বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের গোলরক্ষক রুপনা চাকমা। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই পোস্টরে নিচে দেশের সেরা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজেকে। রাঙ্গামাটি থেকে উঠে আসা এই তারকার চলার পথটা অবশ্য সহজ ছিল না মোটেও। সহজ নয় এখনো। বিশ্ব নারী দিবসে দেশ রূপান্তর পাঠকদের জন্য রুপনার গল্প তুলে ধরছেন- তোফায়েল আহমেদ
বাবার মুখটা কখনো দেখা হয়নি রুপনা চাকমার। দেখবেন কি করে। তার জন্মের আগেই যে পৃথিবীর মায়া ছাড়েন গাজা মানি চাকমা। দুই ছেলে-দুই মেয়েকে নিয়ে মা কালা সোনা চামকার লড়াইয়ের জীবন। সেই জীবনে অবশ্য এখন চাঁদের আলোর মতো উজ্জ্বল সদ্য ১৬ পূরণ করা রুপনা।
জাতীয় দলে সেরা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশ-বিদেশে খেলছেন নিয়মিত। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পাচ্ছেন পুরস্কার। চলতি নারী ফুটবল লিগে খেলছেন সেরা ক্লাব বসুন্ধরা কিংসে। রুপনার এখন সোনার জীবন।
কিন্তু রুপনার এখনকার আলো-ঝলমল জীবনের মাঝে কতো সংগ্রামের গল্প! যে গল্পের প্রতিটি বাঁক থেকেই প্রেরণা নেওয়া যায়।
ছোট থেকেই খেলার প্রতি ঝোঁক ছিল রুপনার। সেই ঝোঁক থেকেই আসা ফুটবলে। রাঙ্গামাটি থেকে অনেক মেয়েই জাতীয় দলে খেলছেন। রুপনাকে যা অনুপ্রাণিত করতো। তার খেলার প্রতি নিবেদন নজর কেড়েছিল স্কুলের শিক্ষকদের। তাদের মাধ্যমেই বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আন্তঃপ্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে পা রাখা রুপনার। একই সঙ্গে শুরু উপরে ওঠার সিড়ি ভাঙা।
রুপনা জানান শুরু থেকেই গোলকিপিং পজিশনটা পছন্দ ছিল তার, ‘টিভিতে দেখতাম গোলকিপাররা কত সুন্দর করে বল ধরে...।’ তাই ফুটবলে তার শুরু গোলকিপার হিসেবেই। কিন্তু রুপনার উচ্চতা গোলরক্ষকদের জন্য ঠিক আদর্শ নয়। বলতে গেলে খেলোয়াড় হিসেবে এটা তার একটা সীমাবদ্ধতা।
কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাকে জয় করে মাত্র ৫ ফুট উচ্চতার রুপনা জাতীয় নারী ফুটবল দলের সেরা গোলরক্ষক। তারচেয়ে বেশি উচ্চতা নিয়েও অন্যরা পড়ে থাকছেন পেছনে।
রুপনার এই কম উচ্চতা নিয়ে অনেক সময় সমালোচনাও হয়। ধরুণ, একটা ম্যাচে দুর্দান্ত খেললেন। কিন্তু কোনো এক মুহূর্তে হয়তো গোলহজম করে ফেললেন। খোলাচোখে মনে হলো, গোলরক্ষকের উচ্চতা বেশি হলে গোল হতো না। ব্যাস! শুরু সমালোচনা।
মিডিয়া বা সাধারণ দর্শকদের এই সমালোচনা রুপনার কানেও পৌঁছে যায়। যা তার ছোট্ট মনকে নাড়া দেয় না, তা নয়। রুপনা বলেন, ‘লম্বা হওয়ার জন্য আমি তো চেষ্টা করি অনেক। কিন্তু ইশ^র সেটা আমায় দেয়নি...।’
এরপরই রুপনার কণ্ঠে ঝড়ে আত্মবিশ্বাস, ‘খাটো হলে কি হবে। অন্য সবকিছু তো ভালো আছে। সেটা দিয়েই আমি আমার সর্বেচ্চ চেষ্টা করতেছি।’
হ্যাঁ, রুপনা তার সর্বোচ্চ চেষ্টাই করে যাচ্ছেন। আর এ কারণেই জাতীয় নারী দলের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন তাকে নিয়ে মুগ্ধ, ‘রুপনা নারী ফুটবলে অনেক সম্ভাবনাময়ী ফুটবলার। অল্প বয়সেই সে অনেক ম্যাচ খেলে ফেলেছে। ও যদি খেলাটা চালিয়ে যায়, আর ওকে যত্ন করে রাখা যায়, যখন ওর বয়স ২০ বছর হবে তখন ও দেশের জন্য অনেক বড় সম্পদ হবে।’
রুপনার উচ্চতা নিয়ে প্রশ্নে গোলাম রব্বানী ছোটন ঢাল হয়ে দাঁড়ান, ‘উচ্চতায় লম্বা না খাটো এটা নিয়ে বিতর্কের কিছু দেখি না আমি। লম্বা গোলরক্ষকরাও ভুল করে। গোল হজম করে। রুপনা কিন্তু প্রতিনিয়ত উন্নতি করছে। ওর যে গতি, ওর বল ধরার যে স্টাইল, এটা তো দেখতে হবে। ওর বিহান্ড দ্যা ফিডেন্স ধরে খেলা, ওর যে সাহস- এগুলো অসাধারণ।’
রুপনা যখন খেলা শুরু করেন প্রতিবেশিদের থেকেও ছিল বাধা। বিশেষ করে ঢাকায় এসে খেলবেন, এমনটাতো চাইতেনই না কেউ। রুপনার মাকে নানা কিছু বোঝাতেন। শুরুতে তাই মা আসতেই দিতেন না মেয়েকে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেইসব বাধা ঠিকই ডিঙিয়েছেন রুপনা। আর এখন রুপনার মা-ই রুপনার খেলার জন্য বড় প্রেরণা, ‘মা সব সময় বলেন, ভালো করে খেলতে। দেশের জন্য সম্মান বইয়ে আনতে।’
জীবন যুদ্ধে মা সব সময় আগলে রেখেছেন। কিন্তু বাবাকে সব সময় খুঁজে ফিরেছে রুপনার মন। রাঙামাটি থেকে উঠে আসা, জাতীয় দলে জায়গা ধরে রাখার লড়াই। এসবের মাঝে হঠাৎ বাবার প্রসঙ্গ উঠতেই রুপনা বলেন, ‘মাকে বললে বলত, বাবার একটা অসুখ করেছিল। সেই অসুখে মারা গেছে। আমি বলতাম, মারা গেছে ঠিক আছে। একটা ছবিও কি রাখতে পারোনি।’
বাবাকে কখনো ছবিতেও না দেখা রুপনার কণ্ঠ ভিজে আসে, ‘যখন বন্ধুদের কাউকে বাবা ডাকতে দেখি, আমি ঠিক থাকতে পারি না। আমার খুব কষ্ট লাগে...।’
শ্রোতা হয়ে একথা শোনার পর রুপনাকে আর প্রশ্ন করা হয় না।