শামসা। পরে সেদিন সন্ধ্যায় ক্যামব্রিজের রাস্তা থেকে চারজন অস্ত্রধারী তাকে একটি গাড়িতে তুলে নেয় এবং ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরদিনই একটি প্রাইভেট বিমানে করে তাকে দুবাই নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ঘটনার আগের মাসে সারের লংক্রস এস্টেটে অবস্থিত দুবাই শাসক শেখ মোহাম্মদের মালিকানাধীন একটি বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন প্রিন্সেস শামসা। গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে সেখানে পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন তিনি। শেখ লতিফার মতো তিনিও দুবাই শাসকের আলজেরিয়ান স্ত্রী হুরিয়া আহমেদ লামারার গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন। সারে থেকে পালিয়ে তিনি দক্ষিণ লন্ডনের একটি হোস্টেলে গিয়ে ওঠেন এবং একজন অভিবাসন বিশেষজ্ঞের কাছে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার জন্য পরামর্শ চান। পরে তিনি ক্যামব্রিজে চলে যান। যেখান থেকে তাকে অপহরণ করা হয়।
অপহৃত হওয়ার কিছুদিন পরই লন্ডনের ওই অভিবাসন বিশেষজ্ঞের কাছে একটি ই-মেইল পাঠান শামসা। ই-মেইলে তিনি লেখেন, ‘আমাকে ধরে ফেলেছেন আমার বাবা। আমি যাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলাম তাদের কারো সাহায্য নিয়ে আমার অবস্থান জেনে গিয়েছিলেন তিনি।’
শামসা আরও লেখেন, ‘১৯ আগস্টে ক্যামব্রিজে আমি ধরা পড়ি। আমাকে ধরার জন্য চারজন আরবের মানুষ পাঠিয়েছিলেন বাবা। তাদের কাছে বন্দুক ছিল এবং আমাকে হুমকি দিচ্ছিল। পরে তারা আমাকে নিউ মার্কেটে অবস্থিত বাবার একটি বাড়িতে নিয়ে যায়। পরদিন ভোরে হেলিকপ্টারে করে আমাকে একটি বিমানের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এ বিমানই আমাকে দুবাই রেখে গেছে। আমি এখনো বন্দি।’
ই-মেইলে নিজের অপহরণের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রিন্সেস শামসা। ব্রিটিশ আদালতের এক বিবৃতি থেকে জানা গেছে, শামসার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নিয়ে ২০০০ সালে আগস্টের শেষের দিকে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তার বন্দিদশার কথা জানতে পেরে ব্রিটেনের পুলিশ দুবাইতে তদন্ত করতে চাইলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাতে অনুমতি দেয়নি।
নাবালিকা মেয়ের বিয়ে
প্রিন্সেস হায়ার গর্ভে জন্ম নেওয়া দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে রুলিং দিয়েছে লন্ডনে অবস্থিত ব্রিটিশ হাইকোর্ট। প্রিন্সেস হায়া দাবি করেন, শেখ মোহাম্মদ তার তখনকার ১১ বছর বয়সী কন্যাকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন এবং এ বিয়ে নিয়ে আলোচনা করতে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেখ পরিবারের এক সদস্য সৌদি সফরে গিয়েছিলেন। তবে যথেষ্ট প্রমাণ দিতে না পারায় এ দাবির কোনো আইনি ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছেন বিচারক অ্যান্ড্রু ম্যাকফারলে।
হায়া আরও দাবি করেন, শুরুর দিকে তিনি লতিফা ও শামসাকে নিয়ে শেখ মোহাম্মদের ভাষ্যই বিশ্বাস করেছিলেন। দুবাইয়ের শাসক তাকে বলেছিলেন, মেয়েদের উদ্ধার করা হয়েছে এবং তারা এখন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিরাপদেই আছে। কিন্তু ২০১৯ সালের শুরুর দিকে এ ভাষ্য নিয়ে সন্দিহান হয়ে ওঠেন তিনি এবং সতীনের দুই মেয়েকে নিয়ে তার উদ্বেগ ব্যক্ত করেন। ওই একই সময়ে তিনি নিজের ব্রিটিশ দেহরক্ষীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়েন।
হায়ার অভিযোগ, মেয়েদের নিয়ে উদ্বেগের কথা জানানোর পর থেকেই শেখ মোহাম্মদের লোকজন তাকে হুমকি দিতে শুরু করে। দুই দফায় তার বালিশে ‘সেফটি ক্যাচ’ খোলা পিস্তল পাওয়া যায়। বাড়ির বাইরের অংশে অবতরণ করা একটি হেলিকপ্টার থেকে তাকে দুর্গম মরুভূমিতে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যুক্তরাজ্যে পালিয়ে যান। এরপর থেকেই শেখ মোহাম্মদ তাকে ও তার দুই সন্তানকে অপহরণ ও জোর করে দুবাই নিয়ে যাওয়ার লাগাতার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে যুক্তরাজ্য আদালতের রায় যেন জনসমক্ষে প্রকাশ না হয়, সে চেষ্টা করেছিলেন ধনকুবের শেখ মোহাম্মদ। কিন্তু তার আপিল প্রত্যাখ্যাত হয়। জনস্বার্থে হওয়া এ মামলার রায়ে আদালত বলে, ‘দুবাইয়ের শাসক যে আদালতের প্রতি খোলামেলা ও সৎ নন, তা প্রমাণিত হয়েছে।’
রায় প্রকাশের পর এক বিবৃতিতে শেখ মোহাম্মদ বলেছেন, ‘সরকারপ্রধান হিসেবে আমি আদালতের তথ্য অনুসন্ধানী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারিনি। যে কারণে প্রকাশিত রায় একপেশে হয়েছে।’
দুবাইয়ের শাসক মামলাটিকে ‘একান্ত ব্যক্তিগত’ ব্যাপার বলেও আখ্যা দিয়েছেন এবং গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন তার সন্তানদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে এবং তাদের যুক্তরাজ্যের জীবনে অনুপ্রবেশ না করে।
ব্রিটিশ রানী এলিজাবেথের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা শেখ মোহাম্মদকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম উদার শাসক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্রের পাশাপাশি দুবাইকে এশিয়ার অন্যতম ব্যবসায়িক হাব বানানোর কৃতিত্বও দেওয়া হয় তাকে।